ব্রহ্মা। কত খরচ করবেন?
শয়তান। ধরুন তাঁদের উপার্জনের শতকরা এক ভাগ।
ব্রহ্মা। তাতে হবে না বাপু।
শয়তান। আচ্ছা, দু পারসেণ্ট।
ব্রহ্মা। আমাকে দালাল ঠাউরেছ নাকি?
শয়তান। পাঁচ পারসেণ্ট? দশ—পনেরো—বিশ? আচ্ছা, না হয় শতকরা পঁচিশ ভাগ আপনাদের প্রীত্যর্থে খয়রাত করা হবে। তাতেও রাজী নন? উঃ, আপনার খাঁই দেখছি দেশসেবকদের চাইতেও বেশী। ক বছর জেল খেটেছেন প্রভু? আচ্ছা, আপনিই বলুন কত হলে খুশী হবেন।
ব্রহ্মা। শতকরা পুরাপুরি এক—শ চাই।
নারদ। ওহে শয়তান, প্রভু বলছেন, কর্মের সমস্ত ফল সমর্পণ করতে হবে তবেই নিষ্কৃতি মিলবে।
শয়তান। তা হলে তো রোজগার করাই বৃথা। যদি সবই ছেড়ে দিতে হয় তবে চুরি ডাকাতি লুটপাট মারামারি করে লাভ কি?
ব্রহ্মা। এই কথা তোমার মক্কেলদের বুঝিয়ে দিও। কিছু হাতে রেখে চুক্তি করা যায় না। গড আর আল্লা তারা কি বলেন? কই, এঁরা সব গেলেন কোথা?
নারদ। সবাই অন্তর্হিত হয়েছেন।
শয়তান। তবে আমিও যাই পিতামহ। আপনি তো নিরাশ করলেন।
ব্রহ্মা। একটু থাম, শুধু হাতে ফিরে যেতে নেই। একটা বর দিচ্ছি।—বৎস শয়তান, পুরুত পাদরী মোল্লা, পুলিস সৈন্য বা মিলিত জাতিসংসদ, কেউ তোমাকে বাধা দেবে না, তোমার মক্কেলদের তুমি নির্বিঘ্নে নরকস্থ করতে পারবে। তারপর আমি আবার মানুষ সৃষ্টি করব। নারদ, এখন যাই চল, আমার হাঁসটাকে ডেকে আন।
নারদ। প্রভু, সে মানস সরোবরে চরতে গেছে। এত শীঘ্র সভাভঙ্গ হবে, তা তো জানত না। আপনি আমার ঢেঁকিতেই চলুন।
১৩৫৭ (১৯৫০)
তিরি চৌধুরী
করুণাময় দত্তগুপ্ত কৃতী পুরুষ, মুনসেফ থেকে ক্রমে ক্রমে জেলা জজ তারপর হাইকোর্টের জজ হয়েছেন। ঈস্টারের বন্ধ, সকাল বেলা বাড়িতে খাস কামরায় বসে তিনি চা খাচ্ছেন আর খবরের কাগজ পড়ছেন, এমন সময় একটি মেয়ে এসে তাঁকে প্রণাম করল।
ষোল—সতরো বছরের সুশ্রী মেয়ে, পরিপাটি সাজ। জস্টিস দত্তগুপ্ত তার দিকে তাকাতে সে বলল, আমার ঠাকুদ্দাকে আপনি চেনেন, সলিসিটার্স চৌধুরী অ্যাণ্ড সনসের প্রিয়নাথ চৌধুরী। আমার নাম তিরি।
করুণাময় বললেন, ও তুমি প্রিয়নাথবাবুর নাতনী, আমাদের সোমনাথের মেয়ে? বস ওই চেয়ারটায়। তা তোমার নাম তিরি হল কেন?
—কি জানেন, আমার মামা অঙ্কের প্রফেসার, আর আমি হচ্ছি তৃতীয় সন্তান, তাই মামা আমার নাম রেখেছিলেন তৃতীয়া। নামটা খটমটে, আমি ছেঁটে দিয়ে তিরি করেছি।
—তা বেশ করেছ। এখন কি চাই বল তো?
—আজ্ঞে, আমার ঠাকুমা বড় দুর্ভাবনায় পড়েছেন, একেবারে মুষড়ে গেছেন, ভাল করে খাচ্ছেন না, ঘুমুতে পারছেন না। দয়া করে আপনি তাঁকে বাঁচান।
—ব্যাপারটা কি? যদি বৈষয়িক কিছু হয় তবে তোমার ঠাকুদ্দা আর বাবাই তো তার ব্যবস্থা করতে পারবেন।
—বৈষয়িক নয়, হার্দিক।
—সে আবার কি।
—হার্টের ব্যাপার।
—তা হলে হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তারকে দেখাও, আমি তো তাঁর কিছুই করতে পারব না।
—আপনি নিশ্চয় পারবেন সার। আপনি অনুমতি দিন, আজ সন্ধ্যে বেলা ঠাকুমাকে আপনার কাছে নিয়ে আসব।
—তা না হয় এনো। কিন্তু কি হয়েছে তা তো আগে আমার একটু জানা দরকার।
—ব্যাপারটা গোপনীয়, ঠাকুমাই আপনাকে জানাবেন। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না সার, শুধু ঠাকুমাকে আশ্বাস দেবেন যে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি কানে একটু কম শোনেন। আমি দরকার মতন আপনাকে প্রমট করব, ফিসফিস করে বাতলে দেব।
করুণাময় সহাস্যে বললেন, ও ঠাকুমার ব্যবস্থা তুমি নিজেই করবে, আমি শুধু সাক্ষিগোপাল হয়ে থাকবো?
—আজ্ঞে হাঁ। আমার কথা তো ঠাকুমা গ্রাহ্য করবেন না, আপনার মুখ থেকে শুনলে তাঁর বিশ্বাস হবে। আপনাকে দারুণ শ্রদ্ধা করেন কিনা। ঠাকুমা বলেন, হাইকোর্টের জজরা হচ্ছেন ধর্মের অবতার, হাইকোর্টের দৌলতেই ঠাকুদ্দা আর বাবা করে খাচ্ছেন।
—বাঃ, ঠাকুমা তো বেশ বলেছেন! তোমার বাবা কি ঠাকুদ্দা আসবেন না?
—না না না, তাঁরা এলে সব মাটি হবে। হাসবেন না সার, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। ঠাকুমার দুশ্চিন্তা আমার জন্যে নয়, আমার কোনও স্বার্থ নেই।
—বেশ, আজ সন্ধ্যায় তাঁকে নিয়ে এস।
সন্ধ্যার সময় তিরি তার ঠাকুমাকে নিয়ে করুণাময়ের বাড়িতে উপস্থিত হল। নমস্কার বিনিময়ের পর তিরি বলল, এই ইনি হচ্ছেন আমার ঠাকুমা শ্রীমতী কনকলতা চৌধুরানী, সলিসিটার প্রিয়নাথ চৌধুরীর স্ত্রী। আর ইনি হচ্ছেন মাননীয় মিস্টার জস্টিস শ্রীকরুণাময় দত্তগুপ্ত। ঠাকুমা, ইনট্রোডিউস করে দিলুম, এখন তুমি মনের কথা খোলসা করে বল।
কনকলতা ধমকের সুরে বললেন, আমি কেন বলতে যাব লা? বুড়ো মাগী লজ্জা করে না বুঝি? তোকে এনেছি কি করতে? যা বলবার তুই বল।
তিরি বলল, বেশ আমিই বলছি। শুনুন ইওর লর্ডশিপ—
করুণাময় বললেন, বাড়িতে লর্ডশিপ নয়।
—আচ্ছা, শুনুন সার। আমার ঠাকুদ্দাকে তো দেখেছেন, খুব সুপুরুষ, যদিও পঁচাত্তর পেরিয়েছেন। আর আমার এই ঠাকুমাকেও দেখুন, বেশ সুন্দরী, নয়? যদিও সাতষট্টি বছর বয়সের দরুন একুট তুবড়ে গেছেন, পুরনো ঘটির মতন।
কনকলতা একটু কালা হলেও নিজের সম্বন্ধে কথা হলে বেশ শুনতে পান। বললেন, আরে গেল যা, ও সব কথা বলতে তোকে কে বলছে?
তিরি বলল, এই সবই তো আসল কথা। তারপর শুনুন সার। পঞ্চান্ন বছর আগে, ঠাকুদ্দার বয়স যখন কুড়ি, তখন প্রভাবতী ঘোষ নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ হয়। বারো—তেরো বছরের সুন্দরী মেয়ে, ঠাকুদ্দা তাকে একবার দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু আমার প্রঠাকুদ্দা, অর্থাৎ ঠাকুদ্দার বাবা ছিলেন একটি অর্থগৃধ্র—
