কাসিম বললে, না হুজুর, এখান দিয়ে নৌকো আনাগোনা করে না। সেই বুড়ো বাবুটি পথ দেখিয়ে নিয়ে না এলে আমরা কোনওদিনই এদিকে আসতুম না।
বিমল বললে, কাসিম, তাহলে ওই মোটরবোটে চড়ে আসছেন তোমাদেরই সেই বুড়োবাবুটি!
কাসিম বললে, হতে পারে হুজুর, আমি তো আপনাকে আগেই বলেছিলুম, সেই বুড়োবাবুটি আবার রাইপুরে গিয়েছেন। হয়তো তিনিই ফিরে আসছেন।
বিমল বললে, তোমাদের সেই বুড়োবাবু রোজ এদিকে ফিরে আসুন, আমাদের তাতে কোনওই আপত্তি নেই! কিন্তু আজ তিনি আমাদের যাতে এইখানে দেখতে না পান, এখনি এমন কোনও ব্যবস্থা করতে হবে।
কুমার বললে, কিন্তু এই খোলা নদীতে লুকোতে গেলে নৌকোশুদ্ধ পাতালপ্রবেশ ছাড়া আমাদের তো আর কোনও উপায় নেই!
বিমল বললে, উপায় বোধহয় আছে কুমার! মাইল খানেক তফাতে ছোট একটা চরের মতো কী যেন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না? মোটরবোট যে চালাচ্ছিল তার দিকে ফিরে সে। বললে, ওহে, জোরে চালাও, খুব জোরে!
বোটের গতি তখন দ্বিগুণ বেড়ে উঠল এবং মিনিট কয়েক পরেই তারা একটা চরের কাছে এসে পড়ল।
গঙ্গাসাগরের কাছে সুন্দরবনের অসংখ্য নদীর ভেতরে এই রকম সব ছোট-ছোট চর দেখা যায়। বছরের অন্যান্য সময়ে এই চরগুলো জলের ওপরে জেগে থাকে, তার বুকে ঝোপঝাপ ও জঙ্গলের আবির্ভাব হয় এবং দূর থেকে তাদের দেখায় এক একটা ক্ষুদ্র দ্বীপের মতো। কিন্তু বর্ষার সময়ে নদীর জল যখন বেড়ে ওঠে তখন এইসব চরের কোনও চিহ্নই আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তাদের বোট এইরকম একটা চরের কাছেই এসে পড়েছিল। এখানেও ঝোপঝাপ ও বনজঙ্গলের কোনও অভাব ছিল না।
বিমল বললে, আরও এগিয়ে মোড় ফিরে বোটখানাকে চরের ওপাশে নিয়ে চলো! ঝোপের আড়ালে গিয়ে পড়লে কেউ আমাদের দেখতে পাবে না।
বোটের চালক বিমলের কথামতোই কাজ করলে।
বিমলদের বোট দ্বিগুণ বেগে এগিয়ে এসেছিল বলে পিছনের বোটের ইঞ্জিনের আওয়াজ তখন আর শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু খানিক পরেই সেই শব্দটা ধীরে-ধীরে আবার জেগে উঠল।
কুমার বললে, বিমল, আমরা যখন ও-বোটের শব্দ শুনতে পেয়েছি, তখন ওরাও যে আমাদের শব্দ শুনতে পায়নি এমন কথা বলা যায় না।
বিমল চিন্তিত ভাবে বললে, তা যদি পেয়ে থাকে তাহলে ভাবনার কথা।
কুমার বললে, ভাবনা কিসের?
তুমি তো শুনেছ কুমার, দ্বীপের ওই ভদ্রলোক চান না যে আর কেউ তার ওখানে গিয়ে ওঠে। আমরা এসেছি শুনলে তিনি খুশি হবেন বলে মনে হচ্ছে না।
পিছনের মোটরবোটের শব্দ তখন খুব কাছেই এসে পড়েছে। কিন্তু চরের কাছে এসেই শব্দটা থেমে গেল।
বিমল মৃদুস্বরে বললে, কুমার, তোমার সন্দেহই সত্য। ওরা আমাদের বোটের শব্দ নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছে। তাই ওরা বোট থামিয়ে লক্ষ করছে, আমরা কোথায় মিলিয়ে গেলুম।
কুমার বললে, ওরা যদি এদিকে আমাদের খুঁজতে আসে?
খুঁজতে যদি আসে তাহলে উপায় কী? তাদের সঙ্গে আমাদের আলাপ করতেই হবে।
তুমি কি কোনওরকম বিপদের ভয় করছ বিমল?
বিপদ? বিপদের ভয় আছে কিনা ঠিক বলতে পারি না, তবে এখানে আমাদের দেখতে পেলে ওই বোটের লোকেরা হয়তো আমাদের নতুন জামাই বলে ভ্রম করবে না। কুমার, সকলের চোখের আড়ালে যারা লুকিয়ে এমন জায়গায় বাস করে, তারা খুব ভালোমানুষ বলে মনে হয় না।
কুমার আর কিছু না বলে তাড়াতাড়ি নিজের বন্দুকটা টেনে নিলে।
বিমল বললে, আমারও বন্দুকটা এগিয়ে দাও, সাবধানের মার নেই।
কাসিম ভীত স্বরে বললে, হুজুর, আমরা কী করব?
বিমল বললে, তোমরা আপাতত চুপ করে নৌকোর ভেতরে বসে থাক। দরকার হলে আমি তোমাদের ডাকব।
সেই অজানা মোটরবোটের শব্দ আবার জেগে উঠল।
কুমার বন্দুকটা পরীক্ষা করতে করতে চুপিচুপি বললে, বিমল, বোধহয় ওরা এইদিকেই খুঁজতে আসছে।
বিমল বললে, খুব সম্ভব তাই—
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ । অমানুষিক কণ্ঠস্বর
বিমল ও কুমার উৎকর্ণ হয়ে মোটরবোটের গর্জন শুনতে লাগল।
কিন্তু খানিক পরেই তারা বুঝতে পারলে, গর্জনটা ধীরে-ধীরে ঝিমিয়ে আসছে।
ক্রমে শব্দ এতটা ক্ষীণ হয়ে এল যে, আর কোনও সন্দেহ রইল না।
কুমার সানন্দে বলে উঠল, যাক বাঁচা গেল! ও বোটখানা এদিকে আসছে না, অন্যদিকে চলে যাচ্ছে!
বিমল বললে, কিন্তু ওদের মনে সন্দেহ হয়েছিল বলেই যে বোটখানা হঠাৎ এখানে থেমেছিল, সেটাও বেশ বোঝা যাচ্ছে। এখন আমাদের উচিত হচ্ছে, ও-বোটখানাকে আরও খানিক এগিয়ে যেতে দেওয়া। ততক্ষণে এইখানে বসে-বসে বেঁধেবেড়ে খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়া যাক। ইকমিক কুকারে খিচুড়ি চড়িয়ে দাও কুমার! কাসিম মিয়া, আমাদের চুবড়ি থেকে একটি মুরগি বার করে স্বর্গে পাঠাব, না তোমরা দু-একটা মাছ উপহার দিতে পারবে?
সন্ধ্যার মায়া-আলো মিলিয়ে গেল, আকাশ থেকে নেমে এল অন্ধকারের যবনিকা। বিমলদের মোটরবোট চলছে–চারিদিকে চলচল ছলছল জলের কান্না!
প্রতিপদের চাঁদ উঠল। কিন্তু আজকে আর বন্যজীবনের কোনও ধ্বনি-প্রতিধ্বনি নেই– এমনকী কোনওদিকে বনজঙ্গলের কোনও চিহ্নই নেই,–ওপরে আছে খালি আকাশের অনন্ত চন্দ্রাতপ এবং ডাইনে আর বাঁয়ে, সুমুখে আর পিছনে আছে শুধু সেই চলচল ছলছল জলের কান্না!
চতুর্দিকে সেই অসীমতার অপূর্ব আভাস দেখে কুমার বললে, প্রলয়পয়োধিজলে নারায়ণ যেদিন বটপত্রে ভেসে গিয়েছিলেন, সেদিন তারও অবস্থা হয়েছিল বোধ করি আমাদেরই মতো! এই অকুল জলের জগতে আমাদের বোটখানাকে বটপত্রের চেয়ে বড় বলে মনে হচ্ছে না!
