বিমল তখন কুমারের কথা মন দিয়ে শুনছিল না, সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে কী যেন লক্ষ করছিল।
নৌকোর পিছনের হালের কাছে দাঁড়িয়ে কাসিমও সেই দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ সে বলে উঠল, ওই সেই দ্বীপ হুজুর!
বিমল বললে, তুমি ঠিক চিনতে পেরেছ তো কাসিম? কোনও ভুল হয়নি?
না হুজুর, ভুল হতে পারে না। এখানে আর কোনও দ্বীপ নেই।
বোট এগিয়ে চললদ্বীপ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।
এখানটা সমুদ্র ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
কুমার বললে, এখানে যদি নৌকো ডোবে, বাঁচবার কোনও উপায়ই নেই!
বিমল বললে, বাঁচবার একমাত্র উপায় ওই দ্বীপ। কিন্তু ওখানেও আছেন সেই দ্বীপবাসী বৃদ্ধ–যিনি অতিথি পছন্দ করেন না।
কুমার বললে, কে জানে ওই দ্বীপের কী রহস্য!
কাসিম বললে, হুজুর, আপনারা কি আজকেই ওখানে গিয়ে নামবেন?
বিমল বললে, এই রাত্রে? নিশ্চয়ই নয়! আমরা ডাঙার কাছে একটা ঝুপসি জায়গা পেলেই নঙর করব। ডাঙায় নামব কাল সকালে। ড্রাইভার, তুমি মোটরের ইঞ্জিন থামাও, নইলে ও-শব্দ দ্বীপে গিয়ে পৌঁছবে। কাসিম, এখন বেশ জোয়ারের টান আছে, এইবারে তোমার নৌকো আমাদের বোটকে দ্বীপের কাছে টেনে নিয়ে যেতে পারবে?
কাসিম বললে, পারবে। তখনি সেই ব্যবস্থাই হল।
বিমল বললে, সবাই আস্তে আস্তে দাঁড় ফেলো। সাবধানের মার নেই।
দ্বীপ খুব কাছে এসে পড়ল। তার বনজঙ্গলে জ্যোৎস্নার ঝালর ঝিকমিক করছে এবং তার সর্বত্র বিরাজ করছে নিস্তব্ধ এক থমথমে বিজনতা।
কুমার বললে, বুড়ো এখন ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে স্বপন দেখছে।
বিমল বললে, স্বপন দেখতে-দেখতে সে জেগে উঠতেও পারে।
দ্বীপের ভেতর থেকে জীবনের টু-শব্দটি পর্যন্ত কানে এল না। এখানে যে মানুষ আছে, গাছ-পাতার ফাঁক দিয়ে কোনও কম্পমান আলোক-শিখাও তার ইঙ্গিত দিলে না। এখানে যে প্রবল ও দুর্বল পশু আছে, পূর্ব পরিচিত বন্য নাট্যাভিনয়ের কোনও হুঙ্কার বা আর্তনাদও তার প্রমাণ দিলে না। বিমল ও কুমারের মনে হল গঙ্গাসাগরের লবণাক্ত অশ্রুজলের ওপরে অজানা বিভীষিকার ছায়া নাচিয়ে এই রহস্যময় দ্বীপ যেন পৃথিবীর ভেতরে থেকেও পৃথিবীর ভেতরে নেই!
বিমল চুপি-চুপি জিজ্ঞাসা করলে, কাসিম, বুড়োবাবুকে যেখানে নামিয়ে দিয়েছিলে, সেখানটা তুমি চিনতে পারবে?
কাসিম মাথা নেড়ে বললে, না হুজুর! তিনি বোধহয় কোনও আঘাটায় নেমেছিলেন। এখানে কোনও ঘাট আছে কিনা আমরা জানি না।
বিমল বললে, তাহলে কাল সকালে আমাদেরও আঘাটাতেই নামতে হবে। আপাতত এক কাজ করো। ওই যেখানে অনেকগুলো বড়-বড় গাছ প্রায় জলের ওপরে হেলে পড়ে চারদিক অন্ধকার করে তুলেছে, ওইখানে গিয়েই নৌকো বাঁধে। এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের দেখতে পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না; এরপর একবার ওই অন্ধকারের ভেতরে গিয়ে ঢুকতে পারলেই আমরা আজকের রাতের মতো নিশ্চিন্ত হতে পারব।
কাসিম বললে, কিন্তু ও অন্ধকার তো ভালো নয় হুজুর! মাথার ওপরে গাছপালা– সেখানে অজগর থাকতে পারে। পাশেই ডাঙা–সেখানে বাঘ থাকতে পারে। যদি তাদের কেউ নৌকোয় এসে ওঠে?
আমরা কামরার সব জানলা-দরজা বন্ধ করে ভেতরে শুয়ে থাকব। এখন তো রাতদুপুর, বাকি রাতটুকু কোনওরকমে কাটিয়ে দিতে পারব বোধহয়।
নৌকো ও মোটরবোট ধীরে-ধীরে অন্ধকারের ভেতরে ঢুকল। সেইখান থেকে তারা দেখতে পেলে, আশপাশের কষ্টিপাথরের মতো কালো ও নিরেট ছায়ার সীমানা ছাড়িয়েই শুরু হয়েছে, মুক্ত আকাশ থেকে নেমে-আসা চাঁদের আলো-লহর–রূপোর জলতরঙ্গে নেচে-নেচে উঠছে আরও চিকন ফেনার মালা! সেই রূপময় তরল ও চঞ্চল অসীমতা নিরুদ্দেশ যাত্রা করেছে যে সুন্দর সংগীত গাইতে গাইতে, ভাবুকের মন নিয়ে তা শুনলে শান্তি ও আনন্দে প্রাণ পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
সবাই কামরার ভেতরে ঢুকে দরজা-জানলা বন্ধ করে দিলে।
বিছানা পেতে বিমল ও কুমার শুয়ে পড়ল।
এ-কথা সেকথা কইতে কইতে তাদের দুজনেরই চোখের পাতা তন্দ্রার আমেজে যখন। ভারী হয়ে এসেছে, তখন বাইরের জলকল্লোলের মাঝখানে আচম্বিতে কি-একটা বেসুরো শব্দ জেগে উঠল।
প্রথমে উঠল গাছের পাতার মর্মর শব্দ,–যেন তিন-চারটে বড়-বড় জীব ডাল-পাতার ভেতরে লাফাতে লাফাতে নৌকোর কাছে এগিয়ে আসছে।
বিমল ধড়মড় করে উঠে বসে বললে, অজগর নাকি?
তারপর শোনা গেল–কিচিরমিচির কিচিরমিচির কিচিরমিচির!
কুমার আবার পাশ ফিরে শুয়ে চোখ মুদে বললে, বাঁদর!
বিমলও আবার শুয়ে পড়বার চেষ্টা করছে, এমন সময়ে শোনা গেল–কিচিরমিচির কিচিরমিচির কিচ মিচ কিচ কিচ–
কচমচে কাঁচা মাথা
কুচি কুচি কচুকাটা
কিছু যদি বোঝো দাদা,
ফিরে যাও ক্যালকাটা।
হা-হা-হা-হা-হা-হা-হা-হা-হা!–সে কী হাসি, যেন থামতেই চায় না!
বিমল একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, ওঠো কুমার! বন্দুক নাও! আমি দরজা খুলে টর্চ জ্বেলে চারদিক দেখি, তুমি বন্দুক বাগিয়ে তৈরি হয়ে পাশে থাক! বিপদ দেখলেই বন্দুক ছুড়বে!
দরজা খুলে টর্চের উজ্জ্বল আলোকে কেবল দেখা গেল, বোটের ঠিক ওপরেই মস্ত বটগাছের দুটো-তিনটে ডাল খুব জোরে নড়ছে, যেন এইমাত্র কেউ সেখান থেকে লাফ মেরে ঘন পাতার আড়ালে সরে গিয়েছে।
কুমার বললে, প্রথমে বাঁদরের কিচিরমিচির, তারপরেই মানুষের গান আর হাসি!
বিমল বললে, বাঁদরের কিচিরমিচির ঠিকই শুনেছি বটে! কিন্তু যে গান আর যে হাসি শুনলুম, ও কি মানুষের? অমন অস্বাভাবিক আওয়াজ কোনও মানুষের গলায় কেউ কি কখনও শুনেছে?
