কুমার হাসতে হাসতে বললে, আমার বন্দুক তৈরি আছে বন্ধু! বলো, কাকে মারতে হবে? ওই চন্দ্রকিরণকে, না কাসিম মিয়াকে?
বিমল একটা হাই তুলে মুখের কাছে তুড়ি দিতে দিতে বললে, তুমি তৈরি আছ শুনে সুখী হলুম। থাক, আজকের মতো চাঁদের আলো আর কাসিম মিয়াকে অব্যাহতি দাও, এসো, এখন বিছানা পেতে ফেলে হাত-পা ছড়ানো যাক।
পরদিন সকালে বোটের কামরায় বসে স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে বিমল চা-পানের আয়োজন করছিল।
কুমার বাইরে বসে দুই ধারের দৃশ্য দেখছিল।
দৃশ্যের কিছুই পরিবর্তন হয়নি, কেবল চাঁদের আলোর বদলে সূর্য এসে এখন দিকে দিকে কাঁচা সোনার জল ছড়িয়ে দিচ্ছে। নদীর দুই তীরে সবুজ বন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার ভেতর থেকে রাত্রের সেই ভয়ানক ধ্বনি-প্রতিধ্বনি আর শোনা যাচ্ছে না। বোট একদিকের তীর ঘেঁসে যাচ্ছিল, কিন্তু অধিকাংশ স্থানেই বনের ভেতরে গাছপালারা এমন নিবিড় ভাবে পরস্পরের সঙ্গে গা মিলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে, বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই নজরে আসে না। মাঝে-মাঝে যেখানে একটু ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানটাকে দেখাচ্ছে ঠিক জলাভূমির মতো। সেখান দিয়ে পায়ে হেঁটে যেতে গেলে এক কোমর কর্মাক্ত জল ভেঙে অগ্রসর হতে হয়। সেই কর্দমাক্ত জলের ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে নলখাগড়ার দল। দূরে-দূরে বনের শিয়রে-শিয়রে দেখা যাচ্ছে কুয়াশার মতো বাষ্পের মেঘ।
এক জায়গায় দেখা গেল, কুৎসিত দেহের আধখানা ডাঙার ওপরে তুলে প্রকাণ্ড একটা কুমির স্থিরভাবে রোদ পোয়াচ্ছে। এত বড় কুমির, কুমার আর কোনওদিন দেখেনি। তার বন্দুকটা পাশেই ছিল, সে আস্তে-আস্তে সেটা তুলে নিয়ে কুমিরের দিকে নিজের লক্ষ্য স্থির করলে।
বিমল তখন দুটো চায়ের পেয়ালা হাতে করে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে, কুমারের অবস্থা দেখে সেও কুমিরের দিকে দৃষ্টি ফেরালে। তারপর তাড়াতাড়ি বলে উঠল, থামো কুমার, বন্দুক ছুড়ো না!
কুমার একটু আশ্চর্য হয়ে বন্দুক নামিয়ে বললে, কেন?
বিমল বললে, কুমিরের ঠিক ওপরে গাছের ডালের দিকে তাকিয়ে দেখো। এখন রাত নেই, কিন্তু জীবন-যুদ্ধের জের এখনও চলেছে।
কুমার সেইদিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে দেখলে, একটা প্রকাণ্ড গাছের ডাল জড়িয়ে মস্ত এক অজগর সাপ স্থির ভাবে কুমিরকে লক্ষ করছে। হঠাৎ তার মাথাটা ডাল থেকে একটুখানি নীচে নেমে পড়ল, তারপর দু-একবার এদিকে-ওদিকে দুলতে লাগল এবং তার পরেই ঠিক বিদ্যুতের ঝড়ের মতো তার দেহটা একেবারে কুমিরের ঘাড়ের ওপরে এসে পড়ল! তারপর সমস্ত জল তোলপাড় করে যে দৃশ্য শুরু হল ভাষায় তা বর্ণনা করা যায় না! কুমির চায়। তার বলিষ্ঠ লাঙ্গুলের প্রচণ্ড ঝাঁপটা মেরে অজগরকে কাবু করে জলে ডুব দিতে, আর অজগর চায় পাকে-পাকে কুমিরকে ক্রমেই বেশি করে জড়িয়ে ডাঙার ওপরে টেনে তুলতে।
এই বন্য নাটকের শেষ দৃশ্য দেখবার আগেই বোটখানা নদীর একটা মোড় ফিরে আড়ালে গিয়ে পড়ল।
কুমার বললে, কুমিরটাকে আমি মারতে পারতুম, অজগরটাকেও পারতুম! কিন্তু বিমল, প্রকৃতির অভিশাপ যাদের ওপরে এসে পড়েছে, তাদের কারুকে মারতে আমার হাত উঠল না। ওরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যা পূরণ করুক।
বিমল বললে, এখন বন্দুক রেখে চা খাও! তারপর এসো, কাসিম মিয়ার সঙ্গে একটু কথা কওয়া যাক। ওরা আজ সকাল থেকে মাছ ধরতে বসেছে দেখছি।
পানসি থেকে বিমলের কথা শুনতে পেয়ে কাসিম বলে উঠল, হা হুজুর, হাতে কোনও কাজ নেই, কী আর করি বলুন?
বিমল বললে, মাছটাছ কিছু ধরতে পেরেছ নাকি কাসিম?
ধরেছি হুজুর! দুটো মাছ ধরেছি।
বেশ, বেশ, আমাদের দু-একটা উপহার দিও। কিন্তু বলতে পারো কাসিম, সে দ্বীপে গিয়ে পৌঁছতে আমাদের আরও কত দেরি লাগবে?
কাসিম বললে, আমাদের পানসিতে দাঁড় টেনে গেলে সেখানে পৌঁছতে হয়তো আরও দু-দিন লাগত। কিন্তু আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওই বিলিতি বোট, বোধহয় আজ রাতেই আমরা সেখানে পৌঁছে যাব।
দুপুর গেল, বিকাল গেল, সন্ধ্যার পর আবার রাত এল। আকাশ থেকে আবার প্রতিপদের চাঁদের সাজি চারিদিকে আলোর ফুল ছড়াতে লাগল, অরণ্যের মর্মরধ্বনি ও নদীর জলকল্লোল আবার স্পষ্টতর হয়ে উঠল, বনভূমির ভেতর থেকে আবার ফুট ও অস্ফুট বিচিত্র সব ধ্বনি প্রতিধ্বনি শোনা যেতে লাগল–চারিদিকে আবার অন্ধকারের আবছায়ায় নানা বিভীষিকার সাড়া পাওয়া গেল।
নদী ক্রমেই চওড়া হয়ে উঠছে, দুই তীরের বন-রেখা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।
কাসিম বললে, হুজুর, আমরা সুমুদুরের কাছেই এসে পড়েছি।
আরও ঘণ্টাখানেক পরে নদীর দুই তীর এত দূরে সরে গেল যে, বনের ভেতরকার শব্দ আর বড় কানে আসে না। সেখানে শোনা যায় চারদিক-আচ্ছন্ন করা কেবল নদীর অশ্রান্ত কোলাহল। এ যেন নদী কল্লোলের পৃথিবী!
সেই কোলাহলের ভেতরে দূর থেকে আর একটা শব্দ বিমল ও কুমারের কানে ভেসে এল।
সে শব্দ কাসিমও শুনেছিল। সে উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠল, হুজুর, ও আবার কিসের আওয়াজ?
বিমলও কান পেতে শুনতে লাগল। শব্দটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তার মানে শব্দটা ক্রমেই তাদের কাছে এগিয়ে আসছে।
বিমল গম্ভীর স্বরে বললে, কাসিম, আমাদের মতো আর একখানা মোটরবোট এই দিকে আসছে। ও তারই শব্দ!
কুমার বললে, ওটা যে মোটরবোটের শব্দ তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে, এমন অসময়ে এখানে কার ও মোটরবোট? হ্যাঁ কাসিম, এখান দিয়ে প্রায়ই কি এইরকম নৌকো আর মোটরবোট আনাগোনা করে?
