বিমল ব্যস্ত ভাবে বললে, কাসিম, আমরা যে সেই দ্বীপে যাব সে কথা তাঁকে তুমি বলোনি তো?
কাসিম বললে, আজ্ঞে না হুজুর, বলবার সময়ই পাইনি!
বিমল হাঁপ ছেড়ে বললে, সেই বাবুটি এখনও এখানে আছেন নাকি?
কাসিম বললে, বোধহয় নেই। কোথায় যে তিনি গেলেন, তারপর থেকে আমরা কেউ আর তাঁকে দেখতে পাইনি।
বিমল জিজ্ঞাসা করলে, বাবুটিকে কেমন দেখতে বলো দেখি? কাসিম বললে, বলেছি তো, খুব লম্বাচওড়া জোয়ান লোক। তার বয়েস ষাট বছরের কম হবে না, কিন্তু তাঁকে দেখলেই বোঝা যায় এখনও তার গায়ে অসুরের মতো জোর আছে। তার রং শ্যামলা, মাথায় লম্বা সাদা চুল আর মুখে লম্বা-লম্বা সাদা দাড়ি। নাকে ধোঁয়া-রঙের চশমা, সেই চশমার ভেতর থেকে মাঝে-মাঝে মনে হয় তার চোখদুটো যেন দপদপ করে জ্বলছে!
বিমল খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে, কাসিম, আমার মোটগুলো বোট থেকে নামিয়ে তোমাদের পানসিতে তুলে নাও। আজ বিকালেই আমরা নৌকো ছাড়ব।
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। জ্যোৎস্নাময় জঙ্গলে
পূর্ণিমা রাত। নির্মেঘ নীল আকাশে তারাদের সভা বসেছে আর তারই ভেতর দিয়ে বয়ে চলেছে ভরা জোছনার জোয়ার।
পৃথিবীতেও দুই ধারে যেন পরির হাতে সাজানো নীলবনের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে। কানায় কানায় ভরা নদীর জোয়ারের জল। সে-জলস্রোতকে মনে হচ্ছে রুপোলি জোছনার স্রোত।
নির্জনতা যে কত সুন্দর মায়াময় হতে পারে শহরে বসে কেউ তা অনুভব করতে পারে না।
বনে-বনে গাছের ডালে-ডালে সবুজ পাতা-শিশুরা খেলা করছে আলো-ছায়ার ঝিলিমিলি দুলিয়ে-দুলিয়ে এবং নদীর বুকে-বুকে ঢেউ-শিশুরা খেলা করছে হিরে ধারার জাল বুনতে-বুনতে৷
এক-একবার ঠান্ডা বাতাসের উচ্ছ্বাস ভেসে আসছে–আর সঙ্গে-সঙ্গে ঢেউ-শিশু আর পাতা-শিশুরা খুশির হাসিতে চারিদিকের নীরবতা অস্ফুট, অপূর্ব শব্দময় করে তুলছে।
কিন্তু এই বনভূমির মৌনব্রত ভঙ্গ করেছে অনেক ধ্বনি আর প্রতিধ্বনি। চাঁদের আলোর যে একটি নিজস্ব শান্ত সুর আছে, যা এই নির্জন বনভূমিকে মোহনীয় করে তুলেছে, ওইসব ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তার অনেকখানি সৌন্দর্য নষ্ট করে দিচ্ছে।
বিমলদের মোটরবোটের যন্ত্রের গর্জন এই নিরালায় কী কর্কশ শোনায়!
সেই গর্জন শুনে মাঝে-মাঝে চরের ওপর থেকে জীবন্ত ও ভয়াবহ গাছের গুঁড়ির মতো কিকতকগুলো জলের ওপর সশব্দে আঁপিয়ে পড়ে চারিদিক তোলপাড় করে তোলে।
কাসিম বলে ওঠে, হুজুর, কুমির!
বিমল ও কুমার তা জানে। জলবাসী ওই করাল মৃত্যুর শব্দ তারা আরও অনেকবার শুনেছে।
এক জায়গায় চার-পাঁচটি হরিণ জলপান করছে। কাছেই অরণ্যের অন্তঃপুরে বাঘের ঘন ঘন হুঙ্কার জেগে উঠল, সঙ্গে-সঙ্গে থেমে গেল ভীত মৃগদের জলপান করার শব্দ।
অরণ্যের মধ্যে দিনে যারা ঘুমায়, সদলবলে জেগে উঠেছে তারা আজ রাত্রে! লক্ষ লক্ষ কীটপতঙ্গ। জ্যোৎস্নার মুখে কালো অভিশাপের মতো দলে-দলে বাদুড় ও কালো পেচক! কোথাও গাছের ভেতর থেকে ভীরু পাখির দল আর্তনাদ করে উঠল, হয়তো তাদের বাসার ভেতরে এসেছে বিপদজনক কোনও অতিথি।
থেকে-থেকে অদ্ভুত ভূতুড়ে স্বরে ডেকে উঠছে তক্ষকের দল। কোনও গাছের টঙ থেকে যেন একদল অশরীরী ও অমানুষ নরশিশু ককিয়ে কেঁদে উঠল, তারা হচ্ছে বকের ছানা। মাঝে-মাঝে অস্বাভাবিক স্বরে ব্যাঙ চিৎকার করে উঠছে–এ আর কিছু নয়, সর্পের কবলগত হয়ে হতভাগ্যের প্রবল অথচ ব্যর্থ প্রতিবাদ!
এই চন্দ্রকিরণের রাজ্য দিয়ে, এই বনস্পতিদের তপোবন দিয়ে, এই ধ্বনি-প্রতিধ্বনির জগৎ দিয়ে, জলের বুকে ফেনার আলপনা কাটতে কাটতে তীব্র গতির বেগে উন্মত্ত হয়ে ছুটে চলেছে বিমলদের মোটরবোট।
চারিদিকের দৃশ্য দেখতে-দেখতে, চারিদিকের শব্দ শুনতে-শুনতে বিমল হঠাৎ বলে উঠল, শোনো কুমার, কান পেতে শোনো! মহাকাল এই নির্জন অরণ্যে একলা বসে জীবন-সংগ্রামের অনন্ত ইতিহাস নিজের মনেই উচ্চস্বরে পাঠ করে যাচ্ছেন! কবিরা বনে এসে বিজনতা আর নীরবতার সন্ধান পান। কিন্তু এই মিষ্ট চাঁদের আলোয়, এই অরণ্যের অন্তঃপুরে এসে, তুমি কি মৃত্যুর নিষ্ঠুর রথচক্রের ধ্বনি নিজের কানে শুনতে পাচ্ছ না? এ বন নির্জন বটে, কিন্তু এখানকার অন্ধকারের অন্তরালে বসে কত কোটি কোটি কীটপতঙ্গ আর জীবজন্তু জীবনযুদ্ধের চিরন্তন নিষ্ঠুরতায় অশ্রান্ত আর্তনাদ করছে–কত দুর্বল কত সবলের কবলে পড়ে অত্যাচারিত হচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে কত সহস্র জীবনের প্রাণ নষ্ট হচ্ছে। আমরা মানুষ, আমরা হচ্ছি নগরবাসী সামাজিক জীব, প্রতিপদে আমাদেরও আত্মরক্ষা করতে হয় বটে, কিন্তু সে হচ্ছে অন্য নানান কারণে। জীবনের ভয় যে সেখানে নেই এমন কথা বলি না, কিন্তু এখানকার তুলনায় সেখানকার নীতি হচ্ছে স্বর্গীয় নীতি। সেখানেও বিপদ আছে বটে, কিন্তু সে বিপদের পূর্বাভাস পেয়ে আমরা প্রায়ই সাবধান হতে পারি। আর এখানকার নীতি কী? এখানকার একমাত্র নীতি হচ্ছে– হয় মরো, নয় মারো! জীবন আর মৃত্যু নিয়ে এখানে চিরদিনের এক নির্দয় খেলা চলছে। যে অপরকে মারতে পারবে না, এখানে তাকে অপরের হাতে মরতেই হবে। এ অরণ্য হচ্ছে এক মহাযুদ্ধের ক্ষেত্র–যে যুদ্ধে কোনওদিন সন্ধি নেই, শান্তি নেই। চারিদিকে ওই যে ধ্বনি আর প্রতিধ্বনি জেগে রয়েছে, ওর ভেতর থেকে আমি খালি এক কঠিন বাণীই শুনতে পাচ্ছি– হয় মরো, নয় মারো! এখানকার আকাশের নীলিমার মধুরিমা, চাঁদের আলোর ঝরনা, সবুজ পাতার গান আর নদীর কলতান যার মনে স্বপ্ন আর কবিত্ব সঞ্চার করবে সে নিরাপদ থাকতে পারবে না এক মুহূর্তও! বুঝেছ কুমার, এখানে এসে আমাদেরও সজাগ হয়ে সর্বদা এই মন্ত্রই জপ করতে হবে–হয় মরো, নয় মারো! কবিরা বনের নিষ্ঠুর ধর্ম ভালো করে জানেন না, কবিতার অরণ্যে তাই আমরা কেবল মাধুর্যকেই দেখতে পাই।
