কুমার অপ্রতিভ ভাবে বললে, মাফ করো ভাই বিমল, আমারই ভ্রম হয়েছে। কিন্তু এখন আসল কথাই হোক। নতুনত্ব খুঁজে পাই আর না পাই, তোমার সঙ্গে থাকার চেয়ে আনন্দ আমার আর কিছুই নেই। তাহলে কবে আমরা যাত্রা করব?
বিমল বললে, যে মাঝির কাছে থেকে সেই দ্বীপ আর সেই দ্বীপবাসীর খবর পেয়েছি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে সেই-ই। আমার যে মোটরবোট আছে, তাইতে চড়েই আমরা কলকাতা থেকে যাত্রা করব। রাইপুর থেকে মাঝি তার নৌকো নিয়ে আমাদের সঙ্গে যাবে। সে প্রথমটা কিছুতেই রাজি হয়নি, টাকার লোভ দেখিয়ে অনেক কষ্টে শেষটা তাকে আমি রাজি করাতে পেয়েছি। মাঝি তার নৌকো আর লোকজন নিয়ে রাইপুরেই প্রস্তুত হয়ে আছে, তোমার যদি অসুবিধে না হয়, তাহলে কালকেই আমরা বেরিয়ে পড়তে পারি।
কুমার বললে, আমার আবার অসুবিধে কি? কালকেই আমি যেতে পারি।
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। পুনরাবির্ভব
মাঝির নাম ছিল কাসিম মিয়া। রাইপুরের ঘাটে মোটরবোট ভিড়িয়ে বিমল ও কুমার তার দেখা পেলে।
বিমলকে মোটরযোট ছেড়ে ডাঙায় নামতে দেখে সেও তাড়াতাড়ি জাল-বোনা রেখে নিজের নৌকো থেকে নেমে এল।
বিমল তাকে দেখে শুধোলে, কি মিয়া সায়েব, তোমরা সব তৈরি আছ তো?
কাসিম সেলাম ঠুকে বললে, হা হুজুর, আমরা সবাই তৈরি। আজকে বলেন, আজকেই যেতে পারি।
তোমার সঙ্গে ক-জন লোক নিয়েছ?
চারজন দাঁড়ি নিয়েছি হুজুর!
কিন্তু এ-যাত্রা দাঁড় বোধহয় তাদের কারুকেই টানতে হবে না! আমাদের বোটই তোমাদের পানসিকে টেনে নিয়ে যাবে। তোমরা খাবে-দাবে আর মজা করে ঘুমোবে।
কাসিম একটুখানি হাসবার চেষ্টা করে বললে, ঘুমোতে কি আর পারব হুজুর? আমার লোকেরা ভারী ভয় পেয়েছে।
বিমল আশ্চর্য স্বরে জিজ্ঞাসা করলে, ভয় পেয়েছে? কেন?
কাসিম কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে বললে, তাদের বিশ্বাস, যেখানে আমরা যাচ্ছি সেখানে গেলে মানুষ আর ফিরে আসে না! অছিমুদ্দি মাঝির মুখে তারা শুনেছে, ও-দ্বীপে নাকি ভূত-প্রেত দৈত্য দানোরা বাস করে। সেই দ্বীপের কাছে গিয়ে তিন-চারখানা নৌকো নাকি আর ফিরে আসেনি। নৌকোর যারা ছিল তারা কোথায় গেল, তাও কেউ জানে না। জল-ঝড় নেই, অথচ মাঝে মাঝে ওখানে নাকি অনেকবার নৌকোডুবি হয়েছে! পেটের দায়ে নৌকো চালিয়ে খাই, আপনি ডবল ভাড়া আর তার ওপরে বখশিশের লোভ দেখালেন বলেই আপনাকে নিয়ে যেতে রাজি হয়েছি। কিন্তু আগে অছিমুদ্দির কথা শুনলে আমরা এ কাজে বোধহয় হাত দিতুম না।
বিমল তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বললে, তুমি এমন জোয়ান-মদ্দ কাসিম মিয়া, তুমিই শেষটা ভয় পেয়ে গেলে নাকি?
কাসিম বললে, একেবারে ভয় পাইনি বললে মিথ্যে বলা হয় হুজুর! দ্বীপের সেই বুড়ো বাবুটিও তো আমাদের ভয় দেখাতে কসুর করেননি! কেন তিনি আমাদের সেখানে রাত কাটাতে মানা করলেন? কেন তিনি বললেন, সেখানে জন্তুর ভয় নয়, ডাকাতের ভয় নয়, অন্যকিছুর ভয় আছে? অন্য কিসের ভয় থাকতে পারে? আমরা ভেবেচিন্তে কোনও হদিস খুঁজে পাচ্ছি না!
বিমল বললে, অত হদিস খোঁজবার দরকার কী মিয়া সায়েব? একটা কথাই খালি ভেবে দেখো না? সেই বুড়োবাবুটি তো মানুষ, সেখানে যদি অন্যকিছুর ভয় থাকত, তাহলে কি তিনি নিজে সেই দ্বীপে নামতে সাহস করতেন? অত বাজে ভাবনা ভেব না, সেই দ্বীপে হয়তো এমন কিছু আছে, বুড়োবাবুটি যা অন্য লোককে জানতে দিতে রাজি নন। তাই তিনি তোমাদের মিথ্যে ভয় দেখিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছেন!
কাসিম বললে, সেখানে অন্য কিছু কি আর থাকতে পারে?
ধরো, হয়তো সেই দ্বীপে গুপ্তধন আছে, আর বুড়ো বাবুটি কোনওরকমে তা জানতে পেরেছেন।
গুপ্তধনের নামেই কাসিমের সারা মুখ সাগ্রহ কৌতূহলে প্রদীপ্ত হয়ে উঠল! কিন্তু তার পরেই সে আবার নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে বললে, আপনি যা বলছেন তা অসম্ভব নয় বটে! কিন্তু রাক্ষুসে বেড়ালের মতো দেখতে সেই ভূতুড়ে জানোয়ারটার কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন? সেই জানোয়ারটা কোত্থেকে এল? সেই দ্বীপ থেকেই তো?
বিমল বললে, জানোয়ারটা যে সেই দ্বীপ থেকেই এসেছে এমন কথা জোর করে কিছুতেই বলা যায় না! তোমার নৌকোর সিন্ধুকের ভেতরে যে সেই জানোয়ারটাই ছিল এটা তো তুমি আর স্বচক্ষে দেখোনি, আন্দাজ করছ মাত্র। তারপর ধরো, জানোয়ারটা না হয় সেই সিন্ধুকের ভেতরেই ছিল! কিন্তু বুড়োবাবুটি তাকে নিয়ে হয়তো সেই দ্বীপ থেকে আসছিলেন না, দ্বীপের দিকেই যাচ্ছিলেন। হয়তো তিনি অন্য কোনও জায়গা থেকে সেই জানোয়ারটাকে ধরে এনেছিলেন। এতবড় এই সুন্দরবন, এর ভেতরে কোথায় কত অজানা জানোয়ার আছে, তার খোঁজ কি তোমরা রাখো?
কাসিম যেন অনেকটা আশ্বস্ত হল। সে বললে, আর একটা নতুন খবর আছে হুজুর! সেই বুড়ো বাবুটি আবার এখানে এসেছিলেন!
বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, তাই নাকি! তারপর?
আপনি যেদিন মোহনপুর থেকে চলে যান, ঠিক তার পরের দিনই তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমাকে দেখেই তিনি চিনতে পারলেন। তাড়াতাড়ি আমার কাছে এসে বললেন, কাসিম, তোমাদের এ অঞ্চলে নাকি কী একটা আশ্চর্য জানোয়ার এসে উৎপাত করছে? আমি বললুম, হ্যাঁ হুজুর, একটা জানোয়ার এসে এখানে উৎপাত করছিল, বটে, কিন্তু কলকাতায় এক বাবু এসে বন্দুক ছুঁড়ে তার লীলাখেলা সাঙ্গ করে দিয়েছেন! শুনেই রাগে তাঁর সারা। মুখখানা রাঙা হয়ে উঠল, আর কোনও কথা না বলে হনহন করে তিনি একদিকে চলে গেলেন।
