কুমার, তুমি আমায় যে প্রশ্নগুলি করলে, আমারও মনে ঠিক ওইসব প্রশ্নই জাগছে! ওইসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়ার জন্যেই আমরা সেই দ্বীপের দিকে যাত্রা করব।
কিন্তু আগে থাকতে তবু কিছু ভেবে দেখা দরকার তো? বৃদ্ধ বলেছেন, সে দ্বীপে যারা আছে তারা জন্তু নয়, ডাকাতও নয়। তবে তারা কে? মানুষ তাদের দেখলে ভয় পেতে পারে। তবে কি তারা ভূত? তাই বা বিশ্বাস করি কেমন করে? ভূত-প্রেত তো কবির কল্পনা, খোকা-খুকিদের ভয় দেখিয়ে শান্ত করবার উপায়।
না কুমার, ভূত-টুত আমিও মানি না, আর বৃদ্ধ যে ভূতের ভয় দেখিয়েছেন তাও আমার মনে হয় না।
তবে?
কিছুই বুঝতে পারছি না। অবশ্য সেই দ্বীপে যদি এইরকম দানব-বেড়ালের আত্মীয়রা থাকে তাহলে সেটা বিশেষ ভয়ের কথা হবে বটে। কিন্তু বৃদ্ধ জন্তুর ভয় দেখাননি।
কুমার কিছুক্ষণ ভেবে বললে, দ্যাখো, আমার বোধহয় সেই বৃদ্ধ মিথ্যা কথাই বলেছেন। দ্বীপের ভেতর হয়তো কোনও অজানা রহস্য আছে। অন্য কেউ সে কথা টের পায়, হয়তো বৃদ্ধ তা পছন্দ করেন না। হয়তো সেইজন্যেই তিনি দাঁড়ি-মাঝিদের মিথ্যে ভয় দেখিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
বিমল বললে, কিন্তু সে রহস্যটা কী? যে দ্বীপে এমন দানব-বেড়াল পাওয়া যায় সে দ্বীপ যে রহস্যময় তাতে আর সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানে এমন অসম্ভব বেড়ালের চেয়েও অসম্ভব আরও কোনও রহস্য আছে কি না সেইটেই আমি জানতে চাই।
কুমার বললে, মঙ্গলগ্রহে, ময়নামতীর মায়াকাননে, আসাম আর আফ্রিকার বনেজঙ্গলে, সুন্দরবনে অমাবস্যার রাতে আর হিমালয়ের দানবপুরীতে অনেক অসম্ভব রহস্যই আমরা দেখলুম! তার চেয়েও বেশি অসম্ভব কোনও রহস্য যে আর ত্রিজগতে থাকতে পারে একথা আমার বিশ্বাস হয় না। প্রেতলোক যদি সম্ভবপর হত, তাহলেও বরং নতুন কিছু দেখবার সম্ভাবনা ছিল! কিন্তু প্রেত যখন মানি না তখন নতুন কিছু দেখবার আশাও রাখি না।
বিমল মাথা নেড়ে বললে, না কুমার, ত্রিজগতে নূতনত্বের অভাব কোনওদিনই হয়নি। ধরো ওই চন্দ্রলোক! ওর আগাগোড়াই তুষারে ঢাকা, ওকে তুষারের এক বিরাট মরুভূমি বললেও অত্যুক্তি হয় না। অথচ পণ্ডিতেরা বলেন ওর ভেতরেও নাকি জীবের অস্তিত্ব আছে। তাদের মতে সে-সব জীব মোটেই মানুষের মতো দেখতে নয়, তাদের দেখলে হয়তো আমরা নতুন কোনও জন্তু বলেই মনে করব, যদিও মস্তিষ্কের শক্তিতে হয়তো মানুষেরও চেয়ে তারা উন্নত। হয়তো তারা বাস করে তুষার মরুভূমির পাতালের তলায়, যেখানে গেলে আমাদেরও তারা নতুন কোনও জন্তু বলেই সন্দেহ করবে! তুমি কি বলতে চাও কুমার, সেখানে গেলে তুমি এক নতুন জগৎ দেখবার সুযোগ পাবে না?
কুমার বললে, কিন্তু আপাতত চন্দ্রলোকের কথা তো হচ্ছে না, আমরা থাকব এই পায়ে-চলা মাটির পৃথিবীতেই! সুন্দরবনের প্রান্তে, গঙ্গাসাগরের কাছে ছোট্ট এক দ্বীপ, কলকাতা থেকে সে আর কত দূরই বা হবে? সেখানে যে বিশেষ কোনও নতুনত্ব আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে আমি তা বিশ্বাস করি না।
বিমল মাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললে, দ্যাখো কুমার, একসার পিঁপড়ে খাবার মুখে করে কোথায় যাচ্ছে!
কুমার বললে, ওই যে, চৌকাঠের তলায় ওই গর্তের ভেতরে গিয়ে ওরা ঢুকছে।
হুঁ। এটা তোমার নিজের বাড়ি, এখানকার প্রতি ধূলিকণাটিকেও তুমি চেনো। কিন্তু তোমারই ঘরের দরজার তলায় পিঁপড়েদের যে উপনিবেশ আছে, তার কথা তুমি কিছু বলতে পারো?
তুচ্ছ প্রাণী পিঁপড়ে, তার সন্ধান আবার রাখব কি?
তুচ্ছ প্রাণী পিঁপড়ে, কিন্তু এবার থেকে তাদেরও সন্ধান রাখবার চেষ্টা কোরো। মানুষের তুলনায় তাদের মস্তিষ্ক হয়তো ওজনে বেশি হবে না; কিন্তু সন্ধান রাখলে জানতে পারবে, মানুষের সমাজের চেয়ে পিঁপড়ের সমাজ অনেক বিষয়েই উন্নত। পৃথিবীতে কর্তব্যে অবহেলা করে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু লক্ষ-লক্ষ পিঁপড়ের ভেতরে এমন একটি পিঁপড়েও তুমি পাবে না, নিজের কর্তব্যে যার মন নেই। যার যা করবার নিজের ইচ্ছাতেই সে তা অশ্রান্তভাবে করে যাচ্ছে। পিঁপড়দের দেশে অবাধ্য ছেলেমেয়ে একটিও নেই। তাদের যে রানি সেও এক মুহূর্ত অলস হয়ে বসে থাকে না, অষ্টপ্রহরই ডিমপ্রসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকে। একদল পিঁপড়ে সর্বদাই করছে রানির সেবা-যত্ন, একদল করছে একমনে ডিম আর বাচ্চাদের পরিচর্যা, আর একটা বৃহৎ দলের কাজ খালি বাহির থেকে রসদ বহন করে আনা। এদের উপনিবেশের ভেতরটা পরীক্ষা করার সুযোগ পেলে অতি বড় বুদ্ধিমান মানুষও অবাক হয়ে যাবে। তার ভেতরে হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা আছে, রসদখানা আছে, ডিম রাখবার আলাদা মহল আছে, এমনকী পিঁপড়েদের উপযোগী সবজি বাগান পর্যন্ত আছে। কুমার, তুমি বোধহয় জানো না যে, পিঁপড়েরাও গাভী পালন করে। অবশ্য সে গাভীকে, দেখতে আমাদের গাভীর মতো নয়, কিন্তু তারা দুগ্ধদান করবে বলেই তাদের পালন করা হয়।
কুমার সবিস্ময়ে বললে, বলো কী বিমল, এ-সব কথা যে আমার কাছে একেবারে নতুন বলে মনে হচ্ছে!
অথচ এই পিঁপড়েদের উপনিবেশ তোমার ঠিক পায়ের তলাতেই! পৃথিবীতে তুমি নতুনত্বের অভাব বোধ করছ, কিন্তু নিজের পায়ের তলায় কি আছে তার খবর তুমি রাখ না! কেবল তুমি নও, অধিকাংশ মানুষেরই স্বভাব হচ্ছে এইরকম। যাদের জানবার আগ্রহ আছে, জ্ঞানলাভের প্রবৃত্তি আছে, আর দেখবার মতো চোখ আছে, জীবনে তাদের কোনওদিনই নতুনত্বের অভাব হয় না।
