দিন-পনেরো আগে একটি বুড়ো ভদ্রলোক আমার নৌকো ভাড়া করতে আসেন। সে বাবুকে আমি আগে কখনও দেখিনি। তাঁর মুখেই শুনলুম, তিনি অন্য একখানা নৌকো করে এখানে এসেছেন, সেই নৌকোর মাঝির সঙ্গে ঝগড়া হওয়াতে সে তাকে আমাদের গ্রামে নামিয়ে দিয়েছিল।
তিনি গঙ্গাসাগরের কাছাকাছি কোনও একটা জায়গায় যেতে চান। যে তাঁকে নিয়ে। যাবে তাকে তিনি রীতিমতো বকশিশ দিয়ে খুশি করবেন, এমন কথাও আমাকে জানালেন। সঙ্গে-সঙ্গে একখানা দশ টাকার নোটও আগাম ভাড়া বলে আমার হাতে গুঁজে দিলেন। আগাম এতগুলো টাকা পেয়ে আমি তখনই তাঁকে নিয়ে যেতে রাজি হলুম। তার সঙ্গে ছিল মস্তবড় একটা সিন্ধুক, এত বড় সিন্ধুক আমি আর কখনও দেখিনি। আমরা সকলে মিলে ধরাধরি করে সেই সিন্ধুকটাকে নৌকোর ওপরে নিয়ে গিয়ে তুললুম। তোলবার সময় শুনতে পেলুম, সিন্ধুকের ভেতর থেকে কি-একটা জানোয়ার বিকট গর্জন করছে!
আমরা ভয় পাচ্ছি দেখে বাবুটি বললেন, তোমাদের কোনও ভয় নেই, ওর ভেতরে একটা খুব বড়-জাতের বনবেড়াল, আছে! সে যে-কোন জাতের বন-বেড়াল তা বলতে পারি, বনবেড়াল যতই বড় হোক তার চিৎকার এমন ভয়ানক হয়, আমি তা জানতুম না! আমি বললুম বাবু, এ যদি সিন্ধুক থেকে বেরিয়ে পড়ে, তাহলে আমাদের কোনও বিপদ হবে না তো? তিনি হেসে বললেন, না, সিন্ধুকের ভেতরে ও-বেড়ালটা শিকলে বাঁধা আছে।
কিন্তু নৌকো নিয়ে আমাদের বেশিদূর যেতে হল না। সমুদ্রের কাছে গিয়ে আমরা হঠাৎ এক ঝড়ের মুখে পড়লুম। ঢেউয়ের ধাক্কা থেকে নৌকো বাঁচানোই দায়! দাঁড়িরা সব বেঁকে বসল, বললে–ওই ভারী সিন্ধুকটা নৌকো থেকে নামিয়ে না দিলে কারুকেই আজ প্রাণে বাঁচতে হবে না!
কিন্তু তাদের কথায় সেই বুড়ো ভদ্রলোকটি প্রথমটায় কিছুতেই সায় দিতে চাইলেন না। শেষটা দাঁড়িরা যখন নিতান্তই রুখে উঠল, তখন তিনি নাচার হয়ে বললেন, তোমাদের যা খুশি করো, আমি আর কিছু জানি না!
সকলে মিলে সেই বিষম ভারী সিন্ধুকটা তখনি জলে ফেলে দেওয়ার জোগাড় করলে। কেবল আমি বাধা দিয়ে বললুম, ওর ভেতরে যে বনবেড়ালটা আছে, তার কি হবে? দাঁড়িরা বললে বনবেড়ালটাকে বাইরে বার করলে আমাদের কামড়ে দেবে, তার চেয়ে ওর জলে ডুবে মরাই ভালো!
ভদ্রলোকও ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, না, না, ওকে বাইরে বার করতে হবে না, সিন্ধুক শুদ্ধই ওকে জলে ফেলে দাও!
সিন্ধুকটাকে আমরা তখন জলের ভেতরে ফেলে দিলুম। তার একটু পরেই জলের ভেতর থেকে কি-একটা মস্ত জানোয়ার ভেসে উঠল। সেটা যে কী জানোয়ার, দুর থেকে আমরা ভালো করে বুঝতে পারলুম না–বোঝবার সময়ও ছিল না, কারণ আমরা সবাই তখন নৌকো নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছি।
ঝড়ের মুখ থেকে অনেক কষ্টে নৌকোকে বাঁচিয়ে, সন্ধ্যার সময় আমরা সমুদ্রের মুখে মাতলা নদীর মোহনায় গিয়ে পড়লুম। দুরে একটা দ্বীপ দেখা যাচ্ছিল, আঙুল দিয়ে সেইটে দেখিয়ে ভদ্রলোক বললেন, আমাকে তোমরা ওইখানে নামিয়ে দাও। আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, এই অসময়ে ওই দ্বীপে নেমে আপনি কোথায় যাবেন?
ভদ্রলোক একটু বিরক্ত ভাবেই বললেন, সে কথায় তোমাদের দরকার নেই, যা বলছি শোনো। আমরা আর কিছু না বলে নৌকো বেয়ে দ্বীপের কাছে গিয়ে পড়লুম। তখন বেশ অন্ধকার হয়েছে দ্বীপের বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে আর নজর চলে না।
এ-দ্বীপে আমরা কখনও আসিনি, এখানে যে-কোনও মানুষ থাকতে পারে তাও আমাদের বিশ্বাস হয় না। কিন্তু বুড়ো ভদ্রলোকটি অনায়াসেই নৌকো থেকে নেমে সেই অন্ধকারের ভেতরে কোথায় মিলিয়ে গেলেন।
তখন ভাটা আরম্ভ হয়েছে। নৌকো নিয়ে আর ফেরবার চেষ্টা না করে সে-রাতটা আমরা সেইখানেই থাকব স্থির করলুম। নৌকো বাঁধবার চেষ্টা করছি, এমন সময় অন্ধকারের ভেতর থেকে সেই ভদ্রলোকের গলায় শুনলুম–তোমরা এখানে নৌকো বেঁধো না, শিগগির পালিয়ে যাও, নইলে বিপদে পড়বে!
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, এখানে থাকলে বিপদ হবে কেন বাবু?
ভদ্রলোক খুব কড়া গলায় বললেন, আমার কথা যদি না শোনো, তাহলে তোমরা কেউ আর প্রাণে বাঁচবে না।
তবুও আমি বললুম, বাবু, সারাদিন খাটুনির পর এই ভাটা ঠেলে আমরা নৌকো বেয়ে যাই কি করে? এখানে কিসের ভয়, বলুন না আপনি? বুনো জন্তুর, না ডাকাতের?
ভদ্রলোক বললেন, জন্তুও নয়, ডাকাতও নয়, এ-দ্বীপে যারা আছে তাদের দেখলেই ভয়ে তোমাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবে! শিগগির সরে পড়। আমি আর একবার জিজ্ঞাসা করলুম, তবে এমন ভয়ানক জায়গায় আপনি নামলেন কেন?
ভদ্রলোক হা-হা-হা-হা করে হেসেই চুপ করলেন, তারপর তার আর কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। আমাদেরও মনে কেমন একটা ভয় জেগে উঠল, সেখান থেকে তখুনি নৌকো চালিয়ে তাড়াতাড়ি পালিয়ে এলুম।
বাবু, আমার বিশ্বাস, আপনি এই যে রাক্ষুসে বেড়ালটাকে মেরেছেন, সেই সিন্ধুকের ভেতরে এইটেই ছিল।
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ । নূতনত্ব কী?
বিমলের গল্প শেষ হলে পর কুমার খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে-ধীরে বললে, সেই বুড়ো লোকটি যে কে, সে-কথা তুমি জানতে পেরেছ কি?
তাই জানবার জন্যেই তো আমার এত আগ্রহ! তবে মাঝির মুখে শুনেছি, লোকটি নাকি বাঙালি, আর বুড়ো হলেও তিনি খুব লম্বাচওড়া জোয়ান। আর তাঁর মেজাজ বড় কড়া।
কিন্তু বিমল, সে দ্বীপে এমন কী থাকতে পারে? বৃদ্ধ কি মিছামিছি ভয় দেখিয়েছেন? দ্বীপে ভয়ের কিছু থাকলে তিনি একলা সেখানে নামবেন কেন?
