স্থলচরেরা আমাকে বয়কট করেছে দেখে শেষটা জলচরের দিকে নজর দিলুম। আমার সুনজরে পড়ে একটা কুমির আর একটা ঘড়িয়াল তাদের পশু-জীবন থেকে ইচ্ছার বিরুদ্ধেই মুক্তিলাভ করলে! তারপর তারাও আর আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হল না। মনটা রীতিমতো তিক্ত বিরক্ত হয়ে উঠল। ভাবলুম, কাজ নেই বনেজঙ্গলে ঘুরে, ঘরের ছেলে আবার ঘরেই ফেরা যাক!
ঠিক এমনি সময়ে এক অদ্ভুত খবর পাওয়া গেল। মোহনপুর থেকে মাইল-পনেরো তফাতে আছে রাইপুর গ্রাম। রাইপুরের একজন লোক এসে হঠাৎ একদিন খবর দিলে, সেখানকার জঙ্গলে নাকি কি একটা আশ্চর্য জীব এসে হাজির হয়েছে। সে জীবটাকে কেউ বলে বাঘ, কেউ বলে গন্ডার, কেউ-বা বলে অন্যকিছু। যদিও তাকে ভালো করে দেখবার অবসর কেউ পায়নি, তবু এক বিষয়ে সকলেই একমত। আকারে সে নাকি প্রকাণ্ড–যে-কোনও মোষের চেয়েও বড়। তার ভয়ে রাইপুরের লোকেরা রাত্রে ঘুম ভুলে গিয়েছে।
কুমার শুধলো, কেন? সে জীবটা মানুষ-টানুষ বধ করেছে নাকি?
না। সে এখনও মানুষ-টানুষ বধ করতে পারেনি বটে, তবে রাইপুর থেকে প্রতি রাত্রেই অনেক হাঁস, মুরগি, ছাগল আর কুকুর অদৃশ্য হয়েছে। এর মধ্যে আর একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, সেই অজানা জীবটার কবলে পড়ে রাইপুরের অনেক বেড়াল ভবলীলা সাঙ্গ করেছে বটে, কিন্তু বেড়ালগুলোর দেহ সে ভক্ষণ করেনি।
কুমার বললে, কেন, এর মধ্যে তুমি উল্লেখযোগ্য কী দেখলে?
বিমল বললে, উল্লেখযোগ্য নয়? হাঁস, মুরগি, ছাগল আর কুকুরগুলোর দেহ পাওয়া যায়নি কিন্তু প্রত্যেক বেড়ালেরই মৃতদেহ পাওয়া যায় কেন? সেই অজানা জীবটা আর সব পশুর মাংস খায়, কিন্তু বেড়ালের মাংস খায় না কেন? আর একটা আশ্চর্য ব্যাপার শোনো। দু-তিনজন মানুষও তার সামনে পড়েছিল। তারা তার গর্জন শুনেই পালিয়ে এসেছে, কিন্তু তাদের আক্রমণ করবার জন্যে সে পিছনে-পিছনে তেড়ে আসেনি।
কুমার কৌতূহল-ভরে বললে, তারপর?
বিমল বললে, তারপর আর কী, এমন একটা কথা শুনে আর কি স্থির হয়ে বসে থাকা যায়! আমিও মোটমাট বেঁধে নিয়ে রাইপুরে যাত্রা করলুম–
কুমার বাধা দিয়ে বলে উঠল, তাহলে নিশ্চয়ই তুমি সে জীবটাকে দেখে এসেছ?
হ্যাঁ। বনেজঙ্গলে দুই রাত্রি বাস করবার পর তৃতীয় রাত্রে তার সাক্ষাৎ পেলুম। আমি একটা গাছের ওপরে বন্দুক হাতে নিয়ে বসে-বসে ঢুলছিলুম। রাত তখন বারোটা হবে। আকাশে খুব অল্প চাঁদের আলো ছিল, অন্ধকারে ভালো নজর চলে না। চারিদিকের নীরবতার মাঝখানে একটা গাছের তলায় হঠাৎ শুকনো পাতার মড়মড় শব্দ কানে এল। শব্দটা হয়েই থেমে গেল। সেইদিকে তাকিয়ে দেখি, অন্ধকারের ভেতরে ভাটার মতন বড়-বড় দুটো আগুন-চোখ জেগে উঠেছে! সে চোখদুটো আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখদুটো কোন জানোয়ারের আমি বোঝবার চেষ্টা করলুম না, তারপরেই বন্দুকে লক্ষ্য স্থির করে ঘোড়া টিপে দিলুম। সঙ্গে সঙ্গে বিষম এক আর্তনাদ ও ছটফটানির শব্দ! সে আর্তনাদ বাঘ-ভাল্লুকের ডাকের মতন নয়, আমার মনে হল যেন এক দানব-বেড়াল আহত হয়ে ভীষণ চিৎকার করছে।
খানিক পরে আর্তনাদ ও ছটফটানির শব্দ ধীরে-ধীরে থেমে এল। কিন্তু আমি সেই রাতের অন্ধকারে গাছের ওপর থেকে আর নামলুম না। গাছের ডালেই হেলান দিয়ে কোনওরকমে রাতটা কাটিয়ে দিলুম। সকালবেলায় চারদিকে লোকজনের সাড়া পেয়ে বুঝলুম, রাত্রে আমার বন্দুকের শব্দ আর এই অজানা জন্তুটার চিৎকার শুনেই এত ভোরে সবাই এখানে ছুটে এসেছে। আস্তে-আস্তে নীচে নেমে পাশের ঝোপের ভেতরে গিয়েই দেখতে পেলুম, একটা আশ্চর্য ও প্রকাণ্ড জীব সেখানে মরে পড়ে রয়েছে। জন্তুটা যে-কোনও বাঘের চেয়ে বড়। তাকে দেখতে বাঘের মতন হলেও সে মোটেই বাঘ নয়। তার গায়ের রং ধবধবে সাদা, কিন্তু মুখটা কালো। আসলে তাকে একটা অসম্ভবরকম প্রকাণ্ড বেড়াল ছাড়া আর কিছুই বলা চলে না।
কুমার সবিস্ময়ে বললে, তুমি বল কি হে বিমল, বাঘের চেয়েও বড় বেড়াল? এও কি সম্ভব?
বিমল বললে, কী যে সম্ভব আর কী যে অসম্ভব তা আমি জানি না। আমি স্বচক্ষে যা দেখেছি তাই বলছি। কিন্তু এখনও সবকথা শেষ হয়নি।
কুমার বললে, এর ওপরেও তোমার কিছু বলবার আছে নাকি? আচ্ছা, শুনি।
বিমল বললে, বেড়ালটার দেহ পরীক্ষা করতে করতে আর-একটা অদ্ভুত ব্যাপার চোখে পড়ল। তার গলায় ছিল একটা ইস্পাতের বস আর-একটা ছেঁড়া শিকল। দেখেই বোঝা গেল, এ-বেড়ালটাকে কেউ বেঁধে রেখে দিয়েছিল, কোনগতিকে শিকল ছিঁড়ে এ পালিয়ে এসেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এমন একটা বিচিত্র বেড়াল এ-অঞ্চলে যদি কারুর বাড়িতে বাঁধা থাকত তাহলে সকলে তার কথা নিশ্চয়ই জানতে পারত। কিন্তু কেউ এই বেড়াল ও তার মালিক সম্বন্ধে কোনও কথাই বলতে পারলে না। এই বেড়ালের কথা লোকের মুখে-মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। নানা গ্রাম থেকে দলে দলে লোক এসে তাকে দেখতে লাগল। এমন একটা অসম্ভব জীব দেখে সকলে হতভম্ভ হয়ে গেল।
কুমার বললে, এইখানেই তাহলে তোমার কথা ফুরুল?
বিমল বললে, মোটেই নয়। এইখানেই যদি আমার কথা ফুরিয়ে যেত, তাহলে তোমায় নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমি আবার কলকাতায় ফিরে আসতুম না।
কুমার উৎসাহিত ভাবে বললে, বটে-বটে, তাই নাকি?
বিমল বললে, বিকেলবেলায় দূর গ্রাম থেকে রাইপুরে একটা লোক এল, ওই বেড়ালটাকে দেখবার জন্যে। এমনভাবে সে বেড়ালটাকে দেখতে লাগল যাতে করে আমার মনে সন্দেহ হল যে, এই লোকটার এ-সম্বন্ধে কিছু জানা আছে। তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করাতে বললে, সে হচ্ছে মাঝি, নৌকো চালানোই তার জীবিকা। আমি জানতে চাইলুম, এই বেড়ালটাকে সে আগে কখনও দেখেছে কিনা? খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে ও কিছু ইতস্তত করে সে বললে, বাবু, এই রাক্ষুসে বেড়ালটাকে আমি আগে কখনও দেখিনি বটে, কিন্তু বোধহয় এর ডাক আমি শুনেছি। তার কথা শুনে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে উঠল। তাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে সব কথা জানতে চাইলুম। সে যা বললে তা হচ্ছে এই
