মোহনলাল কৌতুক ভরে বললে, ও আপনার কী বুদ্ধি কুমারবাবু! আপনি ঠিক আন্দাজ করেছেন। আমি ভালো লোক নই।
কুমার বললে, বাজে কথায় ভুলিয়ে সেবার আমাদের চোখে আপনি খুব ধুলো দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের সেটি আর হচ্ছে না।
মোহনলাল বললে, ওই শুনুন কারা আসছে!
নিচের সিঁড়িতে ধুপ ধুপ করে অনেকগুলো দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল–যেন কারা বেগে ওপরে উঠছে! এ আবার কোন শত্রুর দল আক্রমণ করতে আসছে? কুমার তাড়াতাড়ি উঠে দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াল!
ঝড়ের মতো যারা ঘরের ভিতর এসে ঢুকল, তারা শত্রু নয়। চন্দ্রবাবু আর তার পাহারাওয়ালারা।
চন্দ্রবাবু সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, আরে, এ কী! কুমার, তুমি এখানে।
কুমার বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি মোহনলালবাবুর সঙ্গে আলাপ করছিলুম!
চন্দ্রবাবু বললেন, মোহনলাল? কোথায় সে দুরাত্মা? আমিও তো তারই খোঁজে এখানে এসেছি! আজ আমি ভুলু-ডাকাতের দলকে গ্রেপ্তার করেছি, কেবল ভুলুকেই পাইনি। আমার বিশ্বাস, মোহনলাল ভুলু-ডাকাত ছাড়া আর কেউ নয়।
কুমার ফিরে দেখলে, মোহনলাল আর সে ঘরে নেই!
.
চোদ্দো । মোহনলাল গ্রেপ্তার
মোহনলাল যেখানে বসে ছিল, তার পিছনেই একটি বন্ধ দরজা–এ-ঘর থেকে আর একটা ঘরে যাবার জন্যে।
কুমার বললে, মোহনলাল নিশ্চয়ই ও-ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে?
বাঘের মতো সেই দরজার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে চন্দ্রবাবু বললেন, মোহনলাল, এবারে আর তোমার বাঁচোয়া নেই! সমস্ত বাড়ি আমি ঘেরাও করে ফেলেছি, একটা মাছি পর্যন্ত এখান থেকে বেরুতে পারবে না। ভালো চাও দরজা খোলো।
ঘরের ভিতর থেকে সাড়া এল, আজ্ঞে, আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন কেন? মোহনলাল তো এ ঘরে নেই!
চন্দ্রবাবু রাগে গরগর করতে করতে বললেন, সেদিনকার মতো আবার আজ ঠাট্টা করা হচ্ছে। তুমিই তো মোহনলাল। শিগগির বেরিয়ে এসো বলছি?
আজ্ঞে, ভুল করছেন! আমি মোহনলাল নই।
আচ্ছা, আগে বেরিয়ে এসো তো, তার পর দেখা যাবে তুমি কোন মহাপুরুষ!
আজ্ঞে, আবার ভুল করছেন! আমি মহাপুরুষও নই।
চন্দ্রবাবু গর্জন করে বললেন, তবে রে ছুঁচো! ভাঙলাম তাহলে দরজা! বলেই তিনি দরজার ওপরে সজোরে পদাঘাত করতে লাগলেন।
আজ্ঞে করেন কী করেন কী! দরজা ভাঙলে বাড়িওয়ালা বকবে যে! আচ্ছা মশাই, আমি দরজা খুলে দিচ্ছি এই নিন? হঠাৎ দরজাটা খুলে গেল।
চন্দ্রবাবু রিভলভার বাগিয়ে ধরে, ঘরের ভিতরে ঢুকতে গিয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর দুই চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত করে বাধো বাধো স্বরে তিনি বললেন, এ কী! কে আপনি?
কুমারও অবাক! ও-ঘরের দরজার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে তো মোহনলাল নয়, সে যে বিমল, যার সঙ্গে কুমার দুবার যকের ধন আনতে গিয়েছিল, মঙ্গল গ্রহের বামনাবতারদের সঙ্গে লড়াই করেছিল, ময়নামতীর মায়াকাননের দানবদের সঙ্গে প্রাণ নিয়ে খেলা করেছিল। বিমল বিমল, তার প্রিয়বন্ধু বিমল, মানসপুরে এসে পর্যন্ত যার অভাব কুমার প্রতিদিন প্রতি পদে অনুভব করেছে, এমন হঠাৎ তারই দেখা যে আজ এখানে পাওয়া যাবে, স্বপ্নেও সে তা কল্পনা করতে পারেনি।
কুমার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, বিমল, বিমল, তুমি কোথা থেকে এলে! তুমি কি আকাশ থেকে খসে পড়লে?
বিমল হাসতে হাসতে বললে, না বন্ধু না! মোহনলাল রূপে গোড়া থেকেই আমি তোমার সঙ্গে সঙ্গে আছি!
চন্দ্রবাবু হতভম্বের মতো বললেন, অ্যা, বলেন কি? আপনিই মোহনলাল?।
আজ্ঞে হ্যাঁ? এখন আসুন চন্দ্রবাবু, আমার হাতে লোহার বালা পরিয়ে দিন।
ধাঁ করে কুমারের একটা কথা মনে পড়ে গেল, তাড়াতাড়ি সে বলে উঠল, আচ্ছা। বিমল, বাঘের গর্তে ডাকাতের কবল থেকে
বিমল বললে, হ্যাঁ আমিই তোমাকে উদ্ধার করেছিলুম। কিন্তু এজন্যে আমাকে ধন্যবাদ দেবার দরকার নেই!..কুমার, পিছন ফিরে দেখ, ঘরের ভেতরে ও আবার কে এল!
কুমার ফিরে দেখে, একমুখ হাসি নিয়ে, দুপাটি দাঁত বের করে আহ্লাদে আটখানা হয়ে তার পিছনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে বিমলের পুরাতন ভৃত্য রামহরি!
কুমার বললে, কী আশ্চর্য। তুমি আবার কোত্থেকে এলে?
রামহরি বললে, আরে দুয়ো কুমারবাবু, দুয়ো! তুমিও আমাদের চিনতে পারনি! আমি যে নীচে দরোয়ান সেজে থাকতুম। পরচুলোর দাড়ি-গোঁফ ফেলে আবার রামহরি হয়ে, এখন তোমার সঙ্গে দেখা করতে এলুম। আরে দুয়ো কুমারবাবু দুয়ো! কি ঠকানটাই ঠকে গেলে!
অসম্ভবের দেশে (উপন্যাস)
প্রথম পরিচ্ছেদ । অদ্ভুত জন্তু
সকালবেলায় উঠানের ধারে বসে কুমার তার বন্দুকটা সাফ করছিল। হঠাৎ পায়ের শব্দে মুখ তুলে দেখে, হাসিমুখে বিমল আসছে।
কুমার বিস্মিত স্বরে বললে, এ কি, বিমল যে! তুমি কবে ফিরলে হে?
আজকেই।
তোমার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরবার কথা ছিল না।
ছিল না। কিন্তু ফিরতে হল। তোমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে এসেছি।
কুমার অধিকতর বিস্ময়ে বললে, আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে! ব্যাপার কী?
গুরুতর। আবার এক ভীষণ নাটকের সূচনা!
কুমার উত্তেজিত ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, তাহলে এ নাটকে তুমি কি আমাকেও অভিনয় করবার জন্যে ডাকতে এসেছ?
তাছাড়া আর কী?
সাধু, সাধু! আমি প্রস্তুত! যাত্রা শুরু হবে কবে?
কালই।
কিন্তু তার আগে ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে কি?
তা বলব বইকী! শোনো। তুমি জানো, সুন্দরবনে আমি শিকার করতে গিয়েছিলুম। যে-জায়গাটায় ছিলুম, তার নাম হচ্ছে মোহনপুর। কিন্তু সেখানে গিয়ে শিকারের বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারি না। একটিমাত্র বাঘ পেয়েছিলুম, কিন্তু সেও আমার বুলেট হজম করে হয়তো খোশমেজাজে বহালতবিয়তেই তার বাসায় চলে গিয়েছে।
