দরজা খুলে গেল এবং ফাঁক দিয়ে দেখা গেল সেই পাকা আমের মতন বুড়ো খোট্টা দরোয়ানটার মুখ।
বাড়ির দোতলায় উঠে একটা ঘরের ভিতর ঢুকে একখানা চেয়ারের ওপরে ধপ করে বসে পড়ে মোহনলাল বললে, কুমারবাবু, বসুন। একটু হাঁপ ছেড়ে নিন।
খানিকক্ষর দুজনেই নীরব! তারপর প্রথমে কথা কইলে কুমার। বললে, মোহনলালবাবু, আপনার উদ্দেশ্য কি? যে-সময়ে আমার উচিত, চন্দ্রবাবুকে সাহায্য করা, ঠিক সেই সময়েই আমাকে আপনি এখানে টেনে আনলেন কেন?
মোহনলাল বললে, আপনার সাহায্য না পেলেও চন্দ্রবাবু হাহাকার করবেন না। আপনি না গেলেও তিনি যে আজ ভুলু-ডাকাতের দলকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন এ বিষয়ে আমার কোনও সন্দেহই নেই।
কুমার বললে, তবু আমার সেখানে যাওয়া উচিত।
মোহনলাল সে-কথার জবাব না দিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, কুমারবাবু আপনি Margaret A, Murrays Witch cult in Western Europe নামে বইখানা পড়েছেন।
এ-রকম খাপছাড়া প্রশ্নের অর্থ বুঝতে না পেরে কুমার বললে, না।
আপনি ডাইনি বিশ্বাস করেন?
ডাইনিদের অনেক গল্প শুনেছি বটে। সেসব গল্পে আমার বিশ্বাস হয় না। কিন্তু আপনি এমন সব উদ্ভট প্রশ্ন করছেন কেন?
মোহনলাল আবার প্রশ্ন করল, কুমারবাবু, hydanthroby কাকে বলে জানেন?
না।
ইউরোপের ডাইনিরা নাকি hydanthroby-র মহিমায় মানুষ হয়েও নেকড়ে-বাঘের আকার ধারণ করতে পারত।
কুমার বিরক্ত হয়ে বললে, পারত, তো পারত, তাতে আমাদের কি?
কুমারের বিরক্তি আমলে না এনে মোহনলাল বললে, আমাদের দেশেও অনেকে বলেন, মন্ত্রতন্ত্র বা বিশেষ কোনও ওষুধের গুণে মানুষ নাকি বাঘের আকার ধারণ করতে পারে।
এতক্ষণে কুমারের মাথায় ঢুকল মোহনলাল কি বলতে চায়! একলাফে উঠে পড়ে কুমার উত্তেজিত স্বরে বলল, মোহনলালবাবু, মোহনলালবাবু! তবে কি আপনার মতে এখানকার অমাবস্যার রাতের বাঘটাও হচ্ছে সেইরকম কোনও অস্বাভাবিক জীব?
মোহনলাল গম্ভীর স্বরে বললে, আমার কোনও মতামত, নেই। মানুষ যে বাঘ হতে পারে, একথা বিশ্বাস করতে আমার প্রবৃত্তি হয় না। বিজ্ঞানও তা মানে না কিন্তু মানসপুরে এই যেসব আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল, এর মূলেই বা কি রহস্য আছে?..গোড়া থেকে একবার ভেবে দেখুন। বাঘ দেখা দিয়েছে কেবল অমাবস্যার রাতে, ঠিক বারোটার সময়ে। সাধারণ পশুরা এমন তিথিনক্ষত্র বিচার করে ঘড়ি ধরে বেরোয় না এই অদ্ভুত বুদ্ধিমান বাঘের কবলে যারা পড়েছে, তারা সকলেই স্ত্রীলোক, আর তাদের সকলের গায়েই অনেক টাকার গহনা ছিল। সাধারণ বাঘ কেবল গহনাপরা স্ত্রীলোক ধরে না।…তারপর বুঝুন, আপনি আর আমি দুজনেই দুবার বাঘ দেখেছি, আপনি গুলি ছুঁড়েছেন, কিন্তু দুবারই বাঘের বদলে পাওয়া গেল মানুষকে অর্থাৎ পটলবাবুকে–প্রথমবারে আহত আর দ্বিতীয়বারে মৃত অবস্থায়। দুবারই বাঘের আবির্ভাব আমাদের চোখে পড়েছে, তার পায়ের দাগও দেখা গেছে, তার রক্তমাখা লোমও আমি পেয়েছি; কিন্তু তার দেহ অদৃশ্য হতেও আমরা দেখিনি অথচ তা খুঁজেও পাওয়া যায়নি। উপরন্তু দু দুবারই পটলবাবু যে কখন ঘটনাস্থলে এসেছেন, তা আমরা দেখতে পাইনি।…ইউরোপে এমনি মায়া-নেকড়ে বাঘের অসংখ্য কাহিনি আছে। সাংঘাতিক আঘাত পেয়ে যখন তারা মরেছে, তখন আবার মানুষেরই আকার পেয়েছে।
কুমার রুদ্ধশ্বাসে, অভিভূত স্বরে বলে উঠল, তাহলে আপনি কি বলতে চান যে, পটলবাবুই বাঘের আকার ধারণ করে–
মোহনলাল বাধা দিয়ে বললে, আমি ও-রকম কিছুই বলতে চাই না। আমি খালি দেখাতে চাই যে, সমস্ত প্রমাণ পরে-পরে সাজালে ঠিক যেন মনে হবে, কোনও মায়া-ব্যাঘ্রই মানসপুরের এই সব ঘটনার জন্যে দায়ী। যাঁরা এটা কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দেবেন, তাঁদেরও মতে আমি সায় দিতে রাজি আছি। মানুষ যে ব্যাঘ্র-মূর্তি ধারণ করতে পারে, এটা আমার বিশ্বাস হয় না–কারুকে আমি বিশ্বাস করতেও বলি না।
কুমার বললে, তবে
মোহনলাল আবার বাধা দিয়ে বললে, কিন্তু এক বিষয়ে আমার কোনওই সন্দেহ নেই। ভুলু-ডাকাত আর পটলবাবু একই লোক। নিজে সকলের সামনে নিরীহ ভালো মানুষটির মতন থেকে পটলবাবু তার ভাঙা বাড়ির অন্ধকুপের মধ্যে ডাকাতের দল পুষতেন। কালুসর্দার তারই দলের লোক। অমাবস্যার রাতে বাঘের উপদ্রবের সুযোগে, তাঁরই হুকুমে কালু দল নিয়ে ডাকাতি করতে বেরুত। নৌকোয় চড়ে সুড়ঙ্গ খাল দিয়ে ডাকাতেরা দল বেঁধে বাইরে বেরিয়ে আসত– গভীর রাত্রে কাজলা নদীর বুকে তাদের নৌকা আমি স্বচক্ষে দেখেছি।
কুমার বললে, সবই যেন বুঝলুম। কিন্তু আপনি কে?
খুব সহজ স্বরেই উত্তর হল, আমি? আমি হচ্ছি মোহনলাল। অত্যন্ত নিরীহ ব্যক্তি।
কুমার বললে, কিন্তু নিরীহ ব্যক্তির কাছে রিভলভার বন্দুক থাকে কেন?
মোহনলাল সহাস্যে বললে, সুন্দরবনে খুব নিরীহ ব্যক্তিরও রিভলভার-বন্দুক না হলে চলে না।
মানলুম কিন্তু তারাও রিভলভার বন্দুকের জন্যে লাইসেন্স নেয়। আপনার কি লাইসেন্স আছে?
না।
লাইসেন্স না নিয়ে রিভলভার-বন্দুক রাখে কেবল গুন্ডা, খুনে আর বদমাইশরা।
হু, একথা সত্য বটে।
তবে? কে আপনি বলুন।
মোহনলাল ঘর ঝাঁপিয়ে হো হো করে অট্টহাসি হেসে উঠল!
কুমার দৃঢ় স্বরে বললে, পুলিশের ভয়ে যে পালিয়ে বেড়ায়, সে কখনওই ভালো লোক নয়।
