উঃ, কী তাদের হুলের জোর, আর তাদের বিজয়-হুঁঙ্কার, আর কী তাদের অশ্রান্ত আক্রমণ। দেখতে-দেখতে কুমারের হাত-পা মুখ ফুলে উঠতে শুরু করল, নাকের ডগাটা দেখতে হল যেন দুগুণ বড় একটা টোপাকুলের মতো এবং গাল ও কপাল হয়ে গেল দাগড়া দাগড়া। মুখ। ও হাত-পা পেটের ভিতরে যথাসাধ্য গুঁজে কুণ্ডলী পাকিয়ে কুমার ঝোপের মধ্যে পড়ে রইল, যেন একটা কুমড়ো! ময়নামতীর মায়াকাননের মাংসের মস্ত পাহাড়ের মতো ডাইনসরও তাকে বোধ হয় এতটা কাবু করে ফেলতে পারত না। কুমার ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে লাগল–এ মশার পালের হাজার-হাজার হুলের খোঁচার চেয়ে অমাবস্যার রাতের সেই ভয়াবহ ব্যাঘ্রের থাবা তাবার কাছে এখন ঢের বেশি আরামের বলে মনে হল।
আচম্বিতে চারিদিক কেমন যেন অস্বাভাবিক ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। কুমার হাতের রেডিয়াম ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে, রাত বারোটা বাজতে মোটে দেড়-মিনিট দেরি আছে।
কি-একটা আসন্ন আতঙ্কের সম্ভাবনায় স্তম্ভিত অন্ধকার যেন আরও কালো হয়ে উঠল। অন্ধ রাত্রির বুক পর্যন্ত যেন ভয়ে টিপটিপ করতে লাগল–পাচা, বাদুড় ও চামচিকের মিলিত আর্তনাদে চারদিকের স্তব্ধতা যেন ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে গেল।–পোড়ো-বাড়ির অলি-গলিতে এতক্ষণ যারা নিশ্চিন্ত হয়ে লুকিয়েছিল, সেইসব অজানা নানা পশুর দল পর্যন্ত কি এক দুরন্ত বিভীষিকা দেখে প্রাণভয়ে বেগে ছুটে পালিয়ে যেতে শুরু করলে! এখন এ স্থান যেন মানুষ তো দূরের কথা বন্য পশুর পক্ষেও নিরাপদ নয়।
কুমার হাজার-হাজার মশার কামড় পর্যন্ত ভুলে গেল–তার বাঁ-হাত ধরে আছে বন্দুকটা এবং ডান হাত স্থির হয়ে আছে বন্দুকের ঘোড়ার উপরে!
হঠাৎ ও কী ও? অন্ধকারের বক্ষ ভেদ করে একটা আঁধারে লণ্ঠন হাতে নিয়ে আচম্বিতে এক মনুষ্য মূর্তি আবির্ভূত হল এবং এত তাড়াতাড়ি সাঁৎ করে সে দৌড়ে সেই ভীষণ শুড়িপথের ভিতরে মিলিয়ে গেল যে, কুমার তার মুখ পর্যন্ত দেখবার সময় পেলে না! তাকে মানুষের মতন দেখতে বটে, কিন্তু সত্যিই কি সে মানুষ?
চারিদিকে জীবজন্তুর ছুটোছুটি, পাচা-বাদুড় চামচিকের চ্যাঁচামেচি অকস্মাৎ থেমে গেল এবং পরমুহূর্তে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতার মধ্যে পোড়াবাড়ির অস্তিত্ব পর্যন্ত যেন বিলুপ্ত হয়ে গেল–
এবং তার পরেই সেই অপার্থিব স্তব্ধতা ছুটিয়ে দিল ব্যাঘ্রের ভৈরব গর্জন! একবার, দুবার, তিনবার সেই গর্জন জেগে উঠে পৃথিবীর মাটি থরথরিয়ে কাঁপয়ে আকাশ-বাতাসকে থমথমে করে দিলে–তারপর সব আবার চুপচাপ!
কয়েক মুহূর্ত কাটল। তারপর কুমারের চোখ দেখলে শুড়িপথের সামনে কি একটা ভয়ঙ্কর ছায়া তারা দৃষ্টি রোধ করে দাঁড়াল। পিছন থেকে কে চুপিচুপি বললে, ওই বাঘ! গুলি কর– গুলি কর!
কে যে একথা বললে, কুমারের তা আর দেখবার অবকাশ রইল না, তাড়াতাড়ি সে বন্দুকের ঘোড়া টিপে দিলে এবং সঙ্গে-সঙ্গে তার পিছন থেকেও কে বন্দুক ছুড়লে!
গুড়ুম! গুড়ুম! পরমুহূর্তেই প্রচণ্ড আর্তনাদের পর আর্তনাদ চতুর্দিক পরিপূর্ণ হয়ে গেল এবং এও বেশ বোঝা গেল যে, খুব ভারী একটা দেহ মাটির ওপরে পড়ে ছটফট করছে। অল্পক্ষণ পরে সব শব্দ থেমে গেল।
পিছন থেকে আবার কে বললে, শান্তি! অমাবস্যার রাতে আর এখানে বাঘ আসবে না!
কুমার একলাফে উঠে ফিরে দাঁড়িয়ে টর্চটা জ্বেলে ফেললে।
পিছনে দাঁড়িয়ে বন্দুক হাতে করে মোহনলাল!
কুমার সবিস্ময়ে বললে, আপনি?
হ্যাঁ আমি। খানিক আগে আমাকেই আপনি ঝোপে-ঝাপে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।
তাহলে আমাকে আর চন্দ্রবাবুকে চিঠি লিখেছিলেন আপনিই?
হ্যাঁ। কিন্তু সেকথা এখন থাক, আগে দেখা যাক বাঘটা মরেছে কি না।
কুমার টর্চের আলো শুঁড়িপথের দিকে ফেলে ধীরে-ধীরে এগিয়ে গেল।…তার পরেই অত্যন্ত আশ্চর্য স্বরে সে বলে উঠল, কী সর্বনাশ! বাঘটা কোথায় গেল? ওখানে ও যে একটা মানুষের দেহ পড়ে রয়েছে।
দেহটার কাছে গিয়ে মোহনলাল কিছুই যেন হয়নি, এমনি সহজ স্বরে বললে, হ্যাঁ, এ হচ্ছে ভুলু-ডাকাতের দেহ। এর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখুন।
যা দেখা গেল, তাও কি সম্ভব? কুমারের মনে হল সে যেন কি একটা বিষম দুঃস্বপ্ন দেখছে।
মাটির ওপরে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে পটলবাবুর মৃতদেহ!
কুমার অভিভূত কণ্ঠে বলে উঠল, অ্যাঃ! এ তো বাঘও নয়, ভুলু-ডাকাতও নয়– এ যে পটলবাবু!
মোহনলাল বললে, পটলবাবু? কিন্তু তার মুখের কথা মুখেই রইল, হঠাৎ দূর থেকে ঘন-ঘন অনেকগুলো বন্দুকের গর্জন শোনা গেল।
কুমার চমকে উঠে বললে, ও আবার কি?
ভুলু-ডাকাতের দলের সঙ্গে পুলিশের যুদ্ধ হচ্ছে। শিগগির আমার সঙ্গে আসুন বলেই কুমারকে হাত ধরে টেনে নিয়ে মোহনলাল দ্রুতপদে ছুটতে আরম্ভ করলে!
.
তেরো। আশ্চর্য কথা
কুমারের হাত ধরে মোহনলাল ছুটতে ছুটতে একটা চৌমাথায় এসে পড়ল। বাঁ-হাতি পথটা গেছে। কাজলা নদীর দিকে–যেখানে সুড়ঙ্গ-খালের সামনে ভুলু-ডাকাতের দলের সঙ্গে পুলিশের লড়াই বেধেছে!
মোহললাল সে-পথও ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল।
কুমার বিস্মিত হয়ে বললে, একী মোহনলালবাবু! আমরা নদীর দিকে যাব যে!
না
না। তবে আমরা কোথায় যাচ্ছি?
আমার বাসায়।
সেখানে কেন?
দরকার আছে বলেই সেখানে যাচ্ছি। কুমারবাবু, এখন কোনও কথা কইবেন না, চুপ। করে আমার সঙ্গে আসুন…বাসায় দরজায় এসে ধাক্কা মেরে মোহনলাল বললে, ওরে, আমি এসেছি। শীগগির দরজা খোল।
