অন্ধকারকে আরও ঘন করে তুলে ওই তো পটলবাবুর প্রকাণ্ড ভগ্ন অট্টালিকা সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। তবে দেওয়ালকে শক্ত শিকড় দিয়ে জড়িয়ে ধরে যে সব বড় বড় অশ্বথ বট মাথা খাড়া করে আছে, প্রবল বাতাসে নিজেরা দুলতে-দুলতে তারা যেন অন্ধকারকেও দুলিয়ে দিয়ে বলছে–সর-সর-সর, মরমর-মর মর! কুমারের মনে হল, অন্ধকার-রাজ্যের ভিতর থেকে যেন সজাগ ভূতুড়ে পাহারাওয়ালারা কথা কইছে!
আন্দাজে-আন্দাজে সে সেই মস্তবড় ভাঙা সিং-দরজার তলায় গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু অন্ধকারে আর তো এগোনো চলে না। কুমার কান পেতে খুব তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলে! কিন্তু দেখাও যায় না এবং গাছপালায় মর্মর শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনাও যায় । সে তখন টর্চলাইটটা টিপে মাঝে-মাঝে আলো জ্বেলে ধীরে-ধীরে অগ্রসর হতে লাগল।
আবার সেইসব বিভীষিকা! মাথার ওপরে উড়ন্ত প্রেতাত্মার মতো ঝটপট ঝটপট করে বাদুড়ের দল যাচ্ছে আর আসছে, যাচ্ছে আর আসছে,দু-দুটো গোখরো সাপ ফণা তুলে ফোঁস করে উঠেই টর্চলাইটের তীব্র আলোয় ভয় পেয়ে বিদ্যুতের মতন এঁকেবেঁকে পালিয়ে গেল, চকমিলানো ঘরগুলোর ও দালানের আনাচ-কানাচ থেকে যেন কাদের হিংসুক, ক্ষুধিত ও জ্বলজ্বলে চোখ দেখা যায়। দিনের বেলাতেই যে নির্জন, বিপদপূর্ণ বাড়ির ভীষণতা মনকে একবারে কাবু করে দেয় অমাবস্যার কালো রাতে সে-বাড়ি যে আরও কত ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে, কুমারের আজ সেটা আর বুঝতে বাকি রইল না! তবু সেদিন মোহনলাল সঙ্গে ছিল, আর আজ সে একা! কুমারের প্রাণ খুব কঠিন, তাই এখনও সে অটল পদে এগিয়ে যাচ্ছে? অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হয়তো অজ্ঞান হয়ে পড়ত।
কুমার ভয় পেলে না বটে, কিন্তু তারও বার বার মনে হতে লাগল, এই প্রকাণ্ড পোড়ো-বাড়িটা হানাবাড়ি না হয়ে যায় না।–এ হচ্ছে নিষ্ঠুর ডাকাত-জমিদারের বাড়ি, কত মানুষ এখানে যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অপঘাতে মারা পড়েছে, কে তা বলতে পারে? নিশ্চয়ই তাদের আত্মার গতি হয়নি–নিশ্চয়ই তারা নিঃশব্দে কেঁদে-কেঁদে বাতাসে-বাতাসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে-ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং মাঝে-মাঝে উঁকি মেরে তাকে দেখছে।
আচম্বিত কুমার সচমকে শুনলে, ঠিক তার পিছনে কার পায়ের শব্দ! সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কান পেতে শুনলে! শব্দটব্দ কিছুই নেই! তারই শোনবার ভুল,–এই ভেবে কুমার আবার এগুলো। আবার সেই পায়ের শব্দ! আবার সে দাঁড়িয়ে পড়ল, সঙ্গে-সঙ্গে পায়ের শব্দও থেমে গেল!
না, তার শোনবার ভুল নয়। কেউ তার পিছু নিয়েছে। কিন্তু কে সে? ভূত, না মানুষ, না হিংস্র জন্তু?
সন্তর্পণে কুমার অগ্রসর হল, অমনি সেই পায়ের শব্দও জেগে উঠল।
হঠাৎ কুমার তিরবেগে ফিরে দাঁড়াল–তার একহাতে জ্বলন্ত টর্চলাইট আর একহাতে রিভলভার!
কারুকে দেখা গেল না বটে, কিন্তু উঠানের ওপরে একটা মস্ত ঝোপ দুলছে। কেউ কি ওখানে লুকিয়ে আছে? যদি সে তাকে দেখে থাকে, তাহলে তারও আর আত্মগোপন করা বৃথা!
অত্যন্ত সাবধানে, রিভলভারের ঘোড়ার ওপরে আঙুল রেখে, টর্চের পূর্ণ আলো ঝোপের ওপরে ফেলে কুমার পায়ে পায়ে সেই দিকে ফিরে গেল।
ঝোপের সুমুখে গিয়ে কুমার শুনিয়ে-শুনিয়ে বললে, যদি কেউ এখানে থাকো, তাহলে বেরিয়ে এসো,নইলে এই আমি গুলি করলুম।
কোনও সাড়া নেই!–ভালো করে সে তখন ঝোপটা নেড়ে-চেড়ে দেখলে, কিন্তু কিছুই আবিষ্কার করতে পারলে না কেবল খানিক তফাতের আর একটা ঝোপ থেকে একটা শেয়াল বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পালাল।
হয়তো ওই শেয়ালের পায়ের শব্দেই সে ভয় পেয়েছে,–এই ভেবে কুমার আবার অগ্রসর হল। দুপা যায়, থামে, আর শোনে। কিন্তু পায়ের শব্দ আর শোনা গেল না। ওই তো সেই শুঁড়িপথ! সে আর মোহনলাল সেদিন ওরই মধ্যে ঢুকে বিপদে পড়েছিল! আজ এইখানেই তার অপেক্ষা করবার কথা।
ঝোপঝাপ এখানে সর্বত্র। শুড়িপথের একপাশে এমন একটা ঝোপ বেছে নিয়ে কুমার গা-ঢাকা দিয়ে বসল–যাতে তার পিছনদিকে থাকে বাড়ির দেওয়াল। অন্তত পিছন দিক থেকে কোনও গুপ্তশত্রুর আক্রমণের ভয় আর রইল না।
কিন্তু ঝোপের ভিতরে গিয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই কুমার অবাক হয়ে শুনলে, খুব কাছেই অন্তরালে বসে কে যেন সকৌতুকে প্রবল হাসির ধাক্কা সামলাবার চেষ্টা করছে।
কিন্তু সে যেইই হোক, কুমারের আর খোঁজাখুঁজি করবার আগ্রহ হল না। সে কেবল বাঁধন খুলে পিঠের বন্দুক হাতে নিলে। তখন তার পিছনে রইল দেওয়াল আর হাতে রইল বন্দুক আর সামনের দিকে জেগে রইল তার সাবধানী দুই চক্ষু, তখন কোনও শত্রুরই তোয়াক্কা সে রাখে না! জন্তু, মানুষ ও অমানুষ, অমন অনেক শত্রুকেই এ জীবনে সে দেখেছে, শত্রুর ভয়ে তার বুক কোনওদিন কাঁপেনি, আজও কাঁপবে না।
কিন্তু, শত্রু তবু এল! একলা নয়, চুপিচুপি নয়–দলে দলে, ভীম বিক্রমে কোলাহল করতে-করতে! অমন উঁচু দেওয়াল তার পৃষ্ঠরক্ষা করতে পারলে না এবং তার গুলি-ভরা বন্দুক-রিভলভারও তাদের পিছনে হটাতে পারলে না–তাদের কাছে কুমারকে আজ কাপুরুষের মতন পরাজয় স্বীকার করতে হল–হয়তো আজ তাকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হবে!
কুমার ভ্রমে সন্দেহ করেনি যে, ঝোপঝাপের ভিতরে এমন অসংখ্য শত্রু এতক্ষণ তারই অপেক্ষায় লুকিয়ে ছিল। তারা হচ্ছে উঁশ-মশা!
