কুমার বললে, না, বোমা ফাটেনি–ওই যে, আপনার পায়ের তলাতেই বোমাটা পড়ে রয়েছে।
ঠিক স্প্রিংওয়ালা পুতুলের মতো মস্ত একটা লাফ মেরে দাঁড়িয়ে উঠে চন্দ্রবাবু বললে, বলো কিহে? চৌকিদার! এই চৌকিদার! বোমাটা শীগগির এখান থেকে সরিয়ে ফ্যাল শিগগির! নইলে এখনও হয়তো ওটা ফাটতে পারে।
কুমার বললে, ঠান্ডা হোন চন্দ্রবাবু ঠান্ডা হোন। বোমা ছোড়েনি–ওটা একটা রবারের বল ছাড়া আর কিছুই নয়।
চন্দ্রবাবু অনেকক্ষণ নিষ্পলক চোখে বলটার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ গর্জন করে বললেন, কী। আবার আমার সঙ্গে ঠাট্টা? তবে রে রাসকেল–বলে চিলের ছাদের দিকে কটমট করে তাকিয়েই তার মুখ যেন সাদা হয়ে গেল। বিদ্যুতের মত চারিদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে তিনি আবার বললেন, মোহনলাল? মোহনলাল কোথায় গেল?
কুমার সচমকে চিলের ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখলে, সত্যিই তো, সেখান থেকে মোহনলালের মূর্তি যেন ভোজবাজির মতো অদৃশ্য হয়েছে।
চন্দ্রবাবু উৎকণ্ঠার সঙ্গে বললেন, কোথায় গেল মোহনলাল? কোন দিক দিয়ে সে পালাল?
কুমার বললে, এখান থেকে পালাবার কোনও পথই নেই!
তবে কি সে মরিয়া হয়ে চারতলার ছাদ থেকেই নীচে লাফ মারলে? বলেই চন্দ্রবাবু ছুটে ছাদের ধারে গিয়ে নিম্নদিকে দৃষ্টিপাত করলেন, কিন্তু সেখানেও মোহনলালের চিহ্নমাত্র নেই।
কপালে করাঘাত করে চন্দ্রবাবু বললেন, অ্যাঁ! একটা বাজে আর বিশ্রী ঠাট্টা করে লোকটা কিনা আমাদের সকলের চোখে ধুলো দিয়ে পালাল? উঃ! কী ভয়ানক লোকরে বাবা। এর পরেও আমার চাকরি আর কী করে বজায় থাকে বলো।
কিন্তু কুমার এত সহজে বোঝ মানবার ছেলে নয়। সে কিছু না বলে বরাবর নেমে একতলায় গেল। তারপর বাড়ির বাইরে ঠিক চিলের ছাদের নীচে গিয়ে দাঁড়াল। সেখানে যা দেখলে তা হচ্ছে এই
ঠিক চিলের ছাদের নীচেই, মাটির ওপরে প্রায় দু-গাড়ি বালি পাকার হয়ে আছে। এবং সেই বালির স্কুপের মধ্যে একটা বড় গর্ত–অনেক উঁচু থেকে যেন একটা ভারি জিনিস সেখানে এসে পড়েছে। মোহনলাল তাহলে ছাদের ওপর থেকে এই নরম বালির গাদায় লাফিয়ে পড়ে অনায়াসেই চম্পট দিয়েছে?
কুমার তখনই চন্দ্রবাবুকে ডেকে এনে ব্যাপারটা দেখাল। দেখে-শুনে চন্দ্রবাবু তো একেবারেই অবাক! খানিক পরে দুই চোখ ছানাবড়ার মতন বড় করে তিনি বলে উঠলেন, শাবাশ বুদ্ধি! মোহনলাল যে দেখছি পালাবার পথ আগে থাকতেই ঠিক করে রেখেছিল। কুমার আমি হলপ করে বলতে পারি, এই মোহনলাল বড় সহজ লোক নয়, এ এখানে বেড়াতেও আসেনি,–এ ভুলু-ডাকাতের চরও নয়,–এ হচ্ছে নিজেই ভুলু-ডাকাত!
থানায় ফিরে আবার নতুন এক বিস্ময়! কুমার নিজের ঘরে ঢুকেই দেখলে, মেঝের ওপর একখানা খাম পড়ে আছে–যেন জানলা গলিয়ে কেউ সেখানা ঘরের ভিতরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে!
চিঠিখানা এই–
কুমার বাবু,
আসছে অমাবস্যার রাতে আপনি পটলবাবুর ভাঙা বাড়ির শুড়িপথের কাছাকাছি ঝোপঝাপে কোথাও লুকিয়ে থাকবেন। সঙ্গে বন্দুক, রিভলবার আর টর্চলাইট নিয়ে যেতে ভুলবেন না।
আসছে অমাবস্যার রাতেই রহস্যের কিনারা হয়ে যাবে!
ইতি–বন্ধু
পুনঃ–এই চিঠির কথা ঘুণাক্ষরেও চন্দ্রবাবুর কাছে প্রকাশ করবেন না।
কুমার চিঠি পড়ে নিজের মনেই বললে, কে এই চিঠি লিখেছে? বন্ধু? এখানে কে আবার বন্ধু? মোহনলাল? সে তো পলাতক। তবে কি বনের ভিতরে গর্তের ভিতর থেকে আমাকে যে উদ্ধার করেছিল এ কি সেই ব্যক্তি? কে সে?
কুমারের ভাবনায় বাধা পড়ল। আচম্বিতে ঝড়ের মতো চন্দ্রবাবু ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন–তাঁরও হাতে একখানা চিঠি।
চন্দ্রবাবু বললেন, দেখো কুমার এ আবার কী ব্যাপার! আমার শোবার ঘরের ভিতরে বাইরে থেকে এই চিঠিখানা কে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে!
চিঠিখানা নিয়ে কুমার বুঝলে, একই লোক তাকে আর চন্দ্রবাবুকে চিঠি লিখেছে। এ পত্রখানায় লেখা ছিল–
চন্দ্রবাবু আসছে অমাবস্যার রাতে পটলবাবুর ভাঙা বাড়ির পিছনে কাজলা নদীর জল যেখানে সুড়ঙ্গ-খালের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে, ঠিক সেইখানেই অনেক লোকজন আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে লুকিয়ে থাকবেন।
সেই রাত্রেই আপনি ভুলু-ডাকাতের দলকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন। ইতি–বন্ধু
.
বারো। আবার সেই রাত!
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। অমাবস্যার সেই ভয়ানক রাত আবার এসেছে, কিন্তু বারোটা বাজতে এখনও অনেক দেরি।
কুমার নিজের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে দেখলে, চন্দ্রবাবু ধড়াচুড়ো পরে প্রস্তুত হচ্ছেন। সেই অজানা বন্ধুর কথামতো চন্দ্রবাবু যে আজ পটলবাবুর ভাঙাবাড়ির পিছনে কাজলা-নদীর সুড়ঙ্গখালের মুখে গিয়ে সদলবলে পাহারা দিতে ভুলবেন না, কুমার তা বেশ জানত। এবং এটাও সে জানত যে, যাবার আগে তারও ডাক পড়বে–চন্দ্রবাবু তাকেও তার সঙ্গে যেতে বললেন।
কিন্তু সেই অজানা বন্ধু তাকে ভাঙা-বাড়ির ভিতরে শুঁড়িপথের কাছাকাছি কোনও ঝোপেঝাপে লুকিয়ে থাকতে বলেছে। চন্দ্রবাবুর কাছে আবার একথা প্রকাশ করতে বারণও আছে তাই কুমার তাকে কোনও কথাই জানায়নি। কাজে কাজেই পাছে চন্দ্রবাবু তাকে সঙ্গে যাবার জন্যে ডাকেন, সেই ভয়ে কুমার চুপিচুপি থানা থেকে আগে থাকতেই বেরিয়ে পড়ে পটলবাবুর বাড়ির দিকে রওনা হল।
কিন্তু এই অজানা বন্ধুই বা কে, আর চন্দ্রবাবুর কাছে এত লুকোচুরির কারণই বা কি, অনেক মাথা ঘামিয়েও কুমার সেটা আন্দাজ করতে পারেনি। আজও সেই কথাই ভাবতে ভাবতে কুমার অন্ধকারের ভিতর দিয়ে পথ চলতে লাগল?
