চন্দ্রবাবু ও কুমার বাড়ির সদর দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। চন্দ্রবাবু দুজন পাহারাওয়ালাকে ডেকে বললেন, বাড়ির পেছনে একটা খিড়কির দরজা আছে। তোমরা সেই দরজার গিয়ে পাহারা দাও।
পাহারাওয়ালারা তার হুকুম তামিল করতে ছুটল। চন্দ্রবাবু দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন, কিন্তু কোনওই সাড়া পাওয়া গেল না।
চন্দ্রবাবু কড়া নাড়তে নাড়তে এবারে চিৎকার শুরু করলেন, মোহনলালবাবু, ও মোহনলালবাবু!
সাড়াশব্দ কিছুই নেই। আরও কিছুক্ষণ কড়া নেড়ে ও চিৎকার করে চন্দ্রবাবু শেষটা খাপ্পা হয়ে বললেন, মোহনলালবাবু এ ভালো হচ্ছে না কিন্তু! এইবারে আমরা দরজাটা ভেঙে ফেলব!
এতক্ষণে দরজাটা খুলে গেল। মস্ত বড় একমুখ পাকা দাড়ি-গোঁফ নিয়ে একটা খোট্টা চাকর দরজার ওপরে এসে দাঁড়াল। ভাঙা ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞাসা করলে, কাকে খোঁজা হচ্ছে!
চন্দ্রবাবু বললেন, মোহনলালবাবু কোথায়?
সে জানালে, বাবু তেতলার ছাদের ওপরে আছেন।
তাকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে চারজন পাহারাওয়ালার সঙ্গে চন্দ্রবাবু রেগে বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকলেন, কুমারও পিছনে-পিছনে গেল।
সামনেই সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে সকলে দ্রুতপদে একেবারে তেতলায় ছাদে গিয়ে উঠল। তেতলার ছাদের ওপরে একটা চিলে ছাদ। মোহনলাল পরম নিশ্চিন্ত মুখে সেই ছাদের ধারে পা ঝুলিয়ে বসে আছে।
চন্দ্রবাবু বললেন, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে আমার গলা ভেঙে গেল, তবু মশাইয়ের সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না কেন?
মোহনলাল গম্ভীর ভাবে শান্ত স্বরে বললে, আমি যে গান গাইছিলুম! গান গাইতে গাইতে সাড়া দেব কেমন করে?
চন্দ্রবাবু চটেমটে বললেন, আবার ঠাট্টা হচ্ছে? এখন লক্ষ্মীছেলের মতো সুড় সুড় করে ওখান থেকে নেবে এসো দেখি, তারপর দেখা যাবে, কেমন গান গাইতে পারো!
মোহনলাল একগাল হেসে বললে, আমাকে এত আদর করে নীচে নামতে বলছেন কেন চন্দ্রবাবু?
চন্দ্রবাবু বললেন, তোমাকে দিল্লির লাড্ড খাওয়াব কিনা, তাই এত সাধাসাধি করছি?
মোহনলাল খুব ফুর্তির সঙ্গে দুই হাতে তুড়ি দিয়ে ঘন ঘন মাথা নাড়তে নাড়তে গান ধরে দিলে–
লাড্ডু যদি এনে থাকো, গিয়ে দাদা, দিল্লি
ঢেকেঢুকে রেখো, যেন খায়নাকো বিল্লি!
কিবা তার তুল্য?
শুনে মন ভুললো।
খেলে যে বোলোনাকো–কেন সব গিললি?
চন্দ্রবাবু রেগে টং হয়ে বললেন, আবার আমার সঙ্গে, মশকরা? দাঁড়াও দেখাচ্ছি তোমার মজাটা!
মোহনলাল তেমনি হাসিমুখে বললে, মজা দেখাবেন? দেখান না চন্দ্রবাবু! আমি মজা দেখতে ভারি ভালোবাসি!
হ্যাঁ, দু-হাতে যখন লোহার বালা পড়বে, মজাটা তখন ভালো করেই টের পাবে বাছাধন!
বিস্মিত স্বরে মোহনলাল বলল, লোহার বালা? সে কি দাদা? আপনাদের দেশে সোনার বালা কেউ পরে না?
চন্দ্রবাবু হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, ফের ঠাট্টা? তবে রে পাজি? তবে রে ডাকু! চৌকিদার! যাও, চিলের ছাদে উঠে ও-বদমাইশটাকে কান ধরে টেনে নামিয়ে এসো তো।
পাহারাওয়ালা অগ্রসর হল কিন্তু, মোহনলাল একটুও দমল না? হো হো করে হেসে উঠে ডানহাতখানা হঠাৎ মাথার ওপর তুলে সে বললে, আমার ডানহাতে কি রয়েছে, সেটা দেখতে পাচ্ছেন তো?
মোহনলালের ডানহাতে কালো রঙের গোলাকার কি একটা জিনিস রয়েছে বটে। চন্দ্রবাবু সন্দেহপূর্ণ স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন কি ওটা?
বোমা।
শুনেই পাহারাওয়ালারা তাড়াতাড়ি পিছিয়ে এল। মোহনলাল বললে, আমার দিকে কেউ এক পা এগিয়ে এলেই আমি এই বোমা ছুড়ব–সঙ্গে সঙ্গে বাড়িখানা উড়ে যাবে!
চন্দ্রবাবু শুকনো গলায় বললেন, কিন্তু তাহলে তুমিও বাঁচবে না।
না, আমিও বাঁচব না, আপনারাও বাঁচবেন না?
চন্দ্রবাবু খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, মোহনলাল, আমাকে ভয় দেখিয়ে তুমি পালাতে পারবে না। কর্তব্যের জন্যে যদি আমাকে মরতে হয়, তাহলে আমি মরতেও রাজি আছি।
আচম্বিতে ভীষণ চিৎকার করে মোহনলাল বললে, তবে মর। –বলেই হাতের সেই বোমাটা সে সজোরে চন্দ্রবাবুর দিকে নিক্ষেপ করলে।
পর-মুহূর্তে কুমারের মনে হল চোখের সামনে সারা পৃথিবীর আলো দপ করে নিভে গেল এবং ভয়ঙ্কর একটা শব্দের সঙ্গে-সঙ্গে রাশিকৃত ভাঙা ইট-কাঠ-ধুলো-বালি ও রাবিশের ফোয়ারার মধ্যে তার দেহটা হাড়গোড় ভাঙা দয়ের মতন আকাশের দিকে ঠিকরে উঠে গেল।
এবং তারপরে বিস্ময় আর আতঙ্কে প্রথম ধাক্কাটা সামলে দেখলে,না, তারা আকাশে উড়ে যায়নি, পৃথিবীতেই বিরাজ করছে এবং চোখের সমুখেই ছাদের ওপরে একটা কালো রবারের বল লাফিয়ে লাফিয়ে খেলা করছে। দুই হাতে মুখ চেপে চন্দ্রবাবু ছাদের ওপরে হাঁটু গেড়ে বসেছেন এবং চারজন পাহারাওয়ালা চারদিকে চিৎপাত বা উপুড় হয়ে পড়ে গড়াগড়ি দিচ্ছে।
বারবার বিপদে পড়ে কুমারের আত্মসংবরণ করবার ক্ষমতা বেড়ে গিয়েছিল, তাই সকলের আগে সেইই বুঝতে পারলে যে মোহনলাল যেটা ছুঁড়েছিল, সেটা বোমা-টোমা কিছুই নয়, একটা তুচ্ছ রবারের বল মাত্র।
সকৌতুকে হেসে উঠে কুমার বললে, চন্দ্রবাবু, ও চন্দ্রবাবু। চোখ খুলে দেখুন, আমরা কেউ এখনও সশরীরে স্বর্গে যাই নাই।
যেন দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠে একটা নিশ্বাস ফেলে চন্দ্রবাবু বললেন, আঁ? আমরা বেঁচে আছি? আমরা মরিনি? বলো কি হে। বোমাটা তাহলে ফাটেনি? দুর্গা, দুর্গা মস্ত একটা ফঁড়া কেটে গেল।
