কুমার সন্দেহপূর্ণ কণ্ঠে বললে, প্রতি অমাবস্যার রাতে এখানে এসে যে দেখা দেয়, সে কি সত্যি-সত্যিই বাঘ, না আর কিছু?
আপনি তো স্বচক্ষেই বাঘটাকে দেখেছেন। আমিও দেখেছি এ যে আসল বাঘই বটে, তারও প্রমাণ আজ পেয়েছি। পোড়াবাড়ির অন্ধকার গহুরে মানুষের হাড়ের স্তূপ তো দেখেছেন। যাদের রক্ত-মাংস গেছে বাঘের জঠরে, সেই অভাগাদেরই হাড়ের রাশি সেখানে পড়ে রয়েছে।
কুমার ভাবতে-ভাবতে বললে, এ বাঘ কি মায়া-বাঘ, না এ-সব ভূতুড়ে কাণ্ড?
গাঁয়ের লোকেরাও বলে, এইসব ভূতুড়ে কাণ্ড। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর ইংরেজি আইনের কাছে ভূতুড়ে কাণ্ড বলে কোনও কাণ্ডই নেই। আমরা একালের সভ্য লোক, ভূত তো কোন ছাড়, ভগবানকেই আমরা উড়িয়ে দিতে পারলে বেঁচে যাই। কিন্তু যাক সে কথা। এখন আপনি কি করবেন?
থানায় ফিরে যাব।
কিন্তু সাবধান, আজ যা দেখেছেন, থানার কারুর কাছে তা প্রকাশ করবেন না।
অমাবস্যার রাতের রহস্য যদি জানতে চান, তাহলে একেবারে মুখ বন্ধ রাখবেন। পুলিশের কাছে এখন কিছু জানালেই তারা বোকার মতো গোলমাল করে সব গুলিয়ে দেবে। আজ যা দেখলুম তাতে মনে হয়, আপনি চুপচাপ থাকলে আসছে অমাবস্যাঁতেই সব রহস্যের কিনারা হয়ে যাবে। আজ আর এর বেশি কিছু বলব না। নমস্কার। মোহনলাল তার বাসার দিকে চলে গেল।
কুমার চিন্তিত মুখে থানার দিকে এগিয়ে চলল। বাসার কাছ বরাবর এসেই সে দেখলে চন্দ্রবাবু একদল পাহারাওয়ালা নিয়ে থানার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছেন।
কুমারকে দেখেই তাড়াতাড়ি তার কাছে এসে বললেন, এই যে কুমার! তোমার জন্যে আমার বড় ভাবনা হয়েছিল।
কেন চন্দ্রবাবু?
আমি শুনলুম তুমি আর মোহনলাল নাকি নদীতে কুমিরের মুখে পড়েছ! এখন তোমাকে দেখে আমার সকল ভাবনা দূর হল। যাক এ-যাত্রা তাহলে তুমি বেঁচে গিয়েছ।
এ যাত্রা কেন চন্দ্রবাবু, অনেক যাত্রাই এমনি আমি বেঁচে গেছি। তবে একদিনের যাত্রায় মরণকে যে আর ফাঁকি দিতে পারব না, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই।
কুমিরটা কি মোহনলালের রিভলভারের গুলি খেয়েই পালিয়ে গেছে?
গাঁয়ের চারিদিকেই আমার গুপ্তচর আছে, একথা তো তুমি জানো!..কিন্তু মোহনলাল কোথায়?
তুমি থানায় গিয়ে ভিজে কাপড়-চোপড়গুলো বদলে ফেলো, ততক্ষণ আমি মোহনলালের বাড়িটা একবার ঘুরে আসি।
কেন সেখানে আবার কি দরকার।
চন্দ্রবাবু এগুতে-এগুতে বললেন, আমি মোহনলালকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছি।
.
এগারো । এই কি ভুলু-ডাকাত?
চন্দ্রবাবু যাচ্ছেন মোহনলালকে গ্রেপ্তার করতে! কেন?
থানার ভিতরে গিয়ে এখন ভিজে কাপড়-চোপড়গুলো ছেড়ে কুমারের কিঞ্চিৎ বিশ্রাম নেওয়া উচিত। কিন্তু চন্দ্রবাবুর কথা শুনে কুমার বিশ্রামের কথা একেবারে ভুলে গেল, তাড়াতাড়ি চন্দ্রবাবুর পিছনে ছুটে গিয়ে কুমার জিজ্ঞাসা করলে, মোহনলাল বাবু কি করেছেন? আপনি তাঁকে গ্রেপ্তার করবেন কেন?
চন্দ্রবাবু বললেন, তুমি তো জানো কুমার, মোহনলালের ওপরে গোড়া থেকেই আমার সন্দেহ আছে। কে সে, কোথাকার লোক, এত বেড়াবার জায়গা থাকতে মানসপুরেই বা তার বেড়াতে আসবার শখ হল কেন, এসব কিছুই আন্দাজ করবার উপায় নেই। তার সবই যেন রহস্যময়। আমার গুপ্তচর দেখেছে, সে প্রায়ই নিশুতি রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়। ভেবে দেখো, মানসপুরে সন্ধে হলে যখন সবাই দরজায় খিল এঁটে ভয়ে কাঁপতে থাকে, মোহনলাল তখন সুন্দরবনের ঝোপে ঝাপে ঘুরে বেড়ায়। তাই তো পটলবাবু সন্দেহ করেন যে, মোহনলাল হচ্ছে ভুলু-ডাকাতেরই দলের লোক।
কুমার বললে, কিন্তু এসব তো খালি সন্দেহের কথা! মোহনলালবাবুকে গ্রেপ্তার করতে পারেন, এমন কোনও প্রমাণ তো আপনি পাননি!
এতদিন তা পাইনি বলেই, মোহনলাল যে সাংঘাতিক লোক, এবারে সে প্রমাণ আমি পেয়েছি।
প্রমাণ! কি প্রমাণ?
চন্দ্রবাবু বললেন, আমার গুপ্তচর এসে কিছুদিন আগে খবর দিয়ে গিয়েছিল যে, মোহনলালকে সে একটা রিভলভার সাফ করতে দেখেছে। জানো তো, রিভলভার ব্যবহার করলে লাইসেন্স নিতে হয়? আমি কলকাতায় তার করে জেনেছি যে, মোহনলালের নামে কোনও রিভলভারের লাইসেন্স নেই। এ একটা কতবড় অপরাধ, তা কি বুঝতে পারছ কুমার? লাইসেন্স নেই, মোহনলাল তবু রিভলভার ব্যবহার করছে। বিপ্লববাদী কি ডাকাত ছাড়া এমন কাজ আর কেউ করে না। আপাতত এই অপরাধেই আমি মোহনলালকে গ্রেপ্তার করতে যাচ্ছি।
কুমার অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, তবে কি মোহনলাল সত্যি-সত্যিই দোষী? সে কি ডাকাত? মানুষ খুন করাই কি তার ব্যবসা! কিন্তু তা হলে অমাবস্যার রাতের রহস্য আবিষ্কার করবার জন্যে তার এত বেশি আগ্রহ কেন? আর মোহনলাল যদি ডাকাতদেরই কেউ হয়, তবে পটলবাবুর ভাঙা বাড়ির ভিতরে গিয়ে ডাকাতদের দেখে ভয়ে পালিয়ে এল কেন! এসব কি ছলনা! তার চোখে ধুলো দেবার চেষ্টা?
এমনি সব কথা ভাবতে ভাবতে চন্দ্রবাবু ও পাহারাওয়ালাদের সঙ্গে সঙ্গে কুমার এগিয়ে চলল এবং ক্রমে অশথ-বট ও তাল-নারিকেলের ছায়া-খেলানো আঁকাবাঁকা মেটেপথ দিয়ে কুমার মোহনলালের বাসার সুমুখে গিয়ে পড়ল।
খানিকটা খোলা জমি। মাঝখানে একখানা ছোট তেতলা বাড়ি। ডানপাশে মস্ত একটা বাঁশঝাড় অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে দোল খাচ্ছে এবং বামপাশ দিয়ে বর্ষায়, কাজলা নদীর ঘোলা জল নাচতে নাচতে ছুটে যাচ্ছে।
