.
দশ । রহস্য বাড়ছে
অন্ধকার।
সামনে দপদপ করে দু-টুকরো আগুন জ্বলছে। সে দুটো কুমিরের চোখ, না সাক্ষাৎ মৃত্যুর চোখ?
ওপাশ থেকে মোহনলালের স্থির, গম্ভীর অথচ দ্রুত কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কুমারবাবু! টপ করে ডুব দিন। ডুব সাঁতার দিয়ে যতটা পারেন ভেসে যান। আবার ভেসে উঠে নিশ্বাস নিয়ে ডুব দিয়ে অন্যদিকে এগিয়ে যান। এইভাবে একবার ভেসে উঠে নিশ্বাস নিয়ে আবার ডুব দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলুন।
মোহনলালের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই সামনের আগুন-চোখদুটো নিবে গেল। কুমার বুঝলে, কুমির শিকার ধরবার জন্যে ডুব দিল। সঙ্গে-সঙ্গে সেও দিলে ডুব। নিশ্বাস বন্ধ করে জলের তলা দিয়ে ডান দিকে যতটা পারলে সাঁতরে এগিয়ে গেল। তারপর ভেসে উঠে নিশ্বাস নিয়েই আবার ডুব দিয়ে ডানদিকে এগিয়ে গেল। এমনি করে বারংবার ভেসে এবং বারংবার ডুবে এঁকেবেঁকে কুমার অনেকক্ষণ সাঁতার দিলে! সঙ্গে-সঙ্গে সে ভাবতে লাগল, মোহনলাল বিপদেও কী অটল। কী তার স্থির বুদ্ধি। সামনে ভীষণ কুমির দেখে সে যখন ভয়ে ভেবড়ে পড়েছে, মোহনলালের মাথা তখন বিপদ থেকে মুক্তিলাভের উপায় চিন্তা করছে। মোহনলাল যে কৌশল তাকে শিখিয়ে দিলে সেটা সেও জানত কিন্তু কুমিরের মুখে পড়ে তার কথা সে স্রেফ ভুলে গিয়েছিল।
কুমিররা লক্ষ্য স্থির করে জলের ওপরে ভেসে উঠেই তারপর ডুব দিয়ে ঠিক লক্ষ্য স্থলে গিয়ে শিকার ধরে। কিন্তু ইতিমধ্যে যাকে সে ধরবে, সে যদি স্থান পরিবর্তন করে, তাহলে কুমির তাকে আর ধরতে পারে না।
খানিকক্ষণ পরেই কুমার দেখলে যে সামনের দিকে দুরে দিনের ধবধবে আলো দেখা যাচ্ছে। তাহলে ওইটুকু হচ্ছে সুড়ঙ্গ খালের মুখ?
কিন্তু পিছনে কালো জল তোলপাড় করে যে নির্দয় মৃত্যু তখনও এগিয়ে আসছে, তার কবল থেকে উদ্ধার পাবার জন্যে তাকে তখনি আবার ডুব দিতে হল, আলো দেখে খুশি হবার বা মোহনলালের খোঁজ নেবার অবসর কুমারের এখন নেই!…
সুড়ঙ্গ খাল শেষ হল, কুমার বাইরের উজ্জ্বল সূর্য কিরণে এসে দেখলে, অদূরেই মোহনলালও নদীর ওপরে ভেসে উঠল।..কুমার বুঝলে, খাল কেটে গাঁয়ের কাজলা নদীর জলই সেই প্রকাণ্ড সুড়ঙ্গের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিশ্চয়ই এসব হচ্ছে সেকেলে ডাকাতদের কাণ্ড।
পিছনে তাকিয়েই দেখলে সে একগুয়ে কুমিরটাও জলের ওপরে জেগে উঠল, মোহনলালের খুব কাছেই।
মোহনলাল ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত স্বরে চেঁচিয়ে বললে, ভারি তো জ্বালালে দেখছি। এ আপদ যে কিছুতেই আমাদের সঙ্গ ছাড়তে চায় না। কুমির ও মোহনলাল আবার জলের তলায় অদৃশ্য হল।
এবারে কুমার আর ডুব দিল না, কারণ সে বুঝে নিলে, কুমিরের লক্ষ্য এখন মোহনলালের দিকেই।
আবার মোহনলাল খানিকটা তফাতে গিয়ে ভেসে উঠল এবং কুমিরটাও ভেসে উঠল ঠিক সেইখানেই, একটু আগেই মোহনলাল যেখান থেকে ডুব মেরেছিল। আবার শিকার ফসকেছে দেখে কুমিরটা নিষ্ফল আক্রোশে জলের ওপরে ল্যাজ আছড়াতে লাগল মানুষ খেতে এসে তাকে এমন বিষম পরিশ্রম বোধহয় আর কখনও করতে হয়নি।
মোহনলাল বললে, না, এ লুকোচুরি খেলা আর ভালো লাগছে না,–দেখি, এতেও ব্যাটা ভয় পায় কিনা!–বলেই সে কুমিরের চোখ টিপ করে উপর-উপরি তিনবার রিভলভার ছুঁড়ে সাঁৎ করে জলের তলায় নেমে গেলসঙ্গে-সঙ্গে কুমিরও অদৃশ্য!
রিভলভারের গুলিতে কুমির যে মরবে না, কুমার তা জানত। যত বড় জানোয়ারই হোক সাধ করে কেউ রিভলভারের গুলি হজম করতে চায় না। তাই এবার মোহনলাল ভেসে ওঠবার পরেও কুমিরটার ল্যাজের একটুখানি ডগা পর্যন্ত দেখা গেল না।
মোহনলাল বললে, মানুষ খাবার চেষ্টা করলে যে সবসময়ে আরাম পাওয়া যায় না, কুমিরটা বোধহয় তা বুঝতে পেরেছে! অন্তত তার একটা চোখ যে কানা হয়ে যায়নি, তাই বা কে বলতে পারে?…চলুন, কুমারবাবু, আমরা ডাঙায় গিয়ে উঠি।
তীরে উঠে মোহনলাল বললে, এসেছিলুম পটলবাবুর সঙ্গে দেখা করতে কিন্তু আপনি কি বলেন কুমারবাবু, এ-অবস্থায় আমাদের কি আর কোনও ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া উচিত?
কুমার বললে, পটলবাবুর সঙ্গে আর একদিন দেখা করলেই চলবে। আর সত্যিকথা বলতে কি, পটলবাবুর ওপরে আমার অত্যন্ত সন্দেহ হচ্ছে।
কেন?
পটলবাবুর বাড়ির ভেতর আজ যা দেখলুম, তার সঙ্গে তাঁর যে যোগ নেই, এটা কি বিশ্বাস করা যায়?
না, বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু পটলবাবু তো অনায়াসেই বলতে পারেন যে, এই সেকেলে প্রকাণ্ড অট্টালিকার ভাঙা ইটের রাশির ভেতরে কোনও মানুষ ভরসা করে পা বাড়ায় না। তিনি এর বারমহলটাই মেরামত করে নিয়েছেন, এর ভেতরে তিনিও কোনওদিন ঢোকেননি, সুতরাং এর মধ্যে কি হচ্ছে না হচ্ছে তা তিনি কেমন করে জানবেন?
তিনি বললেই আমরা কি মেনে নেব?
অগত্যা। না মেনে উপায় কি? আমাদের প্রমাণ কোথায়? বাড়ির ভাঙা মহলগুলো তো দিন রাতই খোলা পড়ে থাকে, বাইরের যে-কোনও লোক যখন খুশি তার ভেতরে ঢুকতে পারে–যেমন আজ আমরা ঢুকেছিলুম, অথচ পটলবাবু কিছুই টের পাননি। ডাকাত বা অন্য কোনও বদমাইশের দল কোনও অজানা গুপ্তপথ দিয়ে তার মধ্যে ঢুকে কখন কোথায় আস্তানা পাতে, সেকথা তিনি কী করে জানবেন? ভাঙা বাড়ির ভেতরে যে বাঘের আড্ডা আছে, এটাও তাঁর পক্ষে জানা সম্ভব নয়। আর বুনো বাঘ যদি মানুষ ধরে খায়, সেজন্যেও কেউ পটলবাবুর ঘাড়ে দোষ চাপাতে পারে না। আর এ হচ্ছে আশ্চর্য বুনো বাঘ–পোড়া-বাড়িতে থাকে, তিথি-নক্ষত্রের খবর রাখে, অমাবস্যার রাত না হলে তার খিদে হয় না, গয়না-পরা স্ত্রীলোক ছাড়া আর কারুকে সে ধরে না, আবার সঙ্গে করে আনে ডাকাতের দল?
