মোহনলাল দুঃখিত স্বরে বললে, অভাগীর মৃত্যু হয়েছে হয়তো কোনও অমাবস্যার রাতেই।
কুমার সচমকে প্রশ্ন করলে, কী বলছেন আপনি?
মোহনলাল বিরক্ত ভাবে বললে, কুমারবাবু, অমাবস্যার রাতের রহস্য বোঝবার জন্যে আপনার এখানে আসা উচিত হয়নি। আপনি নিজের চোখকে যখন ব্যবহার করতে শেখেননি, তখন এ-রহস্যের কিনারা করবার শক্তিও আপনার নেই। আপনি জানেন যে, বাঘের কবলে পড়ে এখানে অনেক স্ত্রীলোকের প্রাণ গিয়েছে। আমাদের সামনে যে মড়ার মাথাটা পড়ে রয়েছে, ওটা যে কোনও স্ত্রীলোকের মাথা, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই।…তার ওপরে, আপনি কি এও দেখতে পাচ্ছেন না যে, এ জায়গাটার নরম মাটির ওপরে চারিদিকেই রয়েছে বাঘের থাবার দাগ? দুইয়ে-দুইয়ে যোগ করলে কি হয় জানেন তো? চার! ওই মড়ার মাথাটা হচ্ছে, দুই। আর বাঘের থাবার দাগ হচ্ছে, দুই। এই দুই আর দুইয়ে যোগ করুন, চার ছাড়া আর কিছুই হবে না। অমাবস্যার রাতে এখানে বাঘের উপদ্রব না হলে আমরা আজ ওই মড়ার মাথা-টাকে কখনওই এ জায়গায় দেখতে পেতুম না।
অপ্রতিভ কুমার মাথা হেঁট করে মোহনলালের এই বক্তৃতা নীরবে সহ্য করলে। মোহনলালের সূক্ষ্ম-বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টির কাছে আজ সে হার না মেনে পারল না।
মোহনলাল লণ্ঠনটা সামনের দিকে এগিয়ে আবার বললে, কুমারবাবু, ওদিকটাও দেখেছেন কি?
খানিক তফাতে দেখা গেল, একরাশ হাড়ের স্তূপ। মানুষের হাতের হাড়, পায়ের হাড়, বুকের হাড়, মাথার খুলি, কত মানুষের হাড় যে ওখান জড় করা আছে, তা কে জানে। দেখলেই বুক ধড়াস করে ওঠে। এ যে মড়ার হাড়ের দেশ। যাদের ওই হাড়, তাদের অশান্ত প্রেতাত্মারাও কি আজ এই অন্ধকার কোটরের আনাচে-কানাচে আনাগোনা করছে, নিজেদের দেহের শুকনো হাড়গুলোকে আবার ফিরে পাবার জন্যে?
কেন সে জানে না, কুমারের বার বার মনে হতে লাগল, ইলেকট্রিক লণ্ঠনের আলোক রেখার ওপরে গাঢ় কালো অন্ধকার যেখানে এই চিররাত্রির আলোকহীন গর্তের মধ্যে থমথম করছে, সেখানে দল বেঁধে দাঁড়িয়ে মানুষের চোখে অদৃশ্য হয়ে কারা সব প্রেতলোকের নিঃশব্দ ভাষায় ফিশফিশ করে কথা কইছে আর ঘন ঘন দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করছে।
এতক্ষণ ওই বীভৎস অস্থি-স্তূপের চারপাশে সার বেঁধে বসে যেন তারা নিজেদের মৃতদেহের হাড়গুলো খুঁজে বার করবার জন্যে হাতড়ে দেখছিল, এখন মানুষের হাতের আলোর ছোঁয়া লাগবার ভয়ে তারা সবাই অন্ধকারের ভিতরে গিয়ে লুকিয়েছে।
কুমার আর থাকতে না পেরে, দুই হাতে মোহনলালের দুই কাঁধ প্রাণপণে চেপে ধরে বললে, মোহনবাবু! আর নয়, এখানে আর আমি থাকতে পারছি না,আকাশের আলোর জন্যে প্রাণ আমার ছটফট করছে, চলুন–বাইরে যাই চলুন।
মোহনলাল বললে, কুমারবাবু, আমারও মনটা কেমন ছাঁৎ ছাঁৎ করছে। মনে হচ্ছে যেন ভগবানের চোখ কখনও এই অভিশপ্ত অন্ধকারের ভিতরে সদয় দৃষ্টিপাত করেনি, জ্যান্ত মানুষ যেন কখন এখানে আসতে সাহস করেনি।…আমিও আপনার মতো বাইরে যেতে পারলেই বাঁচি, কিন্তু তার আগে, একবার ওদিকটায় কি আছে, দেখে যেতে চাই।…আসুন।
কুমারের হাত ধরে মোহনলাল আবার সামনের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর, হাত ত্রিশ জমি পার হয়েই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কুমার আশ্চর্য নেত্রে দেখলে, সেখানেও ওপরে ছাদ রয়েছে, কিন্তু সামনের দিকে নীচে আর মাটি নেই, থইথই করছে জল আর জল।
বাঁ-দিকে দেওয়াল এবং সামনের দিকের প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ফুট পরে আর একটা খাড়া দেওয়াল। তারই ভিতর একটা জলে পরিপূর্ণ দীর্ঘ খাল ডানদিকে সামনে চলে গিয়ে অন্ধকারের ভিতরে কোথায় যে হারিয়ে গিয়েছে, তার কোনও পাত্তা পাবার যো নেই।
কুমার অবাক হয়ে জলের দিকে তাকিয়ে আছে হঠাৎ পিছন দিকে কেমন একটা অস্ফুট শব্দ হল।
মোহনলাল বিদ্যুতের মতো ফিরে হাতের লণ্ঠনটা সুমুখে এগিয়ে ধরলে। এবং তার পরেই লন্ঠনের আলোটা নিবিয়ে দিল।
সে কী দৃশ্য। অনেক দূরে শুড়িপথের যে দরজা দিয়ে তারা এখানে এসেছে, সেই দরজার ভিতর দিয়ে দলে দলে কারা সব হলঘরের ভিতরে এসে ঢুকছে। তাদের অনেকের হাতে হ্যারিকেন লণ্ঠন, কারুর হাতে বন্দুক এবং কারুর কারুর হাতে চকচক করছে বর্শা বা তরোয়াল। তাদের চেহারা কালো কালো, গা আদুড় এবং চোখ দিয়ে ঝরছে যেন হিংসার অগ্নিশিখা।
কিন্তু মোহনলাল ইলেকট্রিক লণ্ঠন নিবিয়ে ফেলবার আগেই আগন্তুকরা তাদের দেখে ফেললে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও হাতের সমস্ত আলো নিবে গেল। তারপরেই বন্দুকের আওয়াজ হলগুড়ুম, গুড়ুম, গুড়ুম।
কুমার ও মোহনলালের আশপাশ দিয়ে তিন চারটে বন্দুকের গুলি সোঁ সোঁ করে চলে গেল?
মোহনলাল বলে উঠল, কুমারবাবু, লাফিয়ে পড়ুন–লাফিয়ে পড়ুন।
কোথায়?
এই খালের জলে। বাঁচতে চান তো লাফিয়ে পড়ুন।
বলেই মোহনলাল লাফ মারলে, সঙ্গে সঙ্গে কুমারও দিল মস্ত এক লাফ।
ঝপাং, ঝপাং করে দুজনেই জলের ভিতরে গিয়ে পড়ল।
মোহনলাল ইলেকট্রিক লণ্ঠনটা আর একবার জ্বালিয়ে বললে, এ জলে দেখছি স্রোতের টান। নিশ্চয়ই কোনও নদীর সঙ্গে এর যোগ আছে। সাঁতার দিয়ে স্রোতের টানের সঙ্গে ভেসে চলুন।
মোহনলালের মুখের কথা শেষ হতে না হতেই হাত কয়েক তফাতে জল তোলপাড় করে প্রকাণ্ড কি একটা ভেসে উঠল।
কুমার সভয়ে বললে, কুমির, কুমির।
