.
নয়। মরণের সামনে
মোহনলাল যে একজন বিশেষ বুদ্ধিমান ওরহস্যময় ব্যক্তি, আজকে তার সঙ্গে ভালো করে কথা কয়ে কুমার এটা তো বেশ বুঝতে পারলেন, তার ওপরে বুকের পাটা দেখে সে অত্যন্ত অবাক হয়ে গেল।
কুমার আর একজন মাত্র লোককে জানে, এরকম মরিয়ার মতো সে এমনই মৃত্যুভয় ভরা অজানা বিপদের মধ্যে ঝাঁপ দিতে ভালোবাসে। সে হচ্ছে তার বন্ধু বিমল। ছেলেবেলা থেকেই বিপদের পাঠশালায় সে মানুষ।
কিন্তু মোহনলাল কেন যে যেচে এই মৃত্যু-খেলায় যোগ দিয়েছে, কুমার সেটা কিছুতেই আন্দাজ করতে পারছে না। সেও কি তাদেরই মতন শখ করে নিরাপদ বিছানার আরাম ছেড়ে চারিদিকে বিপদকে খুঁজে খুঁজে বেড়ায়, না নিজের কোনও স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই অমাবস্যার রাতের এই ভীষণ গুপ্তকথাটা সে জানতে চায়?
কিন্তু এখন এসব কথা ভাববার সময় নয়। কী ভয়ানক শুড়িপথ এ? কয়েক পা এগিয়েই কুমার দেখলে গলির মুখ দিয়ে বাইরের একটুখানি যে আলোর আভা আসছিল, তাও অদৃশ্য হয়ে গেছে! এখন খালি অন্ধকার আর অন্ধকার–সে নিবিড় অন্ধকারের প্রাচীর ঠেলে কোনও মানুষের চোখই কোনওদিকে অগ্রসর হতে পারে না।
শুঁড়িপথের দুদিকের এবড়ো-খেবড়ো দেওয়াল এত বেশি স্যাঁতসেঁতে যে, হাত দিতেই কুমারের হাত ভিজে গেল! আর সেই জানোয়ারি বোঁটকা গন্ধ! নাকে খুব কষে কাপড়-চাপা দিয়েও কুমারের মনে হতে লাগল, তার পেট থেকে অন্নপ্রাশনের ভাত পর্যন্ত আজ বোধ হয় উঠে আসবে।
মোহনলালের হাতে, সেই অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে হঠাৎ একটা ছোট ইলেকট্রিক লণ্ঠনের উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল। কুমার বুঝলে, মোহনলাল রীতিমতো প্রস্তুত হয়েই এসেছে।
মোহনলাল বললে, কুমারবাবু, আপনার কাছে কোন অস্ত্র-টস্ত্র আছে?
না।
আপনি দেখছি আমার চেয়েও সাহসী! নিরস্ত্র হয়ে এই ভীষণ স্থানে ঢুকতে ভয় পেলেন না?
আপনিও তো এখানে ঢুকেছেন, আপনিও তো বড় কম সাহসী নন!
কিন্তু আমার কাছে রিভলভার আছে। বলেই মোহনলাল ফস করে হাতের আলোটা নিবিয়ে ফেললে।
ও কি আলো নেবালেন কেন?
একবার খালি দেখে নিলুম, পথটা কীরকম। অজানা পথ না হলে এখানে আলো জ্বালতুম না–শত্রুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে লাভ কি?
শত্রু?
হ্যাঁ। এই পথের মাটির ওপরে আলো ফেলে এই মাত্র দেখলুম যে, এখানে খালি বাঘের পায়ের দাগই নেই, মানুষের পায়ের দাগ রয়েছে।
একসঙ্গে বাঘের আর মানুষের পায়ের দাগ? বলেন কি!
চুপ। আর কথা নয়! হয়তো কেউ আমাদের কথা কান পেতে শুনছে!
অত্যন্ত সতর্কভাবে পা টিপে টিপে দুজনে এগুতে লাগল–অন্ধকার যেন হাজার হাত বাড়িয়ে ক্রমেই বেশি করে তাদের চেপে ধরছে, বন্ধু-বাতাস দুর্গন্ধে যেন ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে, কি একটা প্রচণ্ড আতঙ্ক যেন তাদের সর্বাঙ্গ আচ্ছন্ন করে দেবার জন্যে চেষ্টা করছে। কুমারের মনে হল, সে যেন পৃথিবী ছেড়ে কোনও ভূতুড়ে জগতের ভিতরে প্রবেশ করছে– এ পথ যেন যমালয়ের পথ, প্রেতাত্মা ছাড়া আর কেউ যেন এ-পথে কোনওদিন পথিক হয়নি!
আচম্বিতে মাথার ওপর দিয়ে বদ্ধ-বাতাসের মধ্যে ঠান্ডা হাওয়ার চঞ্চল তরঙ্গ তুলে ঝটপট করে কারা সব চলে গেল! সমাধির নিঃশব্দতার মধ্যে হঠাৎ সেই শব্দ শুনে কুমারের বুকের কাছটা ধড়ফড়িয়ে উঠল, কিন্তু তার পরেই বুঝলে, এই মৃত জগতে জীবন্তের সাড়া পেয়ে বাদুড়েরা দলে দলে পালাচ্ছে!
আরও কিছুদূর এগিয়েই মোহনলাল চুপিচুপি বললে, এখানে একটা দরজা আছে বোধ হয় বলেই সে আবার এগিয়ে গেল।
অন্ধকারে হাত বুলিয়ে কুমারও বুঝলে, দরজাই বটে! তার পাল্লা দুটো খোলা। সেও চৌকাঠ পার হয়ে গেল। তারপর দুদিকে হাত বাড়িয়েও আর দেওয়াল খুঁজে পেলে না। শুড়িপথ তা হলে শেষ হয়েছে।
কিন্তু তারা কোথায় এসেছে? এটা ঘর, না অন্য কিছু? এখানেও দুর্গন্ধের অভাব নেই, উপর-পানে চাইলে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না কিন্তু কুমার অনুভব করলে যে শুড়ি পথের থমথমে বদ্ধ-বাতাস আর এখানে স্তম্ভিত হয়ে নেই।
তারা দুজনেই সেখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধ ভাবে খানিকক্ষণ কান পেতে রইল এবং অন্ধকারের মধ্যে দেখবার কোনও কিছু খুঁজতে লাগল। কিন্তু কিছু দেখাও যায় না, কিছু শোনাও যায় না। যেন দেহশূন্য মৃতের রাজ্য!
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর মোহনলাল আবার তার ইলেকট্রিক লণ্ঠনটা জ্বাললে।
এটা প্রকাণ্ড একটা হলঘরের মতো, কিন্তু এটা ঘর নয়, কারণ ঘর বলতে যা বোঝায়, এ জায়গাটাকে তা বলা যায় না। এটা একটা প্রকাণ্ড উঠানের চেয়েও বড় জায়গা, কিন্তু মাথার ওপরে রয়েছে ছাদ। মাঝে মাঝে থামছাদের ভার রয়েছে তাদের ওপরেই।
হঠাৎ মোহনলাল সবিস্ময়ে একটা অব্যক্ত শব্দ করে উঠল! তার পরেই কুমারের একখানা হাত চেপে ধরে বললে, দেখুন কুমারবাবু, দেখুন!
কী ভয়ানক!…কুমার রুদ্ধশ্বাস আড়ষ্ট নেত্রে দেখলে, তাদের কাছ থেকে হাত দশেক তফাতেই পড়ে রয়েছে একটা মড়ার মাথা। এবং সেই মাথাটার পাশে মাটির ওপরে এলানো রয়েছে স্ত্রীলোকের মাথার একরাশি কালো চুল।
খানিকক্ষণ এক দৃষ্টিতে সেইদিকে তাকিয়ে থেকে, একটা নিশ্বাস ফেলে মোহনলাল বললে, ওই মড়ার মাথা থেকেই ও চুলগুলো খসে পড়েছে। ও-মাথাটা নিশ্চয়ই কোনও স্ত্রীলোকের।
কুমার বললে, হ্যাঁ। এখনও ও-মাথাটার আশে-পাশে কিছু কিছু চুল লেগে রয়েছে। যার ওই মাথা, নিশ্চয়ই সে বেশিদিন মরেনি।
