চারিধারে ঝোপঝাপ, ঘন বাঁশঝাড়, পোড়ো জমি; এক কোণে একটা পচা ডোবা; মাঝখানে একটা পানা-ধরা পুকুর–এক সময়ে তার সব দিকেই বাঁধানো ঘাট ছিল এখন তার একটাও টিকে নেই। সেই পুকুরেরই পূর্বদিকে পটলবাবুর জীর্ণ, পুরোনো ও প্রকাণ্ড বাড়িখানা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন ভাবছে, এইবারে কবে সে একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। এ-বাড়িকে কেবল বাড়ি বললেই ঠিক বলা হবে না, একে অট্টালিকা বলাই উচিত সাত-মহলা অট্টালিকা! কিন্তু তার এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত চোখ চালিয়ে; খালি দেখা যায়, লোনা ধরা, ক্ষয়ে যাওয়া, বালি-খসা ইটগুলো যেন ছাল ওঠা ঘায়ের মতন লাল হয়ে আছে! অজগর সাপের মতন শিকড় দিয়ে দেওয়ালকে জড়িয়ে বড় বড় সব গাছ হাওয়ার ছোঁয়ায় শিউরে আর্তনাদ করে উঠছে,–এক একটা গাছ এত বড় যে, তার ডাল বয়ে আট-দশজন মানুষ উঠলেও তারা নুয়ে পড়বে না!
কুমার সবিস্ময়ে বললে; এ তো বাড়ি নয়, এ যে শহর। পটলবাবুর পূর্বপুরুষরা নিশ্চয়ই খুব ধনী ছিলেন?
মোহনলাল বললে, জানি না। তবে এইটুকু জানি যে, এ-বাড়ি পটলবাবুর পূর্বপুরুষের নয়। পটলবাবু এ-গাঁয়ে এসে বাসা বেঁধেছেন মোটে তিন বছর। এই পোড়া বাড়ি আর জমি। তিনি জলের দরে কিনে নিয়েছেন।
বাড়িখানাকে কিনে এর এমন অবস্থা করে রেখেছেন কেন?
এত বড় বাড়ি মেরামত করতে গেলেও কত হাজার টাকার দরকার, তা কি বুঝতে পারছেন না? বাড়িখানার একটা মহলই পটলবাবুর পক্ষে যথেষ্ট। সেই অংশটুকু মেরামত করে নিয়ে পটলবাবু সেইখানেই থাকেন।
কিন্তু এ-বাড়ি আগে কার ছিল, আপনি কি তা জানেন?
সে খোঁজও আমি নিয়েছি। বাংলাদেশের অনেক বড় জমিদারের পূর্বপুরুষ ডাকাত ছিলেন। প্রায় তিনশো বছর আগে এমনি এক ডাকাত-জমিদার এই বাড়িখানা তৈরি করিয়েছিলেন। এরকম সেকেলে বাড়ির ভেতরে অনেক রহস্য থাকে। আমরা খোঁজ নিলে আজও তার কিছু কিছু পরিচয় পেতে পারি।
বাড়ির সদর দরজা এমন মস্ত যে তার ভিতরে অনায়াসেই হাতি ঢুকতে পারে। এতকাল পরেও দরজার লোহার খিল মারা পুরু পাল্লা দুখানা একটুও জীর্ণ হয়ে পড়েনি।
মোহনলালের সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ির ভিতরে ঢুকে কুমার বললে, পটলবাবু কোন অংশে থাকেন; আপনি জানেন তো?
জানি কিন্তু তার আগে বাড়ির অন্য অন্য মহলগুলো একবার বেড়িয়ে এলে আপনার কষ্ট হবে কি?
কুমার পরম উৎসাহিত হয়ে বললে, কিছু না কিছু না! বলতে কি, আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম। কিন্তু পটলবাবুকে আগে তো সেটা একবার জানানো দরকার?
কোনও দরকার নেই; পটলবাবুর মহল একেবারে আলাদা তার দরজাও অন্য দিকে। এ মহলগুলোয় জনপ্রাণী বাস করে না, এগুলো এমনি খোলাই পড়ে থাকে, এর মধ্যে যে কেউ ঢুকতে পারে কত শেয়াল কুকুর আর সাপ-খোপ যে এর ভেতর বাসা বেঁধে আছে, কে তা বলতে পারে?
একে-একে তারা তিন-চারটে মহল পার হল–বাড়ির ভিতরের অবস্থাও তথৈবচ। বড় বড় উঠান, দালান, চক মিলানো ঘর, কারুকাজ করা খিলান, কার্নিশ, থাম ও দরজা কিন্তু বহুকালের অযত্নে আর কোথাও কোনও শ্রী নেই। ঘরে ঘরে বাদুড় দুলছে, চামচিকে উড়ছে, কোলা ব্যাং লাফাচ্ছে, পথ দিয়ে চলতে গেলে জংলা গাছপালা হাঁটু পর্যন্ত ঢাকা দেয়, ঘুমন্ত সাপ-জোগ রেগে ফোঁশ করে ওঠে, তফাতে-তফাতে পলাতক জানোয়ারদের দ্রুত পদশব্দ শোনা যায়।
মাঝে মাঝে সব অলিগলি, শুড়িপথ–তাদের ভিতরে কষ্টিপাথরের মতন জমাট বাধা ঘুটঘুটে অন্ধকার। কুমারের বার বার মনে হতে লাগল, সেই সব অন্ধকারের মধ্যে থেকে থেকে যেন ভীষণ সব চোখের আগুন জ্বলে-জ্বলে উঠছে,–সে হিংসুক, ক্ষুধিত দৃষ্টিগুলো যেন মানুষের রক্তপান করবার জন্যে দিবারাত্র সেখানে জাগ্রত হয়ে আছে!..আর সে কী স্তব্ধতা! সে স্তব্ধতাকে যেন হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করা যায়।
হঠাৎ কুমার বলে উঠল, দেখুন মোহনবাবু, মাটির দিকে চেয়ে দেখুন!
মাটির পানে তাকিয়েই একটি লাফ মেরে মোহনলাল বলে উঠল অ্যাঃ! আমি কি চোখের মাথা খেয়েছি যে, এটা দেখতে না পেয়ে বোকার মতন এগিয়ে চলেছি! ভাগ্যিস আপনি দেখতে পেলেন! বলেই সে আগ্রহ-ভরে মাটির ওপরে হেঁট হয়ে পড়ল।
মাটির ওপর দিয়ে বরাবর এগিয়ে চলেছে বাঘের বড় বড় থাবার চিহ্ন!
সেই পায়ের দাগ ধরে অগ্রসর হয়ে মোহনলাল ও কুমার গিয়ে দাঁড়াল একটা শুঁড়িপথের সামনে। সেখানে আবার নতুন ও পুরাতন অসংখ্য পায়ের দাগ–দেখলেই বেশ বোঝা যায়, ব্যাঘ্র মহাশয় সেখানে প্রায়ই বেড়াতে আসেন।
মোহনলাল বললে, পটলবাবুর এই রাজপ্রাসাদে যে এত বেশি বাঘের আনাগোনা, গাঁয়ের কেউ তো সে খবর জানে না।
চিড়িয়াখানার বাঘদের ঘরে যেরকম দুর্গন্ধ হয়, শুড়িপথের গাঢ় অন্ধকারের ভিতর থেকে ঠিক সেইরকম একটা বিশ্রী, বোঁটকা গন্ধ বাইরে বেরিয়ে আসছে!
মোহনলাল একবার সেই ভয়াবহ শুড়িপথের ভিতর দিয়ে দৃষ্টিপাত করলে, তারপর ফিরে কুমারের দিকে তাকিয়ে বললে, কুমারবাবু, এর ভেতরে ঢোকবার সাহস আপনার আছে?
কুমার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললে, পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
তাহলে আমার সঙ্গে আসুন বলেই মোহনলাল বিনা দ্বিধায় সেই অন্ধকারে অদৃশ্য বিপদ ও রহস্যেপূর্ণ শুড়িপথের ভিতরে প্রবেশ করল এবং তার সঙ্গে-সঙ্গে এগুলো কুমার–অটল পদে, নির্ভীক প্রাণে।
