নানান ভাবনার মধ্যে তার সবচেয়ে বড় ভাবনা হচ্ছে, বাঘের গর্তের ভিতর থেকে যে তাকে সেদিন উদ্ধার করলে, কে সেই ব্যক্তি? নিশ্চয়ই সে ডাকাতদের দলের কেউ নয়। গাঁয়ের ভিতরেও কুমারের এমন কোনও বন্ধু নেই (একমাত্র চন্দ্রবাবু ছাড়া) তার জন্যে যার এতটা মাথাব্যথা হবে! এই রহস্যময় ব্যক্তি তার প্রাণরক্ষা করলে, অথচ তাকে দেখাই বা দিলে না কেন?
সে রাতের সব ব্যাপারের সঙ্গেই গভীর রহস্যের যোগ আছে। সে স্বচক্ষে বাঘ দেখলে, বন্দুক ছুড়লে, অথচ জখম হলেন পটলবাবু। বাঘের পায়ের দাগ রয়েছে, অথচ পটলবাবু বলেন, সেখানে বাঘ আসেনি।
কুমার মনে-মনে এমনি সব নাড়াচাড়া করছে, এমন সময়ে দেখতে পেলে, পথ দিয়ে হন হন করে এগিয়ে চলছে মোহনলাল।
মোহনলালও তাকে দেখতে পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, এই যে কুমারবাবু নমস্কার! শুনলুম আপনি নাকি মস্ত বিপদে পড়েছিলেন?
হ্যাঁ। কিন্তু যেমন হঠাৎ বিপদে পড়েছিলুম, তেমনি হঠাৎ উদ্ধারও পেয়েছি!
মোহনলাল বললে, আমি বরাবরই দেখে আসছি কুমারবাবু বিপদের যারা তোয়াক্কা রাখে না, বিপদও যেন তাদের এড়িয়ে চলে।
কুমার একটু হেসে বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, অন্তত আমার জীবনে বারবার তাই-ই হয়েছে। বটে!… কিন্তু এত সকালে আপনি যাচ্ছেন কোথায়?
মোহনলাল বললে, একবার পটলবাবুকে দেখতে যাচ্ছি। সেদিন আর একটু হলেই তো পটলবাবু আপনার হাতেই পটল তুলেছিলেন, নিতান্ত পরমায়ু ছিল বলেই বেচারি এ যাত্রা বেঁচে গেলেন! ভদ্রলোক কেমন আছেন সেই খোঁজ নিতেই চলেছি।
কুমার লজ্জিত ভাবে বললে, চলুন, আমিও আপনার সঙ্গী হব। আমার জন্যেই তাঁর এই দুর্দশা, তার খবর নেওয়া আমার কর্তব্য।
মোহনলালের সঙ্গে খানিকদূর অগ্রসর হয়ে কুমার শুধোলে, আচ্ছা মোহনবাবু, সেদিন যে আমি সত্যি-সত্যিই বাঘ দেখে বন্দুক ছুঁড়েছি, এবিষয়ে আপনার কোনও সন্দেহ আছে কি?
প্রবল ভাবে মাথা নেড়ে মোহনলাল বললে, একটুও না–একটুও না। তার প্রমাণও দেখুন–বলেই সে পকেট থেকে কাগজের ছোট এক মোড়ক বার করলে।
মোড়কের ভিতরে রয়েছে একগোছা লোম। বাঘের লোম।
কুমার বিস্মিত ভাবে বললে, এ লোম আপনি কোথায় পেলেন?
আপনার গুলি খেয়ে পটলবাবু যেখানে পড়ে ছটফট করছিলেন, সেইখানে।
লোমগুলোতে এখনও শুকনো রক্তও লেগে রয়েছে দেখছি।
হ্যাঁ, এ থেকে বোঝা যাচ্ছে, আপনার গুলি বাঘের গায়েও লেগেছে!
কুমার বললে, তা না হতেও পারে। হয়তো পটলবাবুর আহত পায়ের রক্তই লোমগুলোতে লেগে আছে।
কুমারবাবু, এ মানুষের রক্ত নয়।
কি করে জানলেন আপনি?
মোহনলাল গম্ভীর স্বরে বললেন, আমি পরীক্ষা করে দেখেছি।
পরীক্ষা? শুকনো রক্তের দাগ কি লেখা থাকে যে তা মানুষ না পশুর রক্ত?
থাকে কুমারবাবু, থাকে। আপনি কি Bordet Reaction-এর কথা শোনেননি? Bordet সাহেব একরকম পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যার সাহায্যে শুকনো রক্তের দাগ পেলেই বলে দেওয়া যায়, তা মানুষ কি পশুর রক্ত!
আর সে-পদ্ধতি আপনি জানেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ। সেই পদ্ধতিতেই পরীক্ষা করে বুঝেছি, এ রক্ত মানুষের রক্ত নয়।
কুমার বিস্ময়ে ও নিজের অজ্ঞতায় নির্বাক হয়ে রইল। তার চোখে মোহনলাল আজ নতুন রূপে ধরা দিলে। সে বেশ বুঝলে, এ ব্যক্তি তো সাধারণ লোক নয়–নিশ্চয়ই এ অনেক ব্যাপারই জানে এবং বোঝে; এবং এ যে এখানে এসেছে, নিশ্চয়ই তার মধ্যে কোনও গূঢ় কারণ আছে!
খানিকক্ষণ পরে কুমার বললে, বাঘের ডাক শুনলুম, তাকে দেখলুম, গুলি করলুম, সে আহত হল, তার রক্তও পাওয়া গেল, কিন্তু তারপর? কর্পূরের মতো বাঘ কোথায় উবে গেল?
মোহনলাল চিন্তিত মুখে বললে, সেইটেই তো হচ্ছে আসল প্রশ্ন! একটা মস্ত বাঘ তার আস্ত দেহ নিয়ে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল কোথায়?
আর তার সেই খোঁড়া ঠ্যাং নিয়ে পটলবাবুই বা চোখের নিমিষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন কেমন করে?
হো হো করে হেসে উঠে মোহনলাল বললে, প্রাণের দায়ে অসম্ভবও সম্ভব হয়, কচ্ছপও দৌড়ে হরিণকে হারিয়ে দিতে পারে!…তবে পটলবাবু হয়তো ডাকাতদের ভয়ে পিঠটান দেননি।
তবে?
আপনার ভয়েই তিনি বোধ হয় একটি মাত্র ঠ্যাংয়ে ভর দিয়েই লম্বা দিয়েছিলেন।
আমার ভয়ে?
হ্যাঁ। আপনার লক্ষ্যভেদ করবার শক্তির ওপরে হয়তো তার মোটেই বিশ্বাস নেই। একবার বাঘ বধ করতে গিয়ে মারতে গিয়ে পা খোঁড়া করে দিয়েছিলেন, তারপর আবার ডাকাত মারতে গিয়ে আপনি যে তারই প্রাণপাখিকে খাঁচাছাড়া করতেন না, সেটা তিনি ভাবতে পারেননি। কাজে কাজেই যঃ পলায়তি স জীবতি! পটলবাবু বুদ্ধিমানের কাজই করেছিলেন।
কুমার অপ্রতিভ হয়ে হেঁট করলে।
মোহনলাল তারপর যেন নিজের মনে মনেই বললে, কিন্তু এ কীরকম কথা? বাঘের গায়ে লাগল গুলি, বাঘ হল জখম, তবে পটলবাবুর পা কেমন করে খোঁড়া হল?
তাই তো, এ কথাটা তো কুমার এতক্ষণ ভেবে দেখেনি। এও বা কেমন করে সম্ভব হয়?
এখানকার সমস্ত কাণ্ডই যেন আজগুবি, এ বিপুল রহস্যের সমুদ্রে যেন কিছুতেই থই পাবার যো নেই।
তারা পটলবাবুর বাড়ির সুমুখে এসে হাজির হল।
পটলবাবুকে প্রথম দেখে কুমারের যেমন মনে হয়েছিল শ্মশানের চিতার আগুনের ভিতর থেকে একটা মড়া যেন দানোয় পেয়ে জ্যান্ত পৃথিবীর পানে মিটমিট করে তাকিয়ে দেখছে, তেমনি পটলবাবুর বাড়িখানাকেও দেখে কুমারের মনে হল–এ যেন কার বিজন সমাধিভবন।
