ওকে নিয়ে গিয়ে তোমার কি লাভ হবে?
ওরে ব্যাটা ভোঁদা, তোর চেয়ে ভোঁদড়ও চালাক দেখছি। এ ছোঁড়াকে নিয়ে কি করব, এতক্ষণে তাও বুঝিসনি? শোন তবে? আপাতত এ ছোঁড়া আমাদের আড্ডায় বন্দি থাকবে। আসছে অমাবস্যার ডাকাতি করতে বেরুবার আগে মা কালীর সামনে একে বলি দেব। মা বোধ হয় আমাদের ওপর রেগেছেন। তিনি মুখ ফিরিয়েছেন বলেই এ-যাত্রা আমাদের কাদা ঘেঁটে মরাই সার হল। এমন তো কখনও হয় না। মা নিশ্চয় নরবলি চান।
লোকটার মুখের কথা শেষ হতে না-হতেই ভীষণ এক ব্যাঘ্রের গর্জনে আকাশের মেঘ আর অরণ্যের অন্ধকার যেন থর থর করে কেঁপে কেঁপে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ–বারবার তিনবার! তার পরেই সব চুপচাপ!
মহা-আতঙ্কে কম্পিত কণ্ঠে কে বললে, সর্দার!
হু!
বাঘ!
না, আমাদের মা বাঘাইচণ্ডী! বললুম তো, মায়ের খিদে পেয়েছে, মা নরবলি চান। তোরা মাকে খেতে দিলিনে, মা তাই নিজেই খিদে মেটাতে এসেছে।
কিন্তু মা যে আমাদেরই কাকে ধরে নিয়ে গেলেন! এ কীরকম মা নিজের পেটের ছেলেকেই পেটে পুরবেন?
খিদের সময়ে আত্মপর জ্ঞান থাকে না রে ভোদা, আত্মপর জ্ঞান থাকে না। আর কে-ই বা মায়ের ছেলে নয়–মা তো জগৎ জননী, সবাই তো মায়ের ছেলে।
কুমার চুপ করে সব কথা শুনে যাচ্ছিল। নিজের পরিণামের কথাও শুনলে। বলির পশুর মতন তাকে মরতে হবে! তার মনটা যে খুব খুশি হয়ে উঠল না, সে কথা বলাই বাহুল্য।
সর্দার বলে যাকে ডাকা হচ্ছে, তাকে যে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কে এই লোকটা? এই-ই কি ভুলু-ডাকাত? না তার প্রধান অনুচর কালু-সর্দার?
হঠাৎ বিমলের কথা তার মনে হল! সে এখন কলকাতায়। তার বন্ধু যে আজ মরণের পথে এগিয়ে চলেছে একথা সে জানেও না। কুমারের মনে এখন অনুতাপ হতে লাগল, কেন সে বিমলের জন্যে অপেক্ষা করেনি? কেন সে একলা এই বিপদের রাজ্যে এল? বিমল যদি আজ এখানে থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই সে প্রাণপণে তাকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করত–আর খুব সম্ভব তাকে উদ্ধার করতে পারতও হয়তো
আচম্বিতে কি যে হল, কেবল এইটুকুই তার মনে হল, অন্ধকারের ভিতর দিয়ে হুস করে সে নীচের দিকে নেমে গেল, তার পরেই ঝপাং করে একটা শব্দ সঙ্গে সঙ্গে বুঝলে, সে আর মাটির ওপরে নেই, জলের ভিতরে গিয়ে পড়েছে।
একেবারে এক গলা জল? যে লোকটার কাঁধে চড়ে এতক্ষণ সে যাচ্ছিল, সেও এখন জলের মধ্যে!…নিজেকে সামলে নিয়ে হাতড়ে সে বুঝলে, তার সঙ্গের লোকটা একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেছে!
উপরপানে তাকিয়ে দেখলে খালি ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। তা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।
আবার চারিদিক হাতড়ে হাতড়ে সে বুঝলে, তারা একটা গভীর গর্তের ভিতরে গিয়ে পড়েছে। সুন্দরবনের বাসিন্দারা বাঘ ধরবার জন্যে বনের মাঝে-মাঝে গর্ত খুঁড়ে গর্তের মুখটা ঘাস-পাতা-গাছপালা দিয়ে ঢেকে রাখে। এটা নিশ্চয়ই সেইরকম কোনও গর্ত।
কুমার কান পেতে শুনতে লাগল। ডাকাতদের কোনও সাড়াশব্দ নেই। তাদের সর্দার যে মা-বাঘাইচণ্ডীর বলি নিয়ে গর্তের মধ্যে কুপোকাত, একথা নিশ্চয়ই তারা বুঝতে পারেনি। অন্ধকারে অন্ধ হয়ে নিশ্চয়ই তারা এগিয়ে গিয়েছে!
কিন্তু একটু পরেই তো তারা নিজেদের ভ্রম বুঝতে পারবে। তখন আবার তারা সদলবলে ফিরে আসবে।
যদি পালাতে হয় তো এই হচ্ছে পালাবার সময়।
কিন্তু চারিদিককার দেওয়ালে হাত বুলিয়ে কুমার বুঝলে দেওয়াল খাড়া ভাবে ওপরে উঠেছে সাপ আর টিকটিকি না হলে তা বয়ে ওপরে ওঠা অসম্ভব।
সে হতাশ হয়ে পড়ল।
হঠাৎ ওপরে কার দ্রুত পায়ের শব্দ হল,–মাত্র একজনের পায়ের শব্দ!
কে এ? ডাকাতরা কি আবার ফিরে এল? কিন্তু তারা এলে তো দল বেঁধে ফিরে আসবে।
তবে কি এ পুলিশের চর? ডাকাতদের পিছু নিয়েছে?
যা থাকে কপালে–এই ভেবে কুমার চেঁচিয়ে ডাকলে, কে যায়? আমি গর্তের ভেতরে পড়ে গেছি, আমাকে বাঁচাও!
কোন জবাব পাওয়া গেল না। কুমার আবার চেঁচিয়ে বললে, আমি গর্তের মধ্যে পড়ে গেছি আমাকে বাঁচাও!
তখনও জবাব নেই।
কিন্তু হঠাৎ কুমারের মুখের ওপরে কি একটা এসে পড়ল, ঠিক একটা সাপের মতো।
কুমার সভয়ে চমকে উঠল–কিন্তু তার পরেই বুঝলে, ওপর থেকে গর্তের ভিতরে এক গোছ মোটা দড়ি ঝুলছে!
কুমার বিস্মিত হবারও অবকাশ পেলে না–তাড়াতাড়ি দড়িগাছা চেপে ধরতেই ওপর থেকে কে তাকে টেনে তুলতে লাগল!
পাতাল ছেড়ে পৃথিবীর ওপরে এসে দড়ি ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে কুমার উল্লসিত কণ্ঠে বললে, কে তুমি ভাই, আমাকে যমের মুখ থেকে বাঁচালে?
কাউকে দেখা গেল না–খালি অন্ধকার! কোনও জবাব এল না–খালি শোনা গেল কার দ্রুত পায়ের শব্দ! কে যেন সেখান থেকে চলে গেল! যেন ভৌতিক কাণ্ড!
কে এই অজ্ঞাত ব্যক্তি? কেন সে তার সঙ্গে কথা কইলে না, কেন সে পরিচয় দিলে না, কেন সে তাকে বাঁচিয়ে এমন করে পালিয়ে গেল? এ কী আশ্চর্য রহস্য!
খানিক তফাত থেকে অনেক লোকের গলার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।…ডাকাতরা ফিরে আসছে। তারা বুঝতে পেরেছে, সর্দার আর তাদের দলে নেই।
কুমার বেগে অন্য দিকে দৌড় দিল।
.
আট । পটলবাবুর বাড়ি
অমাবস্যার রাতের সেই রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চারের পর কুমারের গায়ের ব্যথা মরতে গেল, এক হপ্তারও বেশি।
সেদিন সকালবেলায় থানার সামনের মাঠে পায়চারি করতে করতে কুমার নানান কথা ভাবছিল।
