চন্দ্রবাবুর কথা শুনতে-শুনতে কুমার দেখতে লাগল, চল্লিশ-পঞ্চাশ হাত তফাত দিয়ে ডাকাতদের দল ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে। তাদের কারুকে দেখা যাচ্ছিল না বটে, কিন্তু বিজলি মশালগুলোর আলো দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল তাদের গতি কোন দিকে!
চন্দ্রবাবু বললেন, দু-একটা আশ্চর্য রহস্যের কোনও কিনারাই আমি করতে পারছি না। ভুলু-ডাকাতদের দল ডাকাতি করতে বেরোয় কেবল অমাবস্যার রাত্রে। আর যে-অঞ্চলেই তার দল ডাকাতি করতে যায়, সেইখানেতেই বাঘের বিষম অত্যাচার হয়! বাঘের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেই তারা যেন ডাকাতি করতে যায়। একবার একজন সাহেবগোয়েন্দা ভুলুকে ধরতে এসেছিল। কিন্তু শেষটা বাঘের কবলেই তার প্রাণ যায়। লোকের মুখে শুনি, বাঘই না কি ভুলুর ইস্টদেবতা, রোজ সে বাঘ-পুজো করে!
বাঘ-পুজো?
হ্যাঁ। সুন্দরবনে এটা কিছু নতুন কথা নয়। অনেকেই এখানে বাঘকে পুজো করে।
দেখুন, দেখুন! ডাকাতের দল অন্য দিকে যাচ্ছে।
হু, ওই দিকেই মোহনলালের বাসায় যাবার পথ। ওরা যে মোহনলালের বাসার দিকেই যাবে, সেটা আমি আগেই আন্দাজ করেছিলুম। পটলবাবুর সন্দেহ ভুল–মোহনলাল যদি ভুলুর দলের লোক হত, তাহলে ডাকাতরা কখনওই তার বাড়ি লুট করতে আসত না।
কুমার বললে, এখন আপনি কি করবেন?
পকেট থেকে একটা বাঁশি বার করে চন্দ্রবাবু বললেন, এইভাবে আমি বাঁশি বাজাব। ডাকাতরা জানে না, ওরা আজ কী ফাঁদে পা দিয়েছে! আমি বাঁশি বাজালেই আমার দলের লোকেরা ওদের ঘেরাও করে ফেলবে। কুমার প্রস্তুত হও!–চন্দ্রবাবু বাঁশি বাজাতে উদ্যত হলেন।
সেই মুহূর্তেই তীব্র স্বরে একটা ফুটবল বাঁশি বেজে উঠল কিন্তু সে চন্দ্রবাবুর বাঁশি নয়!…ডাকাতদের বিজলি মশালগুলো এক পলকে নিবে গেল?
চন্দ্রবাবু এক লাফে ঝোপের বাইরে এসে বললেন, ও বাঁশি কে বাজালে? ডাকাতদের কে সাবধান করে দিলে?–বলতে-বলতে তিনিও বাঁশিতে ফুঁ দিলেন–একবার, দুবার, তিনবার।
জঙ্গলের চারিদিকে পুলিশের লণ্ঠন জ্বলে উঠল, চারিধারে ঝোপঝাপ থেকে দলে-দলে পুলিশের লোক বেরিয়ে এল,–তাদের কারুর হাতে বন্দুক, কারুর হাতে লাঠি।
চন্দ্রবাবু চিৎকার করে বললেন, ডাকাতরা পালাচ্ছে, ওদের আক্রমণ করো! ওইদিকে– ওইদিকে–শিগগির। চন্দ্রবাবু ও কুমার রিভলভার ও বন্দুক ছুঁড়তে-ছুঁড়তে ডাকাতরা যেদিকে ছিল সেইদিকে ছুটতে লাগলেন!
কিন্তু যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে চন্দ্রবাবু ডাকাতদের কারুর টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেলেন না! দারুণ বৃষ্টিতে মাটির ওপর দিয়ে যেন বন্যা ছুটছে, এলোমেলো ঝোড়ো হাওয়ায় বন-জঙ্গল উজ্জ্বল ভাবে দুলছে, বিজলির মশালের সীমানার বাইরে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে, এর মধ্যে ডাকাতরা যে কোথায়, কোনওদিকে গা ঢাকা দিয়েছে তা স্থির করা অসম্ভব বললেই চলে।
চন্দ্রবাবু হতাশভাবে বললেন, নাঃ, আজও খালি কাদা ঘেঁটে মরাই সার হল দেখছি। কিন্তু কোন রাস্কেল বাঁশি বাজিয়ে তাদের সাবধান করে দিলে, সেটা তো কিছুই বোঝা যাচ্ছে না!
কুমার বললে, বোধহয়, ডাকাতদের কোনও চর বনের ভেতরে লুকিয়ে থেকে আমাদের গতিবিধি লক্ষ করছিল!
সম্ভব। কিন্তু আর এখানে অপেক্ষা করে লাভ নেই, আমরা চন্দ্রবাবু কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ পাশের জঙ্গলের ভিতর থেকেই দুখানা বড় বড় কালো হাত বিদ্যুৎ বেগে বেরিয়ে এল এবং পরমুহূর্তে তারা কুমারকে ধরে শূন্যে তুলে নিয়ে আবার অদৃশ্য হয়ে গেল, কুমার একটা চিৎকার করবার অবসর পর্যন্ত পেলে না! বিস্ময়ের প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে কুমার নিজেকে মুক্ত করবার চেষ্টা করলে, সঙ্গে সঙ্গে সেই মহা-বলবান অজ্ঞাত শত্রু তার দেহ ধরে এমন এক প্রচণ্ড আঁকানি দিলে যে, তার সমস্ত জ্ঞান বিলুপ্ত হয়ে গেল।
.
সাত । বাঘের গর্তে
নীচে কল কল করে জলের বন্যা ছুটে চলেছে, উপরেও ঝড়ের তোড়ে নিবিড় গাছপালার ভিতর দিয়ে যেন শব্দের বন্যা ডেকে ডেকে উঠছে এবং এ সমস্তকেই গ্রাস করে নীরবে বয়ে যাচ্ছে যেন অন্ধকারের বন্যা!
এরই মধ্যে কুমার কখন জ্ঞান ফিরে পেলে।
অনুভবে বুঝলে, তার দেহটা দুমড়ে কার কাঁধের ওপরে পড়ে রয়েছে।
সে একটু নড়বার চেষ্টা করতেই একখানা লোহার মতো শক্ত হাতে তাকে টিপে ধরে কে কর্কশ স্বরে বললে, চুপ। ছটফট করলেই টুটি টিপে মেরে ফেলব! তার হাতের চাপেই কুমারের কোমরটা বিষম ব্যথায় টনটনিয়ে উঠল!
ভীমের মতন গায়ের জোর,–কে এই ব্যক্তি? কাঁধে করে কোথায় তাকে নিয়ে যাচ্ছে? কুমারের ইচ্ছা হল, তার মুখখানা একবার দেখে নেয়। কিন্তু যা ঘুটঘুটে অন্ধকার!
পায়ের শব্দে বুঝলে, তার আশেপাশে আরও অনেক লোক আছে। কে এরা? ভুলু ডাকাতের দল? কিন্তু এত লোক থাকতে এরা তাকে বন্দি করল কেন? তাকে নিয়ে এরা কি করতে চায়?
অন্ধকারের ভিতর থেকে কে বললে, বাপরে বাপ, এত অন্ধকার তো কখনও দেখিনি! পথ চলা যে দায় হয়ে উঠল, আলো জ্বালব নাকি?
যে তাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে বললে, খর্বদার নিশে, আলো জ্বালাবার নাম মুখেও আনিস নে! পুলিশের লোক যদি পিছু নিয়ে থাকে তাহলে আলো জ্বাললেই ধরা পড়বি! তার ওপরে এই ছোকরাকে আমি আমার মুখ দেখাতে চাই না!
আর একজন বললে, ওকে মুখই বা দেখাব কেন, আর অমন করে বয়েই বা মরছ কেন? দাওনা এক আছাড়ে সাবাড় করে।
ভোঁদা ব্যাটার বাপ ছেলের ঠিক নামই রেখেছিল। ভোদানইলে অমন বুদ্ধি হয়? ওরে গাধা, আমি কি শখ করে এ ছোঁড়াটাকে ঘাড়ে করে বয়ে মরছি?
