চন্দ্রবাবুও বাঘের পায়ের দাগগুলো দেখে সবিস্ময়ে বলে উঠলেন, এ কী ব্যাপার! পায়ের দাগ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, বাঘটা এদিক পানেই এসেছে বটে, কিন্তু সে যে এখান থেকে আবার ফিরে গেছে, পায়ের দাগ দেখে সেটা মনে হচ্ছে না তো!
আশেপাশে যে লোকগুলো ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল তারা প্রত্যেকেই চমকে উঠল এবং সভয়ে বারংবার চারিদিকে তাকাতে লাগল কি জানি, বাঘটা যদি কাছেই কোনও জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে থাকে।
পটলবাবু বললেন, বন্দুকের শব্দ শুনেই বাঘটা হয়তো লম্বা একটা লাফ মেরে পাশের কোনও ঝোপের ভেতরে গিয়ে পড়েছে। কিন্তু এখানে কোনও বাঘ এসেছে বলে এখনও আমি মানতে রাজি নই,কারণ আমি নিজে কোনও বাঘ দেখিনি!
বাঘের পায়ের দাগগুলো আরও খানিকক্ষণ পরখ করে মোহনলাল বললে, না বাঘ যে এখানে এসেছিল, সেবিষয়ে আর কোনওই সন্দেহ নেই! এখান থেকে সবচেয়ে কাছের ঝোপ হচ্ছে অন্তত চল্লিশ হাত তফাতে। কোনও বাঘই একলাফে অতদূর গিয়ে পড়তে পারে না! কিন্তু কথা হচ্ছে, বাঘটা তবে গেল কোথায়?
পটলবাবু বললেন, সেকথা নিয়ে পরে অনেক মাথা ঘামাবার সময় পাবেন। আপাতত আপনারা আমাকে একটু সাহায্য করুন দেখি,–আমার আর দাঁড়াবার শক্তি নেই? এঃ, ঠ্যাং খানার দফা একেবারে রফা করে দিয়েছে দেখছি! কুমারবাবু মস্ত শিকারি আপনি! বাঘ মারতে এসে মারলেন কিনা মানুষকে! আর মানুষ বলে মানুষ–একেবারে আমাকেই।
লজ্জায়, অনুতাপে কুমার মাথা না হেঁট করে পারলে না।
মোহনলাল কোনও দিকেই না চেয়ে আপন মনে তখনও বাঘের পায়ের দাগগুলো পরীক্ষা করতেই ব্যস্ত ছিল।
পটলবাবু টিটকারি দিয়ে বললেন, বাঘের পা থেকে ধুলোয় দাগ হয় বটে, কিন্তু সে দাগ থেকে আর আস্ত বাঘ জন্মায় না মোহনলালবাবু! মিছেই সময় নষ্ট করছেন!
মোহনলাল মাথা না তুলেই বললে, আমার যেন মনে হচ্ছে, এই বাঘের পায়ের দাগের ভেতর থেকেই আসল বাঘ আমাদের কাছে ধরা দেবে!
পটলবাবুর মরা চোখ আবার জ্যান্ত হয়ে উঠল–ক্ষণিকের জন্যে। তিনি বললেন, বলেন কি মশাই? দাগ থেকে জন্মাবে আস্ত বাঘ, এ কোন জাদুমন্ত্রে?
মোহনলাল বললে, যে জাদুমন্ত্রে মাটিতে পায়ের দাগ রেখে বাঘ শূন্যে উড়ে যায়!
চন্দ্রবাবু বললেন, কথাকাটাকাটি করে লাভ নেই। চলুন, পটলবাবু, আপনি জখম হয়েছেন, আপনাকে আমরা বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।
ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে সুতীক্ষ ফুটবল বাঁশির আওয়াজ শোনা গেল।
চন্দ্রবাবু সচমকে বলে উঠলেন, আমার গুপ্তচরের বাঁশি! সবাই ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে পড়ো সবাই ঝোপের ভেতর লুকিয়ে পড়ো! শিগগির আলো নিভিয়ে দাও!
কুমার সুধোলে, ব্যাপার কী চন্দ্রবাবু? এ বাঁশির আওয়াজের মানে কি?
চন্দ্রবাবু বললেন, আমার গুপ্তচর বাঁশির সঙ্কেতে জানিয়ে দিলে যে, ভুলু-ডাকাতের দল এইদিকেই আসছে। তারা আসছে নিশ্চয় মোহনলালবাবুর বাড়ি লুঠ করতে?…কিন্তু মোহনলাল কোথায় গেলেন?..পটলবাবুই বা কোথায়?
মোহনলাল ও পটলবাবু দুজনেই একেবারে অদৃশ্য!
কুমার বললে, বোধ হয় ভুলু-ডাকাতের নাম শুনেই ভয়ে তারা চম্পট দিয়েছেন।
তাই হবে। এসো কুমার, আমরাও এই ঝোপটার ভেতরে গিয়ে অদৃশ্য হই–বলেই কুমারের হাত ধরে টেনে চন্দ্রবাবু পাশেই একটা জঙ্গলের মধ্যে প্রবেশ করলেন!
বিপদের ওপরে বিপদ! ঠিক সেই সময়ে আকাশের অন্ধকার মেঘগুলো যেন ছ্যাদা হয়ে গেল ঝুপঝুপ করে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরে নিরানন্দের মাত্রা যেন পূর্ণ করে তুললে।
চন্দ্রবাবু বললেন, কুমার, তোমার বন্দুকে টোটা পুরে নাও–এবারে আর বাঘ নয়, হয়তো আমাদের মানুষ শিকারই করতে হবে!
কুমার বললে, সে অভ্যাস আমার আছে। এর আগেও আমাকে মানুষ-শিকার করতে হয়েছে!
.
ছয় । কালো কালো হাত
সে কি বৃষ্টি!–ফেঁটা ফোঁটা করে নয়, অন্ধকার শূন্যের ভিতর থেকে এক এক বিরাট প্রপাত হুড় হুড় করে জল ঢালছে আর ঢালছে।
চন্দ্রবাবু সঙ্গে কুমার যে-ঝোপটার ভিতরে গিয়ে আশ্রয় নিলে, সেটা ছিল ঢালু জমির উপরে। অল্পক্ষণ পরেই তাদের প্রায় কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে দিয়ে কলকল আওয়াজে জলধারা ছুটতে লাগল।
চন্দ্রবাবু বিরক্তকণ্ঠে বললেন,–কপাল যাদের নেহাত পোড়া, তারাই পুলিশে চাকরি নেয়। শ্যাল কুকুররাও আজ বাইরে নেই, আমরা তাদেরও অধম!
কুমার তড়াক করে এক লাফ মেরে বললে, কী মুশকিল। সাপের মতন কি-একটা আমার গায়ের ওপর দিয়ে সাঁত করে চলে গেল!
খুব সাবধান কুমার! বর্ষাকাল সুন্দরবনে সাপের বড় উৎপাত! একটা ছোবল মারলেই ভবলীলা একেবারে সাঙ্গ!…দেখো, দেখো, ওই দেখো! মাঝে-মাঝে ইলেকট্রিক টর্চ জ্বালিয়ে কারা সব এই দিকেই আসছে! নিশ্চয়ই ভুলু-ডাকাতের দল!
কুমার বললে, ভুলু-ডাকাতকে আপনি কখনও দেখেছেন?
কেউ কোনওদিন তাকে দেখেনি। সে নিজে দলের সঙ্গে থাকে না। দলের সঙ্গে থাকে কালু-সর্দার, সে ভুলুর হুকুম মতো দলকে চালিয়ে নিয়ে বেড়ায়। কালু-সর্দারকে আমি দেখেছি, সে যেন এক মাংসের পাহাড়, মানুষের দেহ যে তেমন বিপুল হতে পারে, না দেখলে আমি তা বিশ্বাস করতুম না। কালুর গায়ে জোরও তেমনি। শুনেছি, সে নাকি শুধু হাতে এক আছাড়ে একটা বাঘকে বধ করেছিল। একবার সে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। কিন্তু রাত্রে বেলায় হাজত-ঘরের দেওয়াল থেকে একটা আস্ত জানলা উপড়ে ফেলে সে চম্পট দেয়।
