ঠিক রাত বারোটা!
সঙ্গে সঙ্গে কান-ফাটানো এক ব্যাঘ্রের গর্জন! বাঘের ডাক যে এমন ভয়ানক আর অস্বাভাবিক হতে পারে, কুমারের সে ধারণাই ছিল না, তার সমস্ত শরীর যেন শিউরে শিউরে মুচ্ছিত হয়ে পড়বার মতো হল।
আবার সেই গর্জন–একবার, দুইবার, তিনবার! সে গর্জন শুনে ঝড়ও যেন ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল!
আকাশের কালো মেঘের বুক ছিঁড়ে ফালাফালা করে সুদীর্ঘ এক বিদ্যুতের লকলকে শিখা জ্বলে উঠল–
এবং নীচের দিকে তাকিয়ে কুমার স্পষ্ট দেখলে, প্রকাণ্ড একটা ব্যাঘ্র সামনের জঙ্গলের ভিতর থেকে তিরের মতো বেরিয়ে এল–
এবং অমনি তার বন্দুক ধ্রুম করে অগ্নিবৃষ্টি করলে!
–তার পরেই প্রথমে ব্যাঘ্রের গর্জন এবং সেই সঙ্গে মানুষের করুণ আর্তনাদ।
.
পাঁচ । মানুষ শিকার
বাঘের ডাক আর মানুষের আর্তনাদ থামতে না থামতেই সারি সারি লণ্ঠনের ও বিজলি মশালের (ইলেকট্রিক টর্চ) আলোতে চারিদিকের অন্ধকার যেন খণ্ড খণ্ড হয়ে গেল! ঝোপঝাপের ভিতর থেকে দলে দলে পুলিশের লোক গোলমাল করতে করতে বেরিয়ে আসতে লাগল।
কুমারও তর তর করে গাছের ওপর থেকে নেমে এল। কিন্তু নেমে এসে গাছের নীচে চৌকিদারকে আর দেখতে পেলে না। নিশ্চয়ই বাঘের ডাক শুনেই পৈত্রিক প্রাণটি হাতে করে সে চম্পট দিয়েছে।
মুখ তুলেই দেখে, চন্দ্রবাবু একহাতে রিভলভার আর এক হাতে বিজলি-মশাল নিয়ে ছুটতে ছুটতে তার দিকেই আসছেন।
কাছে এসেই চন্দ্রবাবু উত্তেজিত স্বরে বললেন, কুমার, তুমিই কি বন্দুক ছুঁড়েছ?
কুমার বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি বাঘটাকে দেখেই বন্দুক ছুঁড়েছি, কিন্তু আর্তনাদ করে উঠল একজন মানুষ!
বাঘটাকে তুমি কোনখানে দেখছে!
খুব কাছেই। ওই যে, ওইখানে!
চন্দ্রবাবু সেইদিকে বিজলি-মশালের আলো ফেলে বললেন, কই, ওখানে তো বাঘের চিহ্নও নেই! কিন্তু মাটির ওপরে ওখানে কে বসে আছে?–দু-পা এগিয়েই তিনি বিস্মিত স্বরে বললেন, আরে এ যে আমাদের পটলবাবু।
কুমার এগিয়ে গিয়ে দেখলে পটলবাবু মাটিতে বসে গায়ের চাদরখানা দিয়ে নিজের ডান পা-খানা বাঁধবার চেষ্টা করছেন।
চন্দ্রবাবু বললেন, এ কী পটলবাবু, আপনি এখানে কেন? আপনার পায়ে কি হয়েছে, চাদর জড়াচ্ছেন যে!
পটলবাবু যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে বললেন, যে-জন্যে আপনারা এখানে, আমিও সেইজন্যেই এখানে এসে লুকিয়েছিলুম! কিন্তু ওই ভদ্রলোক যে গুলি করে আমায় একখানা পায়ের দফা একেবারে রফা করে দেবেন, তা তো আমি জানতুম না! গুলিটা যদি আমার মাথায় কি বুকে লাগত তাহলে কি হত বলুন দেখি?
কুমার অপ্রস্তুত স্বরে বললে, কিন্তু আমি যে স্বচক্ষে বাঘটাকে দেখেই বন্দুক ছুঁড়েছি। আপনার পায়ে কেমন করে গুলি লাগল কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
ক্রুদ্ধস্বরে পটলবাবু বললেন, বাঘকে দেখে বন্দুক ছুঁড়েছেন না, ঘোড়ার ডিম করেছেন। কাছেই কোথায় একটা বাঘ ডেকেছিল বটে, কিন্তু এখানটায় কোনও বাঘই আসেনি। এখানে বাঘ এলে আমি কি দেখতে পেতুম না? আপনি স্বপ্নে বাঘ দেখে আঁতকে উঠেছেন!
ঠিক মাথার উপরকার একটা গাছ থেকে কে বলে উঠল, না, কুমারবাবু সজাগ হয়েই বাঘ দেখেছেন–আমিও সজাগ হয়েই বাঘ দেখেছি! পটলবাবু যেখানে বসে আছেন, বাঘটা ঠিক ওইখানেই এসে দাঁড়িয়েছিল!
সকলে আশ্চর্য হয়ে উপরপানে তাকিয়ে দেখলে গাছের গুঁড়ি ধরে একজন লোক নীচে নেমে আসছে।
চন্দ্রবাবু সবিস্ময়ে বললেন, একি, মোহনলালবাবু যে! গাছের ওপরে চড়ে আপনি এতক্ষণ কী করছিলেন!
কুমারের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে মোহনলাল বললে, গাছে বসে ওই ভদ্রলোকেও যা করছিলেন, আমিও তাই করছিলুম। অর্থাৎ দেখছিলুম বিপদ কোনদিক দিয়ে আসে!
মোহনলালের বয়স হবে প্রায় চুয়াল্লিশ, মাথায় কাঁচা-পাকা বাবরি-কাটা চুল, কাঁচা-পাকা গোঁফ ও ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, রং শ্যামবর্ণ, দেহখানি খুব লম্বা-চওড়া–দেখলেই বোঝা যায়, বয়সে প্রৌঢ় হলেও তার গায়ে রীতিমতো শক্তি আছে।
চন্দ্রবাবু বললেন, আপনি, বাঘের কথা কি বলছিলেন না?
মোহনলাল বললে, হ্যাঁ। পটলবাবু যেখানে বসে আছেন, বিদ্যুতের আলোতে ঠিক ওইখানেই আমি একটা মস্তবড় বাঘকে স্বচক্ষে দেখেছি। তার পরেই বন্দুকের আওয়াজ হল– সঙ্গে সঙ্গে শুনলুম বাঘের গর্জন আর মানুষের আর্তনাদ! তারপরে এখন দেখছি, এখানে বাঘের বদলে রয়েছেন পটলবাবু।
পটলবাবুর মরা-মানুষের চোখের মতো চোখদুটো হঠাৎ একবার জ্যান্ত হয়ে উঠেই আবার ঝিমিয়ে পড়ল। তারপর তিনি বিরক্ত স্বরে বললেন, এখানে যে বাঘ-টাঘ আসেনি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছি আমি নিজে। বাঘটা এখানে এলে আমি এতক্ষণ জ্যান্ত থাকতুম না।
চন্দ্রবাবুও সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, পটলবাবুর এ যুক্তি মানতে হবে। আপনারা দুজনেই ভুল দেখেছেন!
পটলবাবু বললেন, দুজনে কেন, একশো জনে ভুল দেখলেও কোনও ক্ষতি ছিল না, কিন্তু সত্যি সত্যি বন্দুক ছোঁড়াটা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে।…এঃ, আমার ঠ্যাংখানার দফা একেবারে রফা হয়ে গেছে,উঃ! আমি যে আর উঠতেও পারছি না।
কুমার বেচারি একদম হতভম্বের মতন হয়ে গেল! সে যে বাঘটাকে দেখেছে। এবং তাকে দেখেই বন্দুক ছুড়ছে, এবিষয়ে তার কিছুমাত্র সন্দেহ ছিল না, অথচ অন্যের সন্দেহভঞ্জন করবার জন্যে কোনও প্রমাণই তার হাতে নেই।
মোহনলাল একটা বিজলি মশাল নিয়ে মাটির ওপরে ফেলে বলে উঠল, এই দেখুন চন্দ্রবাবু বাঘ যে এখানে এসেছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ দেখুন। এই দেখুন, কাঁচামাটির ওপরে বাঘের থাবার দাগ। এই দেখুন, ওই ঝোপটার ভেতর থেকে থাবার দাগগুলো এইখানে এগিয়ে এসেছে!..কিন্তু কী আশ্চর্য! দেখুন চন্দ্রবাবু দেখুন!
