কুমারের চা এল। চা পান করতে করতে নীরবে সে ভাবতে লাগল।
চন্দ্রবাবু বললেন, রহস্যের ওপর রহস্য! আজ দিনকয় হল মানসপুরে কে-একজন অচেনা লোক এসে বাসা বেঁধেছে, তাকে সর্বত্রই দেখা যায়, কিন্তু সে যে কে, তা কেউ জানে না। লোকটার সমস্ত ব্যবহারই সন্দেহজনক! এখানকার মুরুব্বি পটলবাবু বলেন, নিশ্চয়ই সে ভুলু ডাকাতের চর! আপাতত ইচ্ছা থাকলেও আমরা তার সম্বন্ধে ভালো করে খোঁজখবর নিতে পারছি না, কারণ এই মেয়েচুরির হাঙ্গামের জন্যে আমার আর কোনও দিকেই ফিরে তাকাবার অবসর নেই। তবে তার ওপরেও কড়া পাহারা রাখতে আমি ভুলিনি।
কুমার বললে, লোকটার নাম কী?
মোহনলাল বসু। শুনলুম, সে কোথাকার জমিদার, এখানে এসেছে বেড়াতে। যদিও এখানে সমুদ্রের হাওয়া বয়, কারণ খানিক তফাতেই সমুদ্র আছে, কিন্তু এটা কি বেড়াতে আসবার জায়গা, বিশেষ এই বিভীষিকার সময়ে?..তারপর শুনলাম সে কাল গাঁয়ের অনেকের কাছে গল্প করে বেড়িয়েছে যে তার বাড়িতে নাকি নগদ অনেক হাজার টাকা আছে। এমন বোকা লোকের কথা কখনও শুনেছ? আশপাশে প্রায়ই ভুলু-ডাকাত হানা দিয়ে বেড়াচ্ছে, সেটা জেনেও একথাটা প্রকাশ করতে কি তার ভয় হল না ভুলু-ডাকাতের কানে এতক্ষণ মোহনলালের টাকার কথা গিয়ে পৌঁছেছে, আর পটলবাবুর সন্দেহ যদি ভুল হয়, অর্থাৎ মোহনলাল যদি ভুলু-ডাকাতের চর না হয়, তাহলে আসছে কাল অমাবস্যার গোলমালে ভুলু যে তার বাড়িতে হানা দেবে, এটা আমি মনে ঠিক দিয়ে রেখেছি।
খানিকক্ষণ চিন্তিত ভাবে নীরব থেকে চন্দ্রবাবু বললেন, এখন বুঝেছ, আমি কীরকম মুশকিলে ঠেকেছি? একেই এই মেয়ে-চুরির মামলা নিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছি, তার ওপরে কাল ওই মোহনলালের বাড়ির আনাচে-কানাচেই আমাকে রাত কাটাতে হবে, কারণ শ্রীমান ভুলু বাবাজি কাল হয়তো দয়া করে ওখানে পায়ের ধুলো দিলেও দিতে পারেন!
কুমার বললে, চন্দ্রবাবু, আপনি আমার একটি কথা রাখবেন?
কি কথা? তুমি যখন অশোকের বন্ধু তখন তুমি আমারও ছেলের মতো। সাধ্যমতো আমাকে তোমার আবদার রাখতে হবে বইকী!
কুমার বললে, যতদিন না এই মামলার কোনও নিষ্পত্তি হয়, ততদিন আপনার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে থাকতে দেবেন কি?
চন্দ্রবাবু খুব খুশি মুখে বললেন, একথা আর বলতে? তোমার মতন সাহসী আর বুদ্ধিমান সঙ্গী পেলে তো আমি বর্তে যাই! তুমি যদি আমার সঙ্গে থাকো, তা হলে আমি হয়তো খুব শীঘ্রই এ মামলাটার একটা কিনারা করে ফেলতে পারব!
.
চার । আধুনিক ব্যাঘ্র
অমাবস্যার রাত!
নিঝুম রাত করছে ঝাঁ-ঝাঁ, নিরেট অন্ধকার করছে ঘুটঘুট!
তার ওপরে বিভীষিকাকে আরও ভয়ানক করে তোলবার জন্যেই যেন কালো আকাশকে মুড়ে আরও বেশি কালো মেঘের পর মেঘের সারি দৈত্যদানবের নিষ্ঠুর সৈন্যশ্রেণির মতো শূন্যপথে ধেয়ে চলেছে, দিশেহারা হয়ে!
মাঝে-মাঝে দপদপ করে বিদ্যুৎ জ্বলে জ্বলে উঠছে–সে যেন জ্বালামুখী প্রেতিনীদের আগুন-হাসি!
বন জঙ্গল, বড় বড় গাছপালাকে দুলিয়ে, ধাক্কা মেরে নুইয়ে দুরন্ত বাতাসের সঙ্গে কারা যেন পৃথিবীময় পাগলের কান্না কেঁদে ছুটে ছুটে আর মাথা কুটে কুটে বুক চাপড়ে বেড়াচ্ছে।
মানসপুর যেন এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে ডুবে প্রাণহীন হয়ে পড়ে আছে। সেখানে যে ঘরে ঘরে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হাতে করে সজাগ হয়ে বসে আছে, বাহির থেকে এমন কোনও সাড়াই পাওয়া যাচ্ছে না।
খুব উঁচু একটা বটগাছের ডালে বসে কুমার নিজের রেডিয়মের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে, রাত বারোটা বাজতে আর মোটে দশ মিনিট দেরি আছে!
বন্দুকটা ভালো করে বাগিয়ে ধরে কুমার গাছের ডালের ওপরে যতটা পারে সোজা হয়ে বসল। সে নিজেই এই গাছটা পছন্দ করে নিয়েছে। যদি কোনও সাহায্যের দরকার হয়, তাই তার জন্যে চন্দ্রবাবু গাছের নীচেই এক চৌকিদারকে মোতায়েন রেখেছেন।…এই গাছ থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ফুট দূরেই সেই নির্বোধ মোহনলালের বাসাবাড়ি। চন্দ্রবাবু নিজেও কাছাকাছি কোনও ঝোপঝাপের ভিতরে সদলবলে গা-ঢাকা দিয়ে আছেন।
কুমার নিজের মনে-মনেই বললে, আর আট মিনিট! আঃ, এ মিনিটগুলো যেন ঘড়ির কাটার জোড় করে টেনে রেখেছে–এরা যেন তাকে এগুতে দিতে রাজি নয়! আর ছমিনিট! চন্দ্রবাবুর কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে বারোটা বাজলেই সেই আশ্চর্য বাঘের চিৎকার শোনা যাবে। একেলে বাঘগুলোও কি সভ্য হয়ে উঠল, ঘড়ি না দেখে মানুষের ঘাড় ভাঙতে বেরোয় না?…হাওয়ার রোখ ক্রমেই বেড়ে উঠছে, গাছটা বেজায় দুলছে,–শেষটা ধপাস করে পপাত ধরণীতলে না হই!..আর চার মিনিট!.আর তিন-মিনিট…আর দু-মিনিট! কুমারের হৃৎপিণ্ডটা বিষম উত্তেজনায় যেন লাফাতে শুরু করলে, ছিদ্রহীন অন্ধকারের এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত আগ্রহদীপ্ত চোখ দুটোকে ক্রমাগত বুলিয়ে সে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল–যে মূর্তিমান আতঙ্ক এখনি এখানে এসে আবির্ভূত হবে! কিন্তু তার কোনও খোঁজই মিলল না!
আচ্ছা, বাঘ যদি এদিক না এসে অন্যদিকে যায়। কিন্তু যেদিকেই যাক, বাঘের ডাক তো আর সেতারের মিনমিনে আওয়াজ নয়, তার গর্জন আমি শুনতে পাবই। আর বাঘের বদলে যদি এদিকে আসে ভুলু-ডাকাতের দল, তাহলেও বড় মন্দ মজা হবে না–আর আধ মিনিট!
গোঁ-গোঁ-গোঁ-গোঁ করে আচম্বিতে ঝড় জেগে উঠে বটগাছটার ওপরে ভীষণ একটা ঝাঁপটা মারলে–পড়তে-পড়তে কুমার কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিলে।
