কিন্তু তার আগেই অতি-সতর্ক জয়ন্ত ছুটন্ত গাড়ি থেকে বাঘের মতো লাফিয়ে পড়েছে। এবং গর্জন করে উঠেছে তারও হাতের রিভলভার!
গুলি গিয়ে বিদ্ধ করল মূর্তির ডান হাতখানা, তার রিভলভারটা খসে পড়ল মাটির ওপরে সশব্দে। কেবল রিভলভার নয়, আর একটাও কি মাটিতে পড়ার শব্দ হল–বোধহয় বংশদণ্ড! অস্ফুট আর্তনাদ করে মূর্তিটা ফিরে দাঁড়িয়ে পালাবার উপক্রম করলে, কিন্তু পারলে না, এক সেকেন্ড টলটলায়মান হয়েই হুড়মুড় করে লম্বমান হল একেবারে পথের উপর।
দপদপিয়ে জ্বলে উঠল চার-চারটে টর্চের বিদ্যুত্বহ্নি।
জয়ন্ত ক্ষিপ্রহস্তে ভূপতিত মূর্তিটার গা থেকে কাপড়-চোপড়গুলো টান মেরে খুলে দিলে। দেখা গেল, তার দুই পদের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে আছে দুইখানা সুদীর্ঘ যষ্টি ইংরেজিতে যাকে বলে still। এবং বাংলায় যাকে বলে রণ-পা।
জয়ন্ত বললে, দেখছি, এর মুখে রয়েছে একটা প্রকাণ্ড মুখোশকাফ্রির মুখোশ। এখন। মুখোশের তলায় আছে কার শ্রীমুখ, সেটাও দেখা যেতে পারে। আর এক টানে খসে পড়ল মুখোশও।
হরেন সবিস্ময়ে বলে উঠল, আরে, এ যে দেখছি আমাদের পাড়ার বাপে-খেদানো মায়ে তাড়ানো ছেলে রামধন মুখুয্যে। এ বয়স বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই কুপথে যায়, কুসঙ্গীদের দলে মেশে, নেশাখোর হয়, জুয়া খেলে, পাড়ার লোকদের ওপরে অত্যাচার করে। এর জন্যে সবাই এ্যস্ত, ব্যতিব্যস্ত। কিন্তু এর পেটে-পেটে যে এমন শয়তানি, এতটা তো আমাদের স্বপ্নেরও অগোচর। ছিল!
.
পাঁচ
জয়ন্ত বললে, সুন্দরবাবু, প্রধান প্রধান সূত্রের কথা আগেই বলেছি, এখন সব কথা আবার নতুন করে বলবার দরকার নেই। কেবল দু-তিনটে ইঙ্গিত দিলেই যথেষ্ট হবে। গোড়া থেকেই আমার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল, অপরাধী হরেনেরই পাড়ার লোক। সে পাড়ায়–এমনকী, সে শহরেও নয় ফুট উঁচু কোনও লোকই নেই। সুতরাং ধরে নিলুম সে উঁচু হয়েছিল কৃত্রিম উপায় অবলম্বন করে। অপরাধের সময়ে সে আবছায়ায় অবস্থান করে–পাছে কেউ তার কৃত্রিম উপায়টা আবিষ্কার করে ফেলে; তাতেই আমার ধারণা হল দৃঢ়মূল। এখন সেই কৃত্রিম উপায়টা কি হতে পারে? শশীপদ শুনেছিল, খটাখট খটাখট করে কি একটা শব্দ ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে! এই নিয়ে ভাবতে-ভাবতে ধাঁ করে আমার মাথায় আসে রণ-পার কথা। রণ-পার ওপরে আরোহণ করলে মানুষ কেবল উঁচু হয়ে ওঠে না, খুব দ্রুতবেগে চলাচলও করতে পারে। সেকালে বাংলাদেশের ডাকাতরা এই রণ-পায় চড়ে এক এক রাতেই পঞ্চাশ-ষাট মাইল পার হয়ে যেতে পারত। পদক্ষেপের সময়ে রণ-পা যখন মাটির ওপরে পড়ে, তখন খটাখট করে শব্দ হয়, কিন্তু রণ-পা-এ উঠে কেউ স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, টাল সামলাবার জন্যে চলাফেরা করতে হয়। অপরাধী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবার জন্যে একগাছা বাঁশের সাহায্য গ্রহণ করত। কার্য সিদ্ধির পর বাঁশটাকে সে ঘটনাস্থলেই পরিত্যাগ করে যেত, কারণ রণ-পা-এ চড়ে ছোটবার সময় এত বড় একটা বাঁশ হয়ে ওঠে উপসর্গ মতো।
সুন্দরবাবু বললেন, হুম এসব তো বুঝলুম, কিন্তু আসামি এমন বোকার মতো আমাদের হাতে ধরা দিলে কেন, সেটাতো বোঝা যাচ্ছে না।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, ওটা আবার কল্পনা শক্তির মহিমা। আগেই বলেছি তো, অপরাধীরা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করতে গিয়েই বিপদে পড়ে। অপরাধী সর্বদাই খবর রাখত, পাড়ার কোনও ব্যক্তি কবে কী করবে বা কী করবে না। আমার নির্দেশ অনুসারে হরেন রটিয়ে দিয়েছিল, কলকাতার ব্যাঙ্কের পর ব্যাঙ্ক ফেল হচ্ছে, সে ব্যাঙ্কে আর নিজের টাকা রাখবে না। অমুক তারিখে কলকাতায় গিয়ে সব টাকা তুলে নিয়ে আসবে। অপরাধী এ টোপ না গিলে পারেনি।
সুন্দরবাবু বললেন, একেই বলে, ফাঁকতালে কিস্তিমাত।
অলৌকিক বিভীষিকা (উপন্যাস)
এক । খবরের কাগজের রিপোর্ট
বঙ্গদেশ হচ্ছে একখানি সাপ্তাহিক পত্র। তাতে এই খবরটি বেরিয়েছেঃ
সুন্দরবনের নিকটে মানসপুর। মানসপুরকে একখানি বড়সড়ো গ্রাম বা ছোটখাটো শহর বলা চলে। কারণ সেখানে প্রায় তিন হাজার লোকের বসবাস।
সম্প্রতি মানসপুরের বাসিন্দারা অত্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়াছে। প্রতি অমাবস্যার রাত্রে সেখানে এক অলৌকিক বিভীষিকার আবির্ভাব হয়।
আসল ব্যাপারটা যে কি, কেহ-ই সেটা আন্দাজ করিতে পারিতেছে না। পুলিশ প্রাণপণে তদন্ত করিয়াও বিশেষ কিছুই স্থির করিতে পারে নাই। গ্রামের চারিদিকে কড়া পাহারা বসিয়াছে। বন্দুকধারী সিপাহীরা সর্বদাই প্রস্তুত হইয়া থাকে। তথাপি প্রতি অমাবস্যার রাত্রে মানসপুর হইতে এক একজন মানুষ অন্তর্হিত হয়।
আজ এক বৎসর কাল ধরিয়া এই অদ্ভুত কাণ্ড হইতেছে। গত বারোটি অমাবস্যার রাত্রে বারোজন লোক অদৃশ্য হইয়াছে। প্রতি দুর্ঘটনার রাত্রেই একটা আশ্চর্য বিষয় লক্ষ করা গিয়াছে। মানসপুর সুন্দরবনের কাছাকাছি হইলেও, তার ভিতরে এতদিন ব্যাঘ্রের উৎপাত বড়-একটা ছিল না। কিন্তু দুর্ঘটনার আগেই এখন ঘটনাস্থলের চারিদিকে ঘন ঘন ব্যাঘ্রের চিৎকার শোনা যায়। ঠিক অমাবস্যার রাত্রি ছাড়া আর কোনওদিনই এই অদ্ভুত ব্যাঘ্রের সাড়া পাওয়া যায় না। এ ব্যাঘ্র যে কোথা হইতে আসে এবং কোথায় অদৃশ্য হয় কেহ-ই তা জানে না। আজ পর্যন্ত কেহই তাকে চোখে দেখে নাই।
