এইবারে তৃতীয় ঘটনা। শশীপদ আমার প্রতিবেশী। কলকাতার বড়বাজারে তার কাপড়ের দোকান। ফি শনিবারে সে দেশে আসে–গেল শনিবারেও আসছিল। তখন সন্ধ্যা উতরে গিয়েছিল, কিন্তু উঁদ ওঠেনি। স্টেশন থেকে শহরে আসতে-আসতে পথের একটা মোড় ফিরেই। শশীপদ সভয়ে দেখতে পায় সেই অসম্ভব ঢ্যাঙা বীভৎস মূর্তিটাকে। মানে ভালো করে সে। কিছুই দেখতে পায়নি, কেবল এইটুকু বুঝেছিল যে মূর্তিটা সহজ মানুষের চেয়ে প্রায় ডবল উঁচু। সেদিনও সে রিভলভার ছুঁড়ে শশীপদর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা হস্তগত করে। শশীপদ দৌড়ে একটা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়ে। তারপর সেইখানে বসেই শুনতে পায় খটাখট খটাখট-খটাখট করে কীসের শব্দ। ক্রমেই দূরে গিয়ে সে শব্দ মিলিয়ে যায়। শশীপদ ভয়ে সারা রাত বসেছিল জঙ্গলের ভিতরেই। সকালে বাইরে এসে পথের ওপরে দেখতে পায় একগাছা বাঁশ।
জয়ন্ত, এই তো ব্যাপার। পরপর তিন-তিনটে অদ্ভুত ঘটনা ঘটায় আমাদের শহর রীতিমতো আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছে। সন্ধ্যার পর দলে খুব ভারী না হলে পথিকরা স্টেশন থেকে ওপথ দিয়ে শহরে আসতে চায় না। অনেকেই মূর্তিটাকে অলৌকিক বলেই ধরে নিয়েছে। এখন তোমার মত কি?
.
তিন
জয়ন্ত স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কয়েক মিনিট। তারপর ধীরে ধীরে বললে, ঘটনাগুলোর মধ্যে কী কী লক্ষ করবার আছে, তা দেখ। বাংলাদেশে নয় ফুট উঁচু মানুষ থাকলে এতদিনে সে সুবিখ্যাত হয়ে পড়ত। সুতরাং অনুমান করা যেতে পারে অপরাধী নয় ফুট উঁচু নয়। সে দেহের নীচের দিকটা ঘাগরায় বা ঘেরাটোপে ঢেকে রাখে। কেন? তার মুখ অমানুষিক বলে মনে হয়। কেন? সে একটা লম্বা বাঁশ হাতে করে দাঁড়িয়ে থাকে, আবার বাঁশটাকে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায়। কেন? সে প্রত্যেকবারেই চেষ্টা করে, তার চেহারা কেউ যেন স্পষ্ট করে দেখতে না পায় কেন? শশীপদ শুনেছে, খটাখট খটাখট করে একটা শব্দ ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে। কীসের শব্দ?
সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কিছু অনুমান করতে পারছ?
কিছু কিছু পারছি বইকী! হরেন, ওই তিনটে ঘটনায় যাঁদের টাকা খোয়া গিয়েছে, তারা কি শহরের বিভিন্ন পল্লির লোক?
না, তারা সকলেই প্রায় এক পাড়াতেই বাস করেন।
–তবে তোমাদের পাড়ায় বা পাড়ার কাছাকাছি কোথাও বাস করে এই অপরাধী!
–কেমন করে জানলে?
নইলে ঠিক কোন দিনে কোন সময়ে কোন ব্যক্তি প্রচুর টাকা নিয়ে দেশে ফিরে আসবে, অপরাধী নিশ্চয়ই সে খবর রাখতে পারত না।
না জয়ন্ত, আমাদের পাড়ায় কেন, আমাদের শহরেও নয় ফুট উঁচু লোক নেই।
–আমিও ওকথা জানি।
–তোমার কথা আমি বুঝতে পারছি না।
–আপাতত বেশি কিছু বুঝেও কাজ নেই। আমাকে আরও কিঞ্চিৎ চিন্তা করবার সময় দাও। তুমি দেশে ফিরে যাচ্ছ তো?
হ্যাঁ।
–পরশুদিনই আমার কাছ থেকে একখানা জরুরি চিঠি পাবে। আমার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে। তার ঠিক এক সপ্তাহ পরে তুমি কলকাতার এসে আমাদের দেশে নিয়ে যাবে।
হরেন চলে গেল। জয়ন্ত যেন নিজের মনেই গুণগুণ করে বলল, খটাখট খটখট খটাখট। মূল্যবান সূত্র।
.
চার
নির্দিষ্ট দিনে দুপুরবেলায় হরেন এসে হাজির।
জয়ন্ত শুধোলে, চিঠিতে যা যা বলেছি ঠিক সেইমতো কাজ করেছ তো?
–অবিকল।
–মানিক, সুন্দরবাবুকে ফোন করে জানাও, আজ সাড়ে পাঁচটার ট্রেনে আমরা যাত্রা করব।
প্রায় সাড়ে সাতটার সময়ে তারা হরেনদের দেশে এসে নামল।
আকাশ সেদিন নিশ্চন্দ্র। স্টেশন থেকে শহরে যাবার রাস্তায় সরকারি তেলের আলোগুলো অনেক তফাতে-তফাতে থেকে মিটমিট করে জ্বলে যেন অন্ধকারের নিবিড়তাকেই আরও ভালো করে দেখবার চেষ্টা করছিল! নির্জন পথ! আশপাশের ঝোপঝাড়ের বাসিন্দা কেবল মুখর ঝিল্লির দল। দুখানা সাইকেল রিকশায় চড়ে তারা যাচ্ছিল। প্রথম গাড়িতে বসেছিল হরেন ও মানিক। দ্বিতীয় গাড়িতে জয়ন্ত ও সুন্দরবাবু।
সুন্দরবাবু বললেন, তুমি কি যে বুঝেছ তা তুমিই জানো, আমি তো ছাই এ ব্যাপারটার ল্যাজামুড়ো কিছুতেই ধরতে পারিনি।
জয়ন্ত বললে, ঘটনাগুলো আমিও শুনেছি, আপনিও শুনেছেন। তারপর প্রধান প্রধান সূত্রের দিকে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে ছাড়িনি। মাথা খাটালে আপনি অনেকখানিই আন্দাজ করতে পারতেন।
–মস্তক যথেষ্ট ঘর্মাক্ত করবার চেষ্টা করেছি ভায়া, কিন্তু খানিকটা ধোঁয়া (তাও গাঁজার ধোঁয়া) ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাইনি।
–মুটেরাও মস্তককে যথেষ্ট ঘর্মাক্ত করে কিন্তু তারা উপলব্ধি করে কতটুকু সুন্দরবাবু, আমি আপনাকে মস্তক ঘর্মাক্ত করতে বলছি না, মস্তিষ্ক ব্যবহার করতে বলছি।
–একটা শক্ত রকম গালাগালি দিলে বটে কিন্তু তোমার কি বিশ্বাস, আজকেই তুমি এই মামলাটার কিনারা করতে পারবে?
–হয়তো পারব, কারণ অপরাধীরা প্রায়ই নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কাজ করে বিপদে পড়ে। হয়তো পারব না, কারণ কোনও কোনও অপরাধী নিজের নির্দিষ্ট পদ্ধতি ত্যাগ করতেও পারে। কিন্তু হুশিয়ার! পথের মাঝখানে আবছায়া গোছের কি-একটা দেখা যাচ্ছে না?
হ্যাঁ, দেখা যাচ্ছে বটে! মুক্ত আকাশের স্বাভাবিক আলো দেখিয়ে দিলে, অন্ধকারের মধ্যে একটা অচঞ্চল ও নিশ্চল ও সুদীর্ঘ ছায়ামূর্তি। বাতাসে নড়ে-নড়ে উঠছে কেবল তার পরনের জামা-কাপড়গুলো।
আচম্বিতে একটা অত্যন্ত কর্কশ ও হিংস্র চিৎকার চারিদিকের নিস্তব্ধতাকে চমকে দিয়ে জেগে উঠল–এই! থামাও গাড়ি, থামাও গাড়ি! সঙ্গে-সঙ্গে রিভলভারের শব্দ।
