আর একটি আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, অদৃশ্য হইয়াছে তাদের মধ্যে একজনও পুরুষ নাই! প্রত্যেকেই স্ত্রীলোকে এবং প্রত্যেকেরই গায়ে ছিল অনেক টাকার গহনা।
পুলিশ প্রথমে স্থির করিয়াছিল যে, এসমস্ত অনিষ্টরই মূল হইতেছে কোন নরখাদক ব্যাঘ্র। কিন্তু নানা কারণে পুলিশের মনে এখন অন্যরকম সন্দেহের উদয় হইয়াছে। সুন্দরবনের ভিতরে আছে ভুলু-ডাকাতের আস্তানা এবং দল ও অঞ্চলে প্রায়ই অত্যাচার করিয়া থাকে। অনেক চেষ্টা ও পুরস্কার ঘোষণা করিয়াও পুলিশ আজ পর্যন্ত ভুলু-ডাকাতকে গ্রেপ্তার করিতে পারে নাই। পুলিশের বিশ্বাস, মানসপুরের সমস্ত দুর্ঘটনার জন্য ওই ভুলু-ডাকাতই দায়ী।
কে যে দায়ী এবং কে যে দায়ী নয়, একথা আমরা জানিনা বটে, কিন্তু এটা বেশ বুঝা যাইতেছে যে, মানসপুরের দুর্ঘটনার মধ্যে আশ্চর্য কোনও রহস্য আছে। আমরা বিশ শতাব্দীর মানুষ না হইলে এসব ব্যাপারকে হয়তো ভূতুড়ে কাণ্ড বলিয়া মনে করিতাম। ডাকাত করে ডাকাতি, ঠিক অমাবস্যার রাত্রেই চোরের মতো আসিয়া তারা কেবল এক-একজন স্ত্রীলোককে চুরি করিয়া লইয়া যাইবে কেন? আর এই ব্যাঘ্র রহস্যটাই বা কি? এ কোন দেশী ব্যাঘ্র? এ কি পাঁজি পড়িতে জানে? পাঁজি-পুথি পড়িয়া ঠিক অমাবস্যার রাত্রে মানসপুরের আসরে গর্জন-গান গাহিতে আসে? কে এ প্রশ্নের উত্তর দিবে?
.
দুই । বাঘার বিপদ
খবরের কাগজখানা হাত থেকে নামিয়ে রেখে কুমার নিজের মনেই বললে, এ প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করব, আমি!..বঙ্গদেশ-এর রিপোর্টার ঠিক আন্দাজ করেছেন, এর মধ্যে নিশ্চয় কোনও রহস্য আছে, হ্যাঁ, আশ্চর্য কোনও রহস্য! উপর-উপরি বারোটি মেয়ে অদৃশ্য, অমাবস্যার রাত, অদ্ভুত বাঘের আবির্ভাব আর অন্তর্ধান, তার ওপরে আবার ভুলু-ডাকাতের দল! কারুর সঙ্গে কারুর কোনও সম্পর্ক বোঝা যাচ্ছে না, সমস্তই যেন অস্বাভাবিক কাণ্ড।…এসময়ে বিমল যদি কাছে থাকত! কিন্তু আজ সাত-আট দিন ধরে রামহরিকে নিয়ে সে যে কোথায় ডুব। মেরে আছে, শিবের বাবা বোধহয় তা জানেন না!
একখানা পঞ্জিকা নিয়ে তার ভিতরে চোখ বুলিয়ে কুমার আবার ভাবতে লাগল, হু, পরশু আবার অমাবস্যার রাত আসবে, মানসপুর থেকে হয়তো আবার এক অভাগী নারী অদৃশ্য হবে! আমার যে এখনি সেখানে উড়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে! এমন একটা অ্যাডভেঞ্চার এর সুযোগ তো ছেড়ে দিলে চলবে না, বিমলের কপাল খারাপ তাই নিজের দোষেই এবারে সে ফাঁকে পড়ল, আমি কি করব?..বাঘা, বাঘা!
বাঘা তখন ঘরের এককোণে বসে একপাল মাছির সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ করছিল। মাছিদের ইচ্ছা, বাঘার গায়ের ওপরে তারা মনের আনন্দে খেলা করে বেড়ায়, কিন্তু তার দেহটা যে মাছিদের বেড়াবার জায়গা হবে, এটা ভাবতেও বাঘা রাগে পাগল হয়ে উঠছিল। বড় বড় হাঁ করে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে সে এক-একবারে একাধিক মাছিকে গ্রাস করে ফেলছিল কিন্তু মাছিরাও বিষম নাছোড়বান্দা, প্রাণের মায়া ছেড়ে ভন ভন ভন ভন করতে করতে বাঘার মাথা থেকে ল্যাজের ডগা পর্যন্ত বারবার তারা ছেয়ে ফেলছিল। যে বাঘা আজ জলে-স্থলে-শূন্যমার্গে কত মানব, দানব, ও অদ্ভুত জীবের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে, বিমল ও কুমারের সঙ্গে যার নাম এই বাংলাদেশে বিখ্যাত, তুচ্ছ একদল মক্ষিকার আক্রমণ আজ তাকে যেরকম কাবু করে ফেলেছে তা দেখলে শত্রুরও মায়া হবে! এমনি সময়ে কুমারের ডাক শুনে সে গা ও ল্যাজ ঝাড়তে ঝাড়তে তাড়াতাড়ি তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল।
কুমার বললে, বাঘা বাঘা! বিমলও নেই রামহরিও নেই,–খালি তুমি আর আমি! অমাবস্যার রাত, বাঘের গর্জন, ডাকাতের দল, মানুষের পর মানুষ অদৃশ্য! শুনে কি তোমার ভয় হচ্ছে?
বাঘা কান খাড়া করে মনিবের সব কথা মন দিয়ে শুনলে। কি বুঝলে জানি না, কিন্তু বললে, ঘেউ ঘেউ ঘেউ!
বাঘা, এ বড় যে-সে ব্যাঘ্র নয়, বুঝেচ? এ তোমার চেয়েও চালাক! এ তিথি-নক্ষত্র বিচার করে কাজ করে। এর সঙ্গে আমরা পাল্লা দিতে পারব কি?
ঘেউ ঘেউ ঘেউ!
তার ওপরে আছে ভুলু-ডাকাতের দল। পুলিশও তাদের কাছে হার মেনেছে, খালি তোমাকে আর আমাকে তারা গ্রাহ্য করবে কি?
ঘেউ ঘেউ ঘেউ! বলেই বাঘা টপ করে মুখ ফিরিয়ে ল্যাজের ডগা থেকে একটা মাছিকে ধরে গপ করে গিলে ফেললে!
একখানা খাম ও চিঠির কাগজ বার করে কুমার লিখতে বসল–
ভাই বিমল,
একবার এক জায়গা থেকে দলে-দলে মানুষ অন্তর্হিত হচ্ছিল শুনে সে ব্যাপারটা আমরা দেখতে গিয়েছিলুম। কিন্তু সেই কৌতূহলের ফলে বন্দি হয়ে আমাদের যেতে হয়েছিল পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলগ্রহে।
এবারেও মানসপুরে মানুষের পর মানুষ (কিন্তু কেবল স্ত্রীলোক) অদৃশ্য হচ্ছে। শুনেই আমার চডুকে পিঠ আবার সড় সড় করছে। আমি আর বাঘা তাই ঘটনাস্থলে চললুম। জানি না এবারেও আমাদের আবার পৃথিবী ছাড়তে হবে কিনা!
খবরের কাগজের রিপোর্টও এই খামের ভিতর দিলুম। এটা পড়লেই তুমি বুঝতে পারবে, কেন আমি তোমাদের জন্যে অপেক্ষা করতে পারলুম না। আসছে পরশু অমাবস্যা, আজ যাত্রা না করলে যথাসময়ে মানসপুরে গিয়ে পৌঁছোতে পারব না।
বিমল, তোমার জন্যে আমার দুঃখ হচ্ছে। এবারের অ্যাডভেঞ্চার-এ তুমি বেচারি ফাঁকে পড়ে গেলে। কি আর করবে বলো, যদি প্রাণ নিয়ে ফিরি, আমার মুখে সমস্ত গল্প শুনো তখন। ইতি–
