সকলে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হল। পূর্বাকাশের রংমহলে প্রবেশ করেছে তখন নবীন সূর্য। নদীর জল যেন গলানো সোনার ধারা। নৌকো যথাস্থানেই বাঁধা আছে।
অমৃত-দ্বীপের আরও কত রহস্য অমৃত-দ্বীপের ভেতরেই রেখে তারা খুলে দিলে নৌকার বাঁধন।
অলৌকিক
এক
ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু। নতুন নতুন খাবরের দিকে বরাবরই তাঁর প্রচণ্ড লোভ। আজ বৈকালি চায়ের আসরে পদার্পণ করেই বলে উঠলেন, জয়ন্ত ওবেলা কি বলেছিলে, মনে আছে তো?
জয়ন্ত হেসে বললে, মনে না থাকে, মনে করিয়ে দিন।
নতুন খাবার খাওয়াবে বলেছিলে।
–ও, এই কথা? খাবার তো প্রস্তুত।
খাবারের নাম শুনতে পাই না?
–মাছের প্যাটি আর অ্যাসপ্যারাগাস ওমলেট।
–রেঁধেছে কে?
–আমাদের মধু।
–মধু একটি জিনিয়াস। আনতে বলো, আনতে বলো।
চা পর্ব শেষ হল যথাসময়ে। অনেকগুলো প্যাটি আর ওমলেট উড়িয়ে সুন্দরবাবুর আনন্দ আর ধরে না।
পরিতৃপ্ত ভুঁড়ির ওপরে সস্নেহে হাত বুলোতে বুলোতে তিনি বললেন, মনের মতো পানাহারের মতো সুখ দুনিয়ায় আর কিছু নেই, কি বলো মানিক?
মানিক বললে, কিন্তু অত সুখের ভিতরেও কি একটি ট্রাজেডি নেই?
কীরকম?
–খেলেই খাবার ফুরিয়ে যায়।
–তা যা বলেছ।
–আবার অনেক সময় খাবার ফুরোবার আগে পেটই ভরে যায়।
–হ্যাঁ ভায়া, ওটা আবার খাবার ফুরোনোর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার। খাবার আছে, পেট কিন্তু গ্রহণ করতে নারাজ। অসহনীয় দুঃখ।
ঠিক এমন সময়ে একটি লোক ঘরের ভিতর প্রবেশ করল।
তাকে দেখেই জয়ন্ত বলে উঠল, আরে, আরে হরেন যে। বোসো ভাই, বোসো। সুন্দরবাবু, হরেন হচ্ছে আমার আর মানিকের বাল্যবন্ধু।
মানিক বললে, হরেন, ইনি হচ্ছেন সুন্দরবাবু, বিখ্যাত পুলিশ ইনস্পেকটর আর প্রখ্যাত ঔদারিক।
–হুম, ঔদারিক মানে কি মানিক? শুধোলেন সুন্দরবাবু।
–ঔদারিক, অর্থাৎ উদরপরায়ণ।
–অর্থাৎ পেটুক। বেশ ভাই, বেশ, যা খুশি বলো, তোমার কথায় রাগ করে আজকের এমন খাওয়ার আনন্দটা মাটি করব না।
জয়ন্ত বললে, তারপর হরেন, তুমি কি এখন কলকাতাতেই আছ?
না, কাল এসেছি। আজই দেশে ফিরব। কিন্তু যাবার আগে তোমাদের একটা খবর দিয়ে যেতে চাই।
কীরকম খবর?
–যেরকম খবর তোমরা ভালোবাসো।
–কোনও অসাধারণ ঘটনা।
–তাই।
–তাহলে আমরা শুনতে প্রস্তুত। সম্প্রতি অসাধারণ ঘটনার অভাবে আমরা কিঞ্চিৎ স্রিয়মান হয়ে আছি। ঝাড়ো তোমার খবরের ঝুলি।
.
দুই
হরেন বললে, সুন্দরবাবু, জয়ন্ত আর মানিক আমাদের দেশে গিয়েছে, কিন্তু আপনার কাছে আগে তার কিছু পরিচয় দেওয়া দরকার। আমাদের দেশ হচ্ছে একটি ছোট শহর, কলিকাতা থেকে মাইল ত্রিশ দূরে। সেখানে পনেরো-ষোলো হাজার লোকের বাস। অনেক ডেলিপ্যাসেঞ্জার কলকাতায় চাকরি করতে আসেন, তাদের মধ্যে কয়েকজন বড় অফিসারও আছেন। স্টেশন থেকে শহরের দূরত্ব প্রায় দেড় মাইল। এই পথটা বেশিরভাগ লোকই পায়ে হেঁটে পার হয়, যাদের সঙ্গতি আছে তারা ছ্যাকড়া গাড়ি কি সাইকেল রিকশার সাহায্য নেয়।
মাসখানেক আগে অর্থাৎ গেল মাসের প্রথম দিনে সুরথবাবু আর অবিনাশবাবু সাইকেল রিকশার চড়ে স্টেশন থেকে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। তাঁরা দুজনেই বড় অফিসার, একজন মাহিনা পান হাজার টাকা, আর একজন আটশত টাকা। সেই দিনই তারা মাহিনা পেয়েছিলেন। স্টেশন থেকে মাইলখানেক পথ এগিয়ে এসে একটা জঙ্গলের কাছে তারা দেখতে পেলেন আজব এক মূর্তি। তখন রাত হয়েছে, আকাশে ছিল সামান্য একটু চাঁদের আলো, স্পষ্ট করে কিছুই চোখে পড়ে না। তবু বোঝা গেল, মূর্তিটা অসম্ভব ঢ্যাঙা, মাথায় অন্তত নয় ফুটের কম উঁচু হবে না। প্রথমে তাদের মনে হয়েছিল সেটা কোনও নারীর মূর্তি, কারণ তার দেহের নীচের দিকে ছিল ঘাঘরার মতো কাপড়। কিন্তু তার কাছে গিয়েই বোঝা গেল সে নারী নয়, পুরুষ। ভীষণ কালো মুখখানা সম্পূর্ণ অমানুষিক। তার হাতে ছিল লাঠির বদলে লম্বা একগাছা বাঁশ। পথের ঠিক মাঝখানে একেবারে নিশ্চল হয়ে সে দাঁড়িয়েছিল।
রিকশাখানা কাছে গিয়ে, তাকে পাশ কাটিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই সে বিষম চিৎকার করে ধমকে বলে উঠল, এই উল্লুক, গাড়ি থামা। তার পরেই সে রিভলভার বার করে ঘোড়া টিপে দিলে। দুম করে শব্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রিকশার চালক গাড়ি ফেলে পলায়ন করলে। সুরথবাবু আর অবিনাশবাবুও গাড়ি থেকে নেমে পড়বার উপক্রম করতেই মূর্তিটা তাঁদের দিকে রিভলভার তুলে কর্কশ স্বরে বললে, যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, সঙ্গে যা আছে সব রিকশার ওপরে রেখে এখান থেকে সরে পড়ো।
তারা প্রাণে বাঁচতেই চাইলেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সঙ্গের সমস্ত টাকা, হাতঘড়ি, আংটি এমনকী ফাউন্টেন পেনটি পর্যন্ত সেইখানে ফেলে রেখে তারা তাড়াতাড়ি চম্পট দিলেন। পরে পুলিশ এসে ঘটনাস্থলে রিকশার পাশে কুড়িয়ে পায় কেবল সেই লম্বা বাঁশটাকে।
প্রথম ঘটনার সাতদিন পরে ঘটে দ্বিতীয় ঘটনা। মৃণালবাবু আমাদের দেশের লোক। মেয়ের বিয়ের জন্যে তিনি কলকাতায় গহনা গড়াতে গিয়েছিলেন। ঘটনার দিন সন্ধ্যার সময়ে ট্রেন থেকে নেমে পাঁচ হাজার টাকার গহনা নিয়ে পদব্রজেই আসছিলেন। তিনিও একটা জঙ্গলের পাশে সেই সুদীর্ঘ ভয়াবহ মূর্তিটিকে অস্পষ্টভাবে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন। সেদিন কতকটা স্পষ্ট চাঁদের আলো ছিল বটে কিন্তু জঙ্গলের ছায়া ঘেঁষে মূর্তিটা এমনভাবে দাঁড়িয়েছিল যে ভালো করে কিছুই দেখবার যো ছিল না। সেদিনও মুর্তিটা রিভলভার ছুঁড়ে ভয় দেখিয়ে মৃণালবাবুর গহনাগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে তাড়িয়ে দেয়। সেবারেও পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে পাওয়া যায় কেবল একগাছা লম্বা বাঁশ।
