কুমার শিউরে উঠে ব্যাগটা টিপেটুপে অনুভব করে দেখলে, লাউ-জুর মূর্তিটা যথাস্থানে আছে কি না!
তারপর এগিয়ে ধারে গিয়ে তারা দেখলে, দ্বীপ তখন ছুটে চলেছে রীতিমতো বেগে এবং তটের তলায় উচ্ছল স্রোত ডাকছে কলকল করে! নদীর আকার তখন চওড়া হয়ে উঠেছে এবং খণ্ডদ্বীপের দুই দিকে দুই তীর সরে গেছে অনেক দূরে।
জয়ন্ত আবার বললে, এখন উপায় কি বিমলবাবু, কী আমরা করব?
বিমল বললে, এখানে জল-স্থল দুই-ই বিপদজনক। বাকি আছে শূন্যপথ, কিন্তু আমাদের ডানা নেই!
কুমার বললে, নদীর সঙ্গে আমরা যাচ্ছি সমুদ্রের দিকে। হয়তো অমৃত-দ্বীপের বাসিন্দারা আমাদের মতো অনাহুত অতিথিদের বাহির-সমুদ্রে তাড়িয়ে দিতে চায়।
জয়ন্ত আশান্বিত হয়ে বললে, তাহলে তো সেটা হবে আমাদের পক্ষে শাপে বর! নদীর মুখেই আছে আমাদের জাহাজ!
বিমল বললে, কিন্তু জাহাজ শুদ্ধ লোক আমাদের এই অতুলনীয় দ্বীপ-নৌকা দেখে কি মনে করবে, সেটা ভেবে এখন থেকেই আমার হাসি পাচ্ছে!
কিন্তু বিমলের মুখে হাসির আভাস ফোটবার আগেই হাসি ফুটল আর এক নতুন কণ্ঠে। দস্তুরমত কৌতুক-হাসি!
সকলে চমকে পেছন ফিরে অবাক হয়ে দেখলে, একটু তফাতে বনের সামনে গাছতলায় বসে আছে আবার এক অমানুষিক মুর্তি! কিন্তু এবারে তার মুখ আর ভাবহীন নয়, কৌতুক হাস্যে সমুজ্জ্বল।
জয়ন্ত বললে, এ-মূর্তি আবার কোথা থেকে এল?
বিমল বললে, যেখান থেকেই আসুক, এর চোখে-মুখে বিভীষিকার চিহ্ন নেই, এ হয়তো আমাদের ভয় দেখাতে আসেনি।
মূর্তি পরিষ্কার ইংরেজি ভাষায় বললে, কে তোমরা? পরেছ ইংরেজি পোশাক, কিন্তু দেখছি তোমরা ইংরেজ নও!
বিমল দুই পা এগিয়ে বললে, তুমি যেমন চিনা হয়েও ইংরেজি বলছ, আমরাও তেমনি ইংরেজি পোশাক পরেও জাতে ভারতীয়!
–ঋষি বুদ্ধদেবের দেশ থেকে তোমরা প্রভু লাউ-জুর দেশে এসেছ কেন? তোমরা কি জানো না, এ-দেশ হচ্ছে পৃথিবীর স্বর্গ, এখানে বাস করে আমার মতন অমরেরা জলে স্থলে-শূন্যে যাদের অবাধ গতি? এখানে নশ্বর মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ!
বিমল হেসে বললে, অমর হওয়ার জন্যে আমার মনে একটুও লোভ নেই!
মূর্তি উপেক্ষার হাসি হেসে বললে, মুখ! আমাদের দেহের মর্যাদা তোমরা বুঝবে না! দেহ তো একটা তুচ্ছ খোলস মাত্র, মানুষ বলতে আসলে বোঝায় মানুষের মনকে। আমাদের দেহ নামে মাত্র আছে, কিন্তু আমরা করি কেবল মনের সাধনা, আমাদের আড়ষ্ট দেহে কর্মশীল কেবল আমাদের মন। কিন্তু থাক ওসব কথা। কে তোমরা? কেন এখানে এসেছ? সিয়েন হতে?
না। তোমাদের দেখবার পর আর অমর হওয়ার সাধ নেই। আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি।
বেড়াতে! এটা নশ্বর মানুষের বেড়াবার জায়গা নয়! জানো, তোমাদের মতো আরও কত কৌতূহলী এখানে বেড়াতে এসে মারা পড়েছে আমাদের হাতে?
সেটা তোমাদের অভ্যর্থনার পদ্ধতি দেখেই বুঝতে পেরেছি। কেবল আমাদের মারতে পারোনি, কারণ, সে শক্তি তোমাদের নেই!
মূর্খ! তোমাদের বধ করতে পারি এই মুহূর্তেই! কেবল প্রভু লাউ-জুর পবিত্র মূর্তি তোমাদের সঙ্গে আছে বলেই এখনও তোমরা বেঁচে আছ। ও-মূর্তি কোথায় পেলে?
সে খবর তোমাকে দেব না।
তোমরা কি তাও-ধর্মে দীক্ষা নিয়েছ?
না। আমরা হিন্দু। তবে সাধক বলে লাউ-জুকে আমরা শ্রদ্ধা করি।
কেবল মুখের শ্রদ্ধা ব্যর্থ, তোমাদের মন অপবিত্র। প্রভু লাউ-জুর মূর্তির মহিমায় তোমাদের প্রাণরক্ষা হল বটে, কিন্তু এখানে আর তোমাদের ঠাঁই নেই। শীঘ্র চলে যাও এখান থেকে!
খুব লম্বা হুকুম তো দিলে, এই জ্যান্ত মড়ার মুল্লুক থেকে চলেও তো যেতে চাই, কিন্তু যাই কেমন করে?
কেন?
আগে ছিলুম মাঠে। তারপর মাঠ হল জলে-ঘেরা দ্বীপ। তারপর দ্বীপ হল আশ্চর্য এক নৌকো। খুব মজার ম্যাজিক দেখিয়ে আরব্য উপন্যাসকেও তো লজ্জা দিলে বাবা, এখন দয়া করে দ্বীপনৌকোকে আবার স্থলের সঙ্গে জুড়ে দাও দেখি, আমরাও ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাই।
তোমার সুবুদ্ধি দেখে খুশি হলুম। দ্বীপের পূর্বদিকে চেয়ে দ্যাখো।
সকলে বিপুল বিস্ময়ে ফিরে দেখলে, ইতিমধ্যে কখন যে দ্বীপের পূর্ব-প্রান্ত আবার মাঠের সঙ্গে জুড়ে এক হয়ে গেছে তারা কেউ জানতেও পারেনি! স্থির মাটি, পায়ের তলায় আর টলমল করছে না।
এতক্ষণ পরে বিমল শ্রদ্ধাপূর্ণস্বরে বললে, তোমাকে শতশত ধন্যবাদ!
এখান থেকে সোজা পশ্চিম দিকে গেলেই দেখবে, নদীর ধারে তোমাদের নৌকো বাঁধা আছে। যাও!
পরমুহূর্তেই আর-এক অদ্ভুত দৃশ্য! সেই উপবিষ্ট মূর্তি আচম্বিতে বিনা অবলম্বনেই শূন্যে ঊধ্বদিকে উঠল এবং তারপর ধনুক থেকে ছোঁড়া তিরের মতন বেগে বনের ওপর দিয়ে কোথায় চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল!
কুমার হতভম্ভের মতন বললে, এ কি দেখলুম বিমল, এ কি দেখলুম!
বিমল বললে, আমি কিন্তু এই শেষ ম্যাজিকটা দেখে আশ্চর্য বলে মনে করছি না!
জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, তাহলে আপনার কাছে আশ্চর্য বলে কোনও কিছুই নেই!
জয়ন্তবাবু, আপনি কি সেই অদ্ভুত ইংরেজের কথা শোনেননি টলষ্টয়, থ্যাকারের সঙ্গে আরও অনেক বিশ্ববিখ্যাত লোক স্বচক্ষে দেখে যার বর্ণনা করে গেছেন? তিনি সাধকও নন, যাদুকরও নন, আমাদেরই মতন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার দেহ শুন্যে উঠে এক জানলা দিয়ে। শূন্যপথেই আবার ঘরের ভেতরে ফিরে আসত!
দোহাই মশাই, দোহাই! আর নতুন-নতুন দৃষ্টান্ত দিয়ে অসম্ভবের স্বাভাবিক ব্যাখ্যা করবেন! আপনাদের অ্যাডভেঞ্চার আমার ধারণার বাইরে। এখানকার মাটিতে আর পাঁচ মিনিট দাঁড়ালেও আমার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে! মাঠ আবার দ্বীপ হওয়ার আগেই ছুটে চলুন নৌকোর খোঁজে।
