বিমল সব দিকে চোখ বুলিয়ে বললে, আর বোধ হয় ওরা আমাদের ভয় দেখাতে আসবে না! চলল কুমার, আমরা ওই বনের দিকে যাই। খুব সম্ভব, ওই বনের পরেই পাব নদী।
তারা বন লক্ষ করে অগ্রসর হল এবং চলতে-চলতে বারবার শুনতে লাগল, সেই অজানা অতিকায় জানোয়ারটা তখনও আকাশ কাঁপিয়ে দারুণ ক্রোধে চিৎকার করছে ক্রমাগত!
প্রায় সিকি মাইল পথ চলবার পর বনের কাছে এসে তারা শুনতে পেলে, গাছে গাছে জেগে উঠে ভোরের পাখিরা গাইছে নতুন উষার প্রথম জয়গীতি। আঁধার তখন নিঃশেষে পালিয়ে গেছে কোথায় কোন দুঃস্বপ্নলোকের অন্তঃপুরে।
দানবের চিৎকারও থেমে গেল। হয়তো সেও ফিরে গেল হতাশ হয়ে তার পাতালপুরে। হয়তো রাত্রির জীব সে, সূর্যালোক তার চোখের বালি।
বাতাসও এতক্ষণ ছিল যেন শ্বাসরোধ করে, এখন ফিরে এল নিয়ে তার স্নিগ্ধ স্পর্শ, বনে-বনে সবুজ গাছের পাতায়-পাতায় জাগল নির্ভীক আনন্দের বিচিত্র শিহরন!
জয়ন্ত বললে, এই তো আমার চির-পরিচিত প্রিয় পৃথিবী! জানি এর আলো-ছায়ার মিলন-লীলাকে, এর শব্দ-গন্ধ-স্পর্শের মাধুর্যকে, এর ফুল ফোঁটানো শ্যামলতাকে, আমি বাঁচতে চাই এদেরই মাঝখানে! কালকের মতো যুক্তিহীন আজগুবি রাত আর আমার জীবনে কখনও যেন না আসে! এ-রাতের কাহিনি কারুর কাছে মুখ ফুটে বললেও সে আমাকে পাগল বলে মনে করবে!
ঠিক সেই সময়ে কী এক অভাবনীয় ভাবে সকলের মন অভিভূত হয়ে গেল।
প্রথমটা সবিস্ময়ে কারণ বোঝবার চেষ্টা করেও কেউ কিছুই বুঝতে পারলে না।
তার পরেই কুমার বললে, একি বিমল, একি! ভূমিকম্প, হচ্ছে নাকি?
চারিদিকে একবার চেয়ে বিমল বললে, এ তো ঠিক ভূমিকম্পের মতন মনে হচ্ছে না কুমার! মনে হচ্ছে, আমরা আছি টলমলে জলে নৌকার ওপরে! একি আশ্চর্য!
জয়ন্ত বললে, দেখুন দেখুন, ওইদিকে তাকিয়ে দেখুন! যে মাঠ দিয়ে আমরা এসেছি, সেখানে হঠাৎ এক নদীর সৃষ্টি হয়েছে! আঁঃ এও কি সম্ভব?
বিপরীত দিকে তাকিয়ে কুমার বললে, ওদিকেও যে ওই ব্যাপার! আমরা যে জমির ওপরে দাঁড়িয়ে আছি তার দুই দিকেই নদীর আবির্ভাব হয়েছে!
দুই হাতে চোখ কচলে চমৎকৃত কণ্ঠে বিমল বললে, এ তো দৃষ্টি বিভ্রম নয়! কুমার, আমাদের সামনের দিকেও খানিক তফাতে চেয়ে দেখ। ওখানেও জল! পেছনদিকে বন ভেদ করে চোখ চলছে না, খুব সম্ভব ওদিকেও আছে জল! কারণ এটা বেশ বুঝতে পারছি যে, আমরা আছি এখন দ্বীপের মতন একটা জমির ওপরে, আর এই দ্বীপটা ভেসে যাচ্ছে ঠিক নৌকোর মতোই! না, এইবারে আমি হার মানলুম! দ্বীপ হল নৌকো! না এটাকে বলব ভাসন্ত। দ্বীপ?
সত্য! জলের ওপারে প্রান্তরের বনজঙ্গল দেখতে-দেখতে পেছনে সরে যাচ্ছে–যেমন সরে যেতে দেখা যায় রেলগাড়ির ভেতরে বা নৌকো-জাহাজের ওপরে গিয়ে বসলে! গঙা সাঁতার কাটছে জলে!
বিমল অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, জয়ন্তবাবু আপনি হ্যাঁমার্টনের ইউনিভার্সাল হিস্ট্রি অফ দি ওয়ার্ল্ড পড়েছেন?
রেখে দিন মশাই, হিস্ট্রি-ফিস্ট্রি! আমার মাথা এমন বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে! নিজেকে আর জয়ন্ত বলেই মনে হচ্ছে না!
শুনুন। ওই হিস্ট্রির ষষ্ঠ খণ্ডে ৩৫২২ পৃষ্ঠায় একখানি ছবি দেখবেন। চার-পাঁচ শ বছর আগে চিনদেশে সিং-রাজবংশের সময়ে একজন চিনা পটুয়া অমৃত-দ্বীপের যে চিত্র এঁকেছিলেন, ওখানি হচ্ছে তারই প্রতিলিপি। তাতে দেখা যায়, জনকয় তাও-ধর্মাবলম্বী লোক একটি ভাসন্ত দ্বীপে বসে পানভোজন আমোদ-আহ্বাদ করছে, আর একটি মেয়ে হাল ধরে দ্বীপটিকে করছে নির্দিষ্ট পথে চালনা!
আরে মশাই, কবি আর চিত্রকররা উদ্ভট কল্পনায় যা দেখে, তাই কি আমাদেরও বিশ্বাস। করতে হবে?
জয়ন্তবাবু, সময়-বিশেষে কল্পনাও যে হয় সত্যের মতো, আর সত্যও হয় কল্পনায় মতো, আজ স্বচক্ষেও তা দেখে আপনি তাকে স্বীকার করবেন না।
পাগলের কাছে সবই সত্য হতে পারে। আমাদের সকলেরই মাথা হঠাৎ বিগড়ে গেছে।
না জয়ন্তবাবু, শিশুরও কাছে সবই সত্য হতে পারে। এই লক্ষ-কোটি বৎসরের অতি বৃদ্ধ পৃথিবীর কোলে ক্ষুদ্র মানুষ হচ্ছে শিশুর চেয়ে শিশু। সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরেও যে অসাধারণ প্রাকৃতিক নিয়ম থাকতে পারে, ভালো করে তা জানতে পারবার আগেই ক্ষণজীবী মানুষের মৃত্যু হয়। আজ লোহা জলে ভাসে, ধাতু আকাশে ওড়ে, বন্দি বিদ্যুৎ গোলামি করে, শূন্য দিয়ে সাত সাগর পেরিয়ে বেতারে মানুষের চেহারা আর কণ্ঠস্বর ছোটাছুটি করে, ছবি জ্যান্ত হয়ে কথা কয়, রসায়নাগারে নূতন জীবের সৃষ্টি হয়, কিছুকাল আগেও এসব ছিল সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের বাইরে, আজগুবি কল্পনার মতো। তবু আমরা কতটুকুই বা দেখতে কি জানতে পেরেছি? পৃথিবীতে যা-কিছু আমরা দেখিনি-শুনিনি তাহাই অসম্ভব না হতেও পারে!
আপনার বক্তৃতাটি যে খুবই শিক্ষাপ্রদ, তা আমি অস্বীকার করছি না। কিন্তু আপাতত বক্তৃতা শোনবার আগ্রহ আমার নেই। এখন আমরা কি করব সেইটেই ভাবা উচিত, এ-দ্বীপ আমাদের নিয়ে জলপথে হয়তো নিরুদ্দেশ যাত্রা করতে চায়, এখন আমাদের কি করা উচিত?
কুমার বললে, আমাদের উচিত, জলে ঝাঁপ দেওয়া।
জয়ন্ত বললে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে যদি তরল জল আবার কঠিন মৃত্তিকায় পরিণত হয়, তাহলেও আমি আর অবাক হব না!
বিমল বললে, কিংবা জলের ভেতরে আবার দেখা দিতে পারে দলে-দলে জ্যান্ত মড়া!
