কুমার শ্রান্তের মতন কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বললে, উঃ, দানবটা আর এক মিনিট আগে আমাদের দেখতে পেলে আর আমরা বাঁচতুম না!
বিমল গম্ভীর স্বরে বললে, এখনও আমাদের বাঁচবার সম্ভাবনা নেই কুমার! ডাইনে বাঁয়ে সামনের দিকে চেয়ে দ্যাখো!
সর্বনাশ! আবার সেই অপার্থিব দৃশ্য! তারা দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তরের মতন একটা স্থানে এবং সেই প্রান্তরের যেদিকে তাকানো যায় সেই দিকেই চোখে পড়ে, কলে-চলা পুতুলের মতন দলে-দলে মানুষ-মূর্তি অর্ধচন্দ্রাকারে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে! নীরব, নিঃশব্দ, নিষ্ঠুর সব মূর্তি।
পেছনে প্রাচীর এবং সামনে ও দুই পাশে রয়েছে এই অমানুষিক মানুষের দল। এবারে আর পালাবার কোনও পথই খোলা নেই।
জয়ন্ত অবসন্নের মতো বসে পড়ে বললে, আর কোনও চেষ্টা করা বৃথা।
.
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ । দ্বীপের নিরুদ্দেশ যাত্রা
সেই ভয়ানক অর্ধচন্দ্র ব্যুহ এমনভাবে তিন দিক আগলে এগিয়ে আসছে যে, মুক্তিলাভের কোনও পথই আর ভোলা রইল না।
ব্যুহ যারা গঠন করেছে তাদের দিকে তাকালেও বুক করতে থাকে ছাঁৎ-ছাঁৎ! তারা মানুষ, না অমানুষ? তারা যখন মাটির ওপরে পদ সঞ্চালন করে অগ্রসর হচ্ছে তখন তাদের জ্যান্ত মানুষ বলেই না মেনে উপায় নেই, কিন্তু দেখলে মনে হয়, যেন দলে-দলে কবরের মড়া হঠাৎ কোনও মোহিনী মন্ত্রে পদচালনা করবার শক্তি অর্জন করেছে! এবং এবারেও সবাই লক্ষ করলে যে, কেবল দুই পা ছাড়া তাদের প্রত্যেকেরই অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিক যেন মৃত্যু আড়ষ্ট হয়ে আছে!
অর্ধচন্দ্র-ব্যুহের দুই প্রান্ত বিমলদের পেছনকার প্রাচীরের দুই দিকে সংলগ্ন হল, মাঝে থাকল একটুখানি মাত্র ফাঁক, যেখানে অবাক ও অভিভূত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তারা তিনজনে।
এদের উদ্দেশ্য কি? এরা তাদের বন্দি করতে, না বধ করতে চায়? ওদের মুখ দেখে কিছু বোঝা অসম্ভব, কারণ মড়ার মুখের মতন কোনও মুখই কোনও ভাব প্রকাশ করছে না– কেবল তাদের অপলক চোখে চোখে জ্বলছে যেন নিষ্কম্প অগ্নিশিখা, যা দেখলে হয় হৃৎকম্প।
কুমার মরিয়ার মতন চিৎকার করে বললে, কপালে যা আছে বুঝতেই পারছি, আমি কিন্তু পোকার মতন ওদের পায়ের তলায় পড়ে প্রাণ দিতে রাজি নই–যতক্ষণ শক্তি আছে বিমল, বন্দুক ছোড়ো, বন্দুক ছোড়!
সঙ্গে-সঙ্গে শত-শত কণ্ঠে আবার জাগল অট্টহাস্যর-পর-অট্টহাস্যের উচ্ছ্বাস!
সঙ্গে-সঙ্গে প্রাচীরের ওপার থেকেও ভীষণ হুঙ্কার করে সাড়া দিতে লাগল সেই শিকার বঞ্চিত হতাশ দানব জন্তুটা!
সেই সমান-ভয়াবহ হাস্য ও গর্জনের প্রচণ্ডতায় চতুর্দিক হয়ে উঠল যেন বিষাক্ত!
ও-দানবটা যেন চাঁচাচ্ছে পেটের জ্বালায় অস্থির হয়ে, কিন্তু এই মূর্তিমান প্রেতগুলো এত হাসে কেন?
বিমল বললে, জাহাজের সঙ্গে-সঙ্গে সমুদ্রে যে মূর্তিটা ভেসে আসছিল, তাকেও দেখতে ঠিক এদেরই মতো। সে-ও হয়তো এই দলেই আছে।
কুমার তখন তার বন্দুক তুলেছিল। কিন্তু হঠাৎ কি ভেবে বন্দুক নামিয়ে বললে, বিমল, বিমল, একটা কথা মনে হচ্ছে!
কি কথা?
লাউ-ৎজুর মূর্তিটা আমার সঙ্গেই আছে। জান তো, তাও সাধুরা বলে সে মূর্তি মন্ত্রপূত আর তাকে সঙ্গে না আনলে এ-দ্বীপে আসা যায় না?
বিমল কতকটা আশ্বস্ত স্বরে বললে, ঠিক বলেছ কুমার, এতক্ষণ ওকথা আমি ভুলেই গিয়েছিলুম! ওই মূর্তির লোভেই কলকাতায় মানুষের-পর-মানুষ খুন হয়েছে। তার এত মহিমা কীসের, এইবারে হয়তো বুঝতে পারা যাবে! বার করো তো একবার মূর্তিটাকে, দেখি সেটা দেখে এই ভূতগুলো কি করে?
কুমার তাড়াতাড়ি ব্যাগের ভেতর থেকে জেডপাথরে গড়া, রামছাগলে চড়া সাধক লাউ-জুর সেই অর্ধর্তপ্ত অর্ধ-শীতল মূর্তিটা বার করে ফেললে এবং ডানহাতে করে এমনভাবে তাকে মাথার ওপরে তুলে ধরলে যে, সকলেই তাকে স্পষ্ট দেখতে পেলে।
ফল হল কল্পনাতীত!
মুহূর্তের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেল অট্টহাস্য এবং আচম্বিতে যেন কোন অদৃশ্য বৈদ্যুতিক শক্তির ধাক্কা খেয়ে সেই শত-শত আড়ষ্টমূর্তি অত্যন্ত তাড়াতাড়ি পিছিয়ে যেতে-যেতে ছত্রভঙ্গ হয়ে নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল!
জয়ন্ত, বিমল ও কুমার–তিনজনেই অত্যন্ত বিস্মিতের মতো একবার এ-ওর মুখের দিকে এবং একবার সেই পশ্চাৎপদ বীভৎস মূর্তিগুলোর দিকে ফিরে-ফিরে তাকাতে লাগল বারংবার!
অবশেষে হাঁপ ছেড়ে জয়ন্ত বললে, এতটুকু মূর্তির এত বড় গুণ, একথা যে বিশ্বাস করতেও প্রবৃত্তি হচ্ছে না!
বিমল বললে, এতক্ষণে বোঝা গেল, এই দ্বীপে ওই পবিত্র মুর্তিই হবে আমাদের রক্ষাকবচের মতো। ওকে সঙ্গে করে এখন আমরা যেখানে খুশি যেতে পারি।
জয়ন্ত বললে, না বিমলবাবু, না! এই সৃষ্টিছাড়া দ্বীপ আমাদের মতন মানুষের জন্যে তৈরি হয়নি। এখানে পদে-পদে যত সব অস্বাভাবিক বিপদ আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, এরপর হয়তো লাউ-জুর মুর্তিও আর আমাদের বাঁচাতে পারবে না। আমি চাই নদীর ধারে যেতে, যেখানে বাঁধা আছে আমাদের নৌকা!
কুমার বললে, আপাতত আমিও জয়ন্তবাবুর কথায় সায় দি। আবার যদি এখানে আসি, দলে ভারী হয়েই আসব। কিন্তু নদী কোন দিকে?
বিমল বললে, নিশ্চয়ই পশ্চিম দিকে! ওই দ্যাখো, চাঁদের আলো নিবে আসছে, পূর্বের আকাশ ফরসা হচ্ছে!
যেন সমুজ্জ্বল স্বপ্নের মতো স্নিগ্ধতার মধ্যে দেখা গেল, প্রান্তরের মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে আছে তালজাতীয় তরুকুঞ্জ ও ছোট-ছোট বন। এতক্ষণ যারা এসে এখানে বিভীষিকা সৃষ্টি করছিল সেই অপার্থিব মূর্তিগুলো এখন অদৃশ্য হয়েছে চোখের আড়ালে, কোথায়!
