জয়ন্ত পায়ে-পায়ে এগুলো। কিছুই বুঝতে না পেরে বিমল ও কুমারও চলল তার পেছনে পেছনে।
প্রাচীরের পূর্ব-উত্তর কোণে গিয়ে দাঁড়িয়ে জয়ন্ত বললে, এইবারে দড়ি আর হুক আর হাতুড়ি নিয়ে আমি উঠব পাঁচিলের ওপরে। তারপর টঙে গিয়ে দুখানা পাথরের জোড়ের মুখে হুক বসিয়ে তার সঙ্গে দড়ি বেঁধে নীচে ঝুলিয়ে দেব। তারপর আপনারা দুজনেও একে একে দড়ি ধরে ওপরে গিয়ে উঠবেন। তারপর সেই দড়ি বেয়েই পাঁচিলের ওপারে পৃথিবীর মাটিতে অবতীর্ণ হতে বেশিক্ষণ লাগবে না।
বিমল খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, বাঃ, সবই তো জলের মতন বেশ বোঝা গেল! কিন্তু জয়ন্তবাবু, প্রথমেই বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? অর্থাৎ পাঁচিলের টঙে গিয়ে চড়বে কে? আপনি, না আমি, না কুমার? দুঃখের বিষয় আমরা কেউই টিকটিকির মূর্তিধারণ করতে পারি না!
জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, আমি ঠাট্টা বা আকাশকুসুম চয়ন করছি না। কিছুকাল আগে নিউইয়র্ক টাইমসে আমি কারাগার থেকে পলায়নের এক আশ্চর্য খবর পড়েছিলুম। কাল্পনিক নয়, সম্পূর্ণ সত্যকাহিনি। আমেরিকার এক নামজাদা খুনে ডাকাতকে সেখানকার সবচেয়ে সুরক্ষিত জেলখানায় বন্দি করে রাখা হয়। সে-জেল ভেঙে কোনও বন্দি কখনও পালাতে পারেনি, তার চারিদিকে ছিল অত্যন্ত উঁচু পাঁচিল। কিন্তু ওই ডাকাতটা এক অদ্ভুত উপায়ে সেই পাঁচিলও পার হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। উপায়টা যে কি, মুখে বললে আপনারা তা অসম্ভব বলে মনে করবেন–আর খবরটা প্রথমে পড়ে আমিও অসম্ভব বলেই ভেবেছিলুম। কিন্তু কিছুদিন ধরে অভ্যাস করবার পর আমিও দেখলুম, উপায়টা দুঃসাধ্য হলেও অসাধ্য নয়। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে এ উপায়টা চিরদিনই অসম্ভব হয়ে থাকবে বটে, কারণ এ উপায় যে অবলম্বন করবে তার পক্ষে দরকার কেবল হাত-পায়ের কৌশল নয়–অসাধারণ দেহের শক্তিও।
বিমল কৌতূহলে প্রদীপ্ত হয়ে বললে, জয়ন্তবাবু, শিগগির বলুন, সে উপায়টা কি?
জয়ন্ত বললে, উপায়টা এমন ধারণাতীত যে মুখে বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন না। তার চেয়ে এই দেখুন, আপনাদের চোখের সমুখে আমি নিজেই সেই উপায়টা অবলম্বন করছিবলেই সে দুই দিকের প্রাচীর যেখানে মিলেছে সেই কোণে গিয়ে দাঁড়াল।
তারপর বিমল ও কুমার যে অবাক করা ব্যাপারটা দেখলে কোনওদিনই সেটা তারা সম্ভবপর বলে মনে করেনি! জয়ন্ত কোণে গিয়ে দুই দিকের প্রাচীরে দুই হাত ও দুই পা রেখে কেবল হাত ও পায়ের ওপরে প্রবল চাপ দিয়ে ওপরদিকে উঠে যেতে লাগল, প্রায় অনায়াসেই! বিপুল বিস্ময়ে নির্বাক ও রুদ্ধশ্বাস হয়ে তারা বিস্ফারিত চোখে ওপর-পানে তাকিয়ে রইল।
জয়ন্ত যখন প্রাচীরের ওপর পর্যন্ত পৌঁছল, বিমল উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তারিফ করে বললে, সাধু জয়ন্তবাবু, সাধু! আপনি আজ সত্য করে তুললেন ধারণাতীত স্বপ্নকে!
ঠিক সেই সময়েই জাগল আবার চারিদিক কাঁপয়ে ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে কোন অজ্ঞাত দানবের বিভীষণ হুহুঙ্কার। সে যেন সমস্ত জীবজগতের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিবাদ–সে যেন বিরাট বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা!
জয়ন্ত তখন প্রাচীরের ওপরে উঠে বসে হাঁপ নিচ্ছে, কিন্তু এমন ভয়ানক সেই চিৎকার যে, চমকে উঠে সে আর একটু হলেই টলে নীচে পড়ে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি দুই হাতে প্রাচীর চেপে ধরে সরোবরের দিকে সভয়ে তাকিয়ে দেখলে।…হা, বিমলের অনুমানই ঠিক। একটু আগে যারা আজগুবি হাসি হাসছিল তারা দেখা দেয়নি বটে, কিন্তু এখন যে হুঙ্কারের-পর-হুঁঙ্কার ছাড়ছে সে আর অদৃশ্য হয়ে নেই!
চাঁদ তখন পশ্চিম আকাশে। এবং পশ্চিম দিকের উঁচু প্রাচীরের কালো ছায়া এসে পড়ে সরোবরের আধাআধি অংশ করে তুলেছে অন্ধকারময়। এবং সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে অন্ধকারেরই একটা জীবন্ত অংশের মতো কী যে সে কিম্ভুতকিমাকার বিপুল মূর্তির খানিকটা আত্মপ্রকাশ করেছে, দূর হতে স্পষ্ট করে তা বোঝা গেল না। কিন্তু তার প্রকাণ্ড দেহটা সরোবরের জ্যোৎস্না-উজ্জ্বল অংশের ওপরে ক্রমেই আরও প্রকাণ্ড হয়ে উঠতে লাগল! তবে কি সে তাদের দেখতে পেয়েছে? সে কি এগিয়ে আসছে জল ছেড়ে ডাঙায় ওঠবার জন্যে?
জয়ন্ত অত্যন্ত ব্যস্তভাবে প্রাচীরের পাথরের ফাঁকে হুক বসিয়ে ঠকঠক হাতুড়ির ঘা মারতে লাগল।
নীচে থেকে বিমল অধীর স্বরে চিৎকার করে বললে, ও আমাদের দেখতে পেয়েছে– ও আমাদের দেখতে পেয়েছে! জয়ন্তবাবু, দড়ি–দড়ি!
কুমার ফিরে সচকিত চোখে দেখলে, প্রায় আশি ফুট লম্বা ও পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ ফুট উঁচু একটা বিরাট কালি কালো দেহ মূর্তিমান দুঃস্বপ্নের মতো সরোবরের তীরে বসে সশব্দে প্রচণ্ড গা-ঝাড়া দিচ্ছে!
ওপর থেকে ঝপাং করে একগাছা দড়ি নীচে এসে পড়ল।
কুমার এস্ত স্বরে বললে, লাউ-জুর ভক্তরা কি একেই ড্রাগন বলে ডাকে?
বিমল দড়ি চেপে ধরে বলল, চুলোয় যাক নাউজুর ভক্তরা! এখন নিজের প্রাণ বাঁচাও। তাড়াতাড়ি আমার সঙ্গেই দড়ি ধরে ওপরে উঠে এসো।
—– —-
তারা একে-একে প্রাচীরের ওপারে মাটির ওপরে গিয়ে নেমে আড়ষ্টভাবে শুনলে, ওধার থেকে ঘনঘন জাগছে মহাব্রুদ্ধ দানবের হতাশ হুহুঙ্কার! সে নিশ্চয়ই চারিদিকে মুখের গ্রাস খুঁজে বেড়াচ্ছে, কেন না তার বিপুল দেহের বিষম দাপাদাপির চোটে প্রাচীরের এ-পাশের মাটিও কেঁপে উঠছে থরথর করে।
