জয়ন্ত বললে, এর মানে কি? একটা মাঠকে এমন উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে কেন?
বিমল অল্পক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, অনেকদিন আগে আমরা গিয়েছিলুম চম্পাদ্বীপে। কুমার, আজকের এই গর্জন শুনে কি সেখানকার কোনও-কোনও জীবের কথা মনে পড়ে না?
কুমার বললে, এরা কি এখানে আমাদের বন্দি করে রাখতে চায়?
যেন তার জিজ্ঞাসার উত্তরেই তাদের পিছনকার দরজার পাল্লা দু-খানা বন্ধ হয়ে গেল। সশব্দে।
বিমল দৌড়ে গিয়ে দরজা ধরে টানাটানি করে বললে, হা কুমার, অমৃত-দ্বীপে এসে। আমাদের ভাগ্যে উঠবে বোধহয় নিছক গরলই। এ দরজা এমন মজবুত যে মত্ত হস্তিও এর কিছুই করতে পারবে না! এতক্ষণ লক্ষ করে দেখিনি, কিন্তু এ হচ্ছে পুরু লোহার দরজা; আর এই পাঁচিল হচ্ছে পাথরের। এই দরজা আর পাঁচিল ভাঙতে হলে কামানের দরকার!
অকস্মাৎ চারিদিকের নিস্তব্ধতা খণ্ডখণ্ড হয়ে গেল ভয়াবহ গর্জনের-পর-গর্জনে! সে যে কি বিকট, কি বীভৎস, কি ভৈরব হুঙ্কার, ভাষায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব। পৃথিবীর মাটি, আকাশের চাঁদ-তারা, নিশীথ-রাতের বুক সে হুঙ্কার শুনে যেন কেঁপে কেঁপে-কেঁপে উঠল! যেন বিশ্বগ্রাসী ক্ষুধায় ছটফট করতে করতে বহু দিনের উপবাসী কোন অতিকায় দানব হিংস্র, বিষাক্ত চিৎকারের-পর-চিৎকার করে হঠাৎ আবার স্তব্ধ হয়ে পড়ল!
বিমল, কুমার ও জয়ন্ত খানিকক্ষণ স্তম্ভিত ও বোবার মতন দাঁড়িয়ে রইল।
সর্বপ্রথমে কথা কইলে জয়ন্ত; কম্পিতস্বরে সে বললে, এ কোন জীবের গর্জন বিমলবাবু? চল্লিশ-পঞ্চাশটা সিংহও যে একসঙ্গে এত জোরে গর্জন করতে পারে না! এ-রকম ভয়ানক গর্জন করবার শক্তি কি পৃথিবীর কোনও জীবের আছে?
কুমার বললে, মনে-মনে আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম!
বিমল বললে, কিন্তু আন্দাজ করতে পারছ কি এ জীবটা কোত্থেকে গর্জন করছে? মনে হচ্ছে যেন সে আছে আমাদের খুব কাছেই। অথচ এই পাঁচিল ঘেরা জায়গাটার মধ্যে চাঁদের আলোর কোনও জীবের ছায়া পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না!
জয়ন্ত বললে, কিন্তু পূর্বদিকে খানিক দূরে তাকিয়ে দেখুন। ওখানে চাঁদের আলোর জলের মতন কি চকচক করছে না?
বিমল খানিকক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে থেকে বললে, হ্যাঁ জয়ন্তবাবু, ওখানে একটা জলাশয়ের মতন কিছু আছে বলেই মনে হচ্ছে!
কুমার বললে, একটু এগিয়ে দেখব নাকি?
বিমল খপ করে কুমারের হাত চেপে ধরে বললে, খবরদার কুমার, ওদিকে যাওয়ার নামও কোরও না।
কেন বিমল, ওদিকে তো কেউ নেই?
হ্যাঁ, চোখে কারুকে দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু আগে এখানকার ব্যাপারটা তলিয়ে বুঝে দ্যাখো। প্রথমে ধরো, রীতিমতো মাঠের মতন এমন একটা জায়গা অকারণে কেউ এত উঁচু পাথরের পাঁচিল দিয়ে ঘিরে রাখে না। এখানটা ঘিরে রাখবার কারণ কি? দ্বিতীয়ত, পাঁচিলের ওই দরজা পুরু লোহা দিয়ে তৈরি কেন? এই ফর্দা জায়গায় এমনকী বিভীষিকা আছে যাকে এখানে ধরে রাখবার জন্যে অমন মজবুত দরজার দরকার হয়? তৃতীয়ত, পাঁচিল-ঘেরা এতখানি জায়গার ভেতরে দ্রষ্টব্য আর কিছুই নেই–না গাছপালা, না ঘরবাড়ি, না জীবনের চিহ্ন! আছে। কেবল একটা জলাশয়! কেন ওখানে জলাশয় খখাড়া রয়েছে, ওর ভেতরে কি আছে? আমাদের খুব কাছে এখনি যে দানব-জানোয়ারটা বিষম গর্জন করলে, কে বলতে পারে সে ওই জলাশয়ে বাস করে কিনা? হয়তো সে উভচর–জলে-স্থলে তার অবাধ গতি! ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয় কুমার, ওদিকে যাওয়া নিরাপদ নয়।
জয়ন্ত শিউরে উঠে বললে, তবে কি ওই দানবের খোরাক হওয়ার জন্যেই আমাদের তাড়িয়ে এইখানে নিয়ে আসা হয়েছে?
আমার তো তাই বিশ্বাস।
কুমার বললে, ওই বিভীষিকা যদি স্থলচর হয়, তাহলে আমরা তো এখানে থেকেও বাঁচতে পারব না! সে তো আমাদের দেখতে পেলেই আক্রমণ করবে! তখন কি হবে?
তখন ভরসা আমাদের এই তিনটে অটোমেটিক বন্দুক! কিন্তু এই বন্দুক তিনটে যে নিশ্চয়ই আমাদের প্রাণরক্ষা করতে পারবে একথা জোর করে বলা যায় না! চম্পাদ্বীপে আমরা এমন সব জীবও স্বচক্ষে দেখেছি যাদের কাছে বন্দুকও হচ্ছে তুচ্ছ অস্ত্র।
জয়ন্ত কিছু না বলে প্রাচীরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর প্রাচীরের গায়ে হাত বুলিয়ে বললে, দেখছি পাঁচিলের গা তেলা নয়, রীতিমতো এবড়ো-খেবড়ো। ভালো লক্ষণ।
বিমল বললে, পাঁচিলের গা অসমতল হলে আমাদের কি সুবিধা হবে জয়ন্তবাবু?
জয়ন্ত সে-কথার জবাব না দিয়ে বললে, বিমলবাবু, যদি একগাছা হাত-চল্লিশ-পঞ্চাশ লম্বা দড়ি পেতুম, তাহলে আমাদের আর কোনওই ভাবনা ছিল না।
বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, দড়ি? দড়ি নিয়ে কি করবেন? দড়ি তো আমার কাছেই আছে! জয়ন্তবাবু, আমি আর কুমার হচ্ছি পয়লা নম্বরের ভবঘুরে, পথে পা বাড়ালেই সবকিছুর জন্যেই প্রস্তুত হয়ে থাকি। আমাদের দুজনের পাশে ঝুলছে এই যে দুটো ব্যাগ, এর মধ্যে আছে দস্তুরমতো সংসারের এক-একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। আমার ব্যাগে আছে ষাট হাত ম্যানিলা দড়ি। জানেন তো, দেখতে সরু হলেও ম্যানিলা দড়ি দিয়ে সিংহকেও বেঁধে রাখা যায়?
জয়ন্ত বললে, উত্তম। আর চাই একটা হাতুড়ি আর একগাছা হুক।
ও দুটি জিনিস আছে কুমারের ব্যাগে।
চমৎকার! তাহলে আমার সঙ্গে আসুন। আমি চাই চার পাঁচিলের একটা কোণ বেছে নিতে, সেখানে গেলে হাত বাড়িয়ে পাব দু-দিকের দেওয়াল।
