কুমার বললে, ওদের ধরন-ধারণ দেখলে মনে হয় যেন নিশ্চিত মৃত্যুর দল মূর্তিধারণ করে নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে!
জয়ন্ত বললে, ওরা কারা তা জানি না, কিন্তু আমাদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকা উচিত নয়।
বিমল বললে, এখন দেখছি সঙ্গীদের জাহাজে রেখে এসে ভালো কাজ করিনি। এই রহস্যময় দ্বীপে অদৃষ্টে কি আছে জানি না, কিন্তু চলুন, আমরা বনের ভেতরে গিয়ে ঢুকি।
আর এক দৌড়ে তারা মাঠ ছেড়ে বনের ভেতরে গিয়ে পড়ল।
বন সেখানে খুব ঘন নয়, গাছগুলোর তলায়-তলায় ও ফাঁকে-ফাঁকে দেখা যাচ্ছে খানিক কালো আর খানিক আলোয় খেলা। ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়েও ফুটে উঠেছে আলো কালো মাখা পথের রেখা।
এবং দূর থেকে তখনও ভেসে আসছিল সেই বিচিত্র সংগীতের তান।
কুমার বললে, এখন আমরা কোনদিকে যাব?
বিমল বললে, পূর্ব-দক্ষিণ দিকে আরও খানিক এগিয়ে তারপর আবার আমরা নদীর দিকে ফেরবার চেষ্টা করব।
বিমলের মুখের কথা শেষ হতেই সারা অরণ্য যেন চমকে উঠল কি এক পৈশাচিক হো হো অট্টহাস্যে! তাদের আশপাশ, সুমুখ পেছন থেকে ছুটল হাসির হররার পর হাসির হররা! সে বিকট হাসির স্রোত বইছে যেন পায়ের তলা দিয়ে, সে হাসি যেন ঝরে ঝরে পড়ছে শূন্যতল থেকে, সে হাসির ধাক্কায় যেন চঞ্চল হয়ে উঠল বনব্যাপী আলোর রেখা, কালোর রেখা!
বিমল, কুমার ও জয়ন্ত বিভ্রান্তের মতো চতুর্দিকে ঘুরে-ফিরে তাকাতে লাগল, কিন্তু কোনওদিকেই দেখা গেল না জনপ্রাণীকে।
জয়ন্ত বললে, কারা হাসে? কোথা থেকে হাসে? কেন হাসে?
কুমার ও বিমল কখনও পাগলের মতো এ-গাছের ও-গাছের দিকে ছুটে যায় কখনও ডাইনের কখনও বাঁয়ের ঝোপঝাড়ের ওপরে বন্দুকের কুঁদো দিয়ে বারবার আঘাত করে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই–অথচ অট্ট-অট্ট হাসির তরঙ্গের-পর-তরঙ্গ আসছে প্রতি ঝোপের ভেতর থেকে, প্রতি গাছের আড়াল থেকে! এ অদ্ভুত হাসির জন্ম যেন সর্বত্রই।
যেমন আচম্বিতে জেগেছিল, তেমনি হঠাৎ আবার থেমে গেল হাসির হুল্লোড়! কেবল শোনা যেতে লাগল সুদূরের সংগীতলহরী।
বিমল কান পেতে শুনে বললে, জয়ন্তবাবু, এবারে কেবল গান নয়, আর একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছেন?
জয়ন্ত বললে, হুঁ। বনময় ছড়ানো শুকনো পাতার ওপরে পড়ছে যেন তালে-তালে শত শত পা! বোধহয় মাঠের বন্ধুরা বনে ঢুকছে, কিন্তু এবারে তারা আর নিঃশব্দে আসছে না।
বিমল বললে, ছোট কুমার, যত জোরে পারো ছোট। আবার জাগ্রত হল বহুকণ্ঠে সেই ভীষণ অট্টহাস্য!
কুমার বললে, কিন্তু কোন দিকে ছুটব বিমল? দূরে শত্রুদের পদশব্দ, আশেপাশে শত্রুদের পাগলা হাসির ধূম! চারিদিকে অদৃশ্য শত্ৰু, কোনদিকে যাব ভাই?
সামনের দিকে সামনের দিকে। শত্রুরা দৃশ্যমান হলেই বন্দুক ছুড়বে।
তিনজনে আবার ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগল এবং তাদের সঙ্গে-সঙ্গেই ছুটতে লাগল যেন। সেই বেয়াড়া হাসির আওয়াজ! এইটুকুই কেবল বোঝা গেল যে, তাদের এপাশে-ওপাশে পেছনে জাগ্রত অট্টহাসি থাকলেও সামনের দিকে হাসি এখন একেবারেই নীরব। যেন সেই অপার্থিব হাসি তাদের সুমুখের পথ রোধ করতে চায় না! যেন কারা তাদের ওইদিকেই তাড়িয়ে নিয়ে যেতে চায়!
প্রায় বারো-তেরো মিনিট ধরে তারা ছুটে চলল এইভাবেই এবং এরমধ্যে সেই হাসির স্রোত বন্ধ হল না একবারও।
তার পরেই থেমে গেল হাসি, শেষ হয়ে গেল বনের পথ এবং সামনেই দেখা গেল পথ জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে খুব উঁচু একটা প্রাচীর।
কুমার হতাশভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে বললে, সামনের পথ বন্ধ! এখন আমরা কি করব?
বিমল ও জয়ন্ত উপায়হীনের মতো এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগল।
হঠাৎ বনের ভেতরে জাগল আবার শত-শত পায়ের আঘাতে শুকনো পাতার আর্তনাদ।
জয়ন্ত বললে, এবারে পায়ের শব্দ আসছে আমাদের দুপাশ আর পিছন থেকে। আমাদের সুমুখে রয়েছে খাড়া দেওয়াল। আর আমাদের পালাবার উপায় নেই।
বিমল ম্লান হাসি হেসে বললে, আমরা পালাচ্ছি না–রিট্রিট করছি।
জয়ন্তও হাসবার চেষ্টা করে বললে, বেশ, মানলুম এসব হচ্ছে আমাদের ট্যাকটিক্যাল মুভমেন্টস; কিন্তু এবারে আমরা কোন দিকে যাত্রা করব?
বিমল বললে, সামনের দিকে ভালো করে চেয়ে দেখুন, আমাদের সুমুখের দেওয়ালের গায়ে রয়েছে একটা ছোট দরজা! ওর পাল্লাও বন্ধ নেই।
জয়ন্ত দুই পা এগিয়ে ভালো করে দেখে বুঝলে, বিমলের কথা সত্য! তারপর বললে, দেখছি, অন্ধকারে আপনার চোখ আমাদের চেয়ে ভালো চলে। কিন্তু ওর ভেতরে ঢুকলে কি আর আমরা বেরিয়ে আসতে পারব? বেশ বোঝা যাচ্ছে, দুই পাশের আর পেছনের অদৃশ্য শত্রুরা অট্টহাস্য আর পায়ের শব্দ করে আমাদের এই দিকেই তাড়িয়ে আনতে চায়। শিকারীরা বাঘ-সিংহকে যেমনভাবে নির্দিষ্ট পথে চালনা করে ফাঁদে ফেলে, শত্রুরাও সেই কৌশল অবলম্বন করেছে।
বিমল বললে, ঠিক। তাদের উদ্দেশ্য আমিও বুঝতে পেরেছি। আর আমাদের ঢোকবার সুবিধা হবে বলে দয়া করে তারা দরজার পাল্লা-দুখানাও খুলে রেখেছে! অতএব তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের এখন দরজার ফাঁকেই মাথা গলাতে হবে, কারণ পায়ের শব্দ আর দূরে নেই!
কুমার বললে, দরজার ওপাশে যদি নতুন বিপদ থাকে?
অকুতোভয়ে সেই বিপদকে আমরা বরণ করব–বলেই বিমল বন্দুক উদ্যত করে সর্বাগ্রে দরজার ভেতরে গিয়ে ঢুকল। তার পেছনে-পেছনে গেল কুমার ও জয়ন্ত!
ভেতরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে দেখলে, একটা বৃক্ষহীন, তৃণহীন ছোটখাটো ময়দানের মতন জায়গা এবং তার চারিদিকেই প্রায় চারতলার সমান উঁচু প্রাচীর। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, যেন সর্বহারা মরুভূমির খাঁ-খাঁ করা ভয়াল স্তব্ধতাকে সেখানে কেউ প্রাচীর তুলে কয়েদ করে রেখেছে!
