কুমার বললে, আমার কি মনে হচ্ছে জানো বিমল? ওই ফুলের বনে, ওই ঝরনার ধারে একখানি পাতার কুঁড়েঘর গড়ে সত্যিকার কবিতার জীবনযাপন করি! চারিদিকে বনের গান, পাখির তান, বাতাসের ঝঙ্কার, মৌমাছির গুঞ্জন, ফুলের সঙ্গে প্রজাপতির রঙের খেলা, দিনে মাঠে-মাঠে রোদের কাঁচা সোনা, রাতে গাছে-গাছে চাঁদনির ঝিলিমিলি, আর এরই মধ্য থেকে সর্বক্ষণ শোনা যায় অনন্ত সমুদ্রের মুখে মহাকাব্যের আবৃত্তি! কলকাতার পায়রার খোপে। আর আমার ফিরতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
জয়ন্ত বললে, পৃথিবীকে আমার যখন বড় ভালো লাগে তখন আমি চাই বাঁশি বাজাতে! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এখন আমার সঙ্গে আছে বাঁশির বদলে বন্দুক। বন্দুকের নল থেকে তো। গান বেরোয় না, বেরোয় কেবল বিষম ধমক।
মানিক বললে, কেন জয়ন্ত, খুশি হলেই তো তুমি আর একটি জিনিস ব্যবহার করো! নস্যির ডিবেটাও কি তুমি সঙ্গে আননি?
জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ, মানিক, নস্যির ডিবেটা আমার পকেটেই আছে। কিন্তু কবিতা কোনওদিন ডিবের ভেতরে নস্যির সঙ্গে বাস করে না। আজ আমাদের সামনে দেখছি যে। মূর্তিমান সংগীতকে, তার নাচের ছন্দ জাগতে পারে কেবল আমার বাঁশির মধ্যেই।
সুন্দরবাবু ধীরে-ধীরে অনেক কষ্টে দোদুল্যমান ভূঁড়ির বিদ্রোহিতাকে আমলে না এনেই পাহাড়ের ওপরে উঠে এসেছিলেন। কিন্তু বন্ধুদের কবিত্ব-চর্চা, আর তিনি বরদাস্ত করতে পারলেন না, বিরক্ত স্বরে বললেন, হুম! পাহাড় থেকে ঝরনা ঝরছে, বাতাসের ধাক্কা খেয়ে গাছগুলো নড়ে-চড়ে শব্দ করছে, কতগুলো পাখি চাঁ-া করে চাঁচাচ্ছে, আর মাঠে ঘাস গজাচ্ছে, এসব নিয়ে এত বড়-বড় কথার কিছু মানে হয় না। চল হে রামহরি, আমরা সরে পড়ি।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে বললে, কিন্তু যাবেন কোথায়? জাহাজে?
না। গরমে ছুটোছুটি করে শরীরটা কেমন এলিয়ে পড়েছে। এখানকার পাহাড়ের তলায় সমুদ্রের ঠান্ডা জলে বেশি ঢেউ নেই দেখছি। একটু সমুদ্র-স্নান করবার ইচ্ছে হয়েছে। রামহরি, কি বলো?
রামহরি বললে, বেশ তো, চলুন না! আমিও একবার চান করে নিই-গে। আয় রে বাঘা!
কিন্তু তোমার বাঘাকে আগে-আগে যেতে বলো রামহরি, নইলে ও আবার হয়তো আমার পা শুঁকতে আসবে!
রামহরি বললে, বাঘা, সাবধান! আবার যেন আমাদের সুন্দরবাবুর সঙ্গে গায়ে পড়ে ভাব করতে যেও না! যাও, এগিয়ে যাও।
বাঘার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল না যে, সুন্দরবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবার জন্যে তার মনে আর কিছুমাত্র বাসনা আছে। কিন্তু সে রামহরির কথা বুঝে ল্যাজ উঁচু করে আগের দিকে দিলে লম্বা এক দৌড়।
রামহরির সঙ্গে সুন্দরবাবু যখন পাহাড় থেকে নেমে জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন, তখন আকাশের আলো তার উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলছে ধীরে-ধীরে।
রামহরি বললে, শিগগির দুটো ডুব দিয়ে নিন, আলো থাকতে থাকতেই আমাদের আবার জাহাজে গিয়ে উঠতে হবে।
কিছু ভয় নেই রামহরি, আজ পূর্ণিমা। আজ অন্ধকার জব্দ!
ওই শুনুন, কু দিয়ে জাহাজ আমাদের ডাকছে। ওই দেখুন, পাহাড়ের ওপর থেকে ওঁরা সবাই নেমে আসছেন!
সুন্দরবাবু জলের ভেতরে ঝাঁপিয়ে পড়ে একটি সুদীর্ঘ আঃ উচ্চারণ করলেন। তারপর বললেন, বাঃ, তোমাদের বাঘা দেখছি যে দিব্যি সাঁতার কাটছে! আমিও একটু সাঁতার দিয়ে নি। কি চমৎকার ঠান্ডা জল! দেহ যেন জুড়িয়ে গেল!
জল কেবল ঠান্ডা নয়, নীলিমা-মাখানো সুন্দর, স্বচ্ছ। তলাকার প্রত্যেক বালুকণাটি পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে–এখানকার জলের মধ্যে কোনওই অজানা রহস্য নেই। কাজেই সুন্দরবাবু মনের সুখে নির্ভয়ে সাঁতার কাটতে লাগলেন।
দূর থেকে মানিক চিৎকার করে বললে, উঠে আসুন সুন্দরবাবু, অত আর সাঁতার কাটতে হবে না। এখানকার সমুদ্রে হাঙর আছে!
সুন্দরবাবু আঁতকে উঠে বললেন, হুম, কি বললে? হাঙর? তাই তো হে, একথা তো এতক্ষণ মনে হয়নি! বাব্বাঃ! দরকার নেই আমার সাঁতার কেটে! তিনি তীরের দিকে ফিরলেন এবং সঙ্গে-সঙ্গেই অনুভব করলেন জলের ভিতর থেকে প্রাণপণে কে তার কোমর জড়িয়ে ধরলে!
ওরে বাবা রে, হুম-হুম! হাঙর, হাঙর! জয়ন্ত, মানিক, রামহরি! আমাকে হাঙরে ধরেছে হু-হু-হুঁ-হুঁ-হুম!
রামহরি একটু তফাতে ছিল। কিন্তু সেইখান থেকেই সে স্তম্ভিত চোখে বেশ দেখতে পেল যে, সুন্দরবাবুর দেহের সঙ্গে সংলগ্ন হয়ে রয়েছে, সুদীর্ঘ একটা ছায়ামূর্তি!
সুন্দরবাবু পরিত্রাহি চিৎকার করে বললেন, বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও! হাঙর নয়, এ যে একটা মানুষ! এ যে মড়া! ওরে বাবা, এ যে ভূত! এ যে আমাকে জলের ভেতরে টানছে–ও জয়ন্ত, ও মানিক!
বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিক তিরের মতো পাহাড় থেকে নেমে এল। ভূতের নামে রামহরি একবার শিউরে উঠল বটে, কিন্তু তখনি সে দুর্বলতা সামলে নিয়ে বেগে সাঁতার কেটে সুন্দরবাবুর দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু সর্বাগ্রে সুন্দরবাবুর কাছে গিয়ে পড়ল বাঘা– তার দুই চক্ষু জ্বলছে তখন তীব্র উত্তেজনায়!
আর পারছি না, একটা জ্যান্ত মড়া আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বাঁচাও!
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ । জীবন্ত মৃতদেহ
ডুবে মলুম, ডুবে মলুম, বাঁচাও!–সুন্দরবাবু আবার একবার চেঁচিয়ে উঠলেন।
তিনি বেশ অনুভব করলেন, দু-খানা অস্থিচর্মসার, কিন্তু লোহার মতন কঠিন এবং বরফের মতন ঠান্ডা-কনকনে বাহু তাকে জড়িয়ে ধরে পাতালের দিকে টানছে, ক্রমাগত টানছে!
