দারুণ ভয়ে আচ্ছন্ন হয়ে তিনি তার দিকে ভালো করে তাকাতে পারলেন না বটে, কিন্তু আবছা-আবছা যেটুকু দেখতে পেলেন তাই-ই হল তাঁর পক্ষে যথেষ্ট। সে হচ্ছে একটা মৃত-মানুষের জীবন্ত মৃত মানুষের মূর্তি, আর তার চোখদুটো হচ্ছে মরা মাছের মতো!
রামহরি দু-হাতে জল কেটে এগুতে-এগুতে সভয়ে দেখল, হুম বলে বিকট এক চিৎকারের সঙ্গে-সঙ্গে সুন্দরবাবু হুশ করে ডুবে গেলেন এবং সেই মুহূর্তে বাঘাও দিলে জলের তলায় ডুব।
ওদিকে বিমল, কুমার, জয়ন্ত ও মানিকও ততক্ষণে জলে ঝাঁপ দিয়ে এগিয়ে আসছে।
কিন্তু তাদের আর বেশিদূর এগিয়ে আসতে হল না হঠাৎ দেখা গেল, সুন্দরবাবু আবার ভেসে উঠে প্রাণপণে সাঁতার কেটে তীরের দিকে ফিরে আসছেন! বাঘাও আবার ভেসে উঠেছে।
রামহরি খুব কাছে ছিল। সে দেখতে পেলে, জলের ওপরে খানিকটা রক্তের দাগ এবং বাঘার মুখও রক্তাক্ত।
ব্যাপারটা বুঝে তারিফ করে সে বললে, বাহাদুর বাঘা, বাহাদুর!
কিন্তু সেই আশ্চর্য ও অসম্ভব মূর্তিটার আর কোনও পাত্তাই পাওয়া গেল না।
সকলে ডাঙার ওপরে উঠল। সুন্দরবাবু আর রামহরি ও বাঘা ছাড়া সে বিকট মূর্তিটাকে আর কেউ দেখেনি, সুতরাং আসল ব্যাপারটাও এখনও কেউ বুঝতে পারলে না।
বালির ওপরে হাত-পা ছড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে সুন্দরবাবু হাঁপাতে লাগলেন হাপরের মতো।
বিমল জিজ্ঞাসা করলে, সুন্দরবাবু, আপনাকে কি হাঙরে ধরেছিল?
কুমার বললে, না বিমল, তা হতে পারে না। হাঙরে ধরলে উনি অমন অক্ষত দেহে ফিরে আসতেন না।
বিমল বললে, হুঁ, সেকথা ঠিক। কিন্তু তবে কে ওঁকে জলের ভেতরে আক্রমণ করতে পারে?
সুন্দরবাবু বেদম হয়ে খালি হাঁপান! এখন তার একটা হুম পর্যন্ত বলবার শক্তি নেই। বাঘা গম্ভীর মুখে এসে সুন্দরবাবুর সর্বাঙ্গ শুঁকে বোধহয় পরীক্ষা করে দেখলে যে, তাঁর দেহ অটুট আছে কি না! পরীক্ষার ফল নিশ্চয়ই সন্তোষজনক হল, কারণ ঘনঘন ল্যাজ নেড়ে সে মনের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল।
জয়ন্ত বললে, এখানে জলের ভেতরে অক্টোপাস থাকে না তো?
রামহরি বললে, কি বললেন?
অক্টোপাস।
তাকে কি মানুষের মতন দেখতে?
মোটেই নয়। তোমাকে কতকটা বোঝাবার জন্যে বরং বলা যায়, তাকে দেখতে অনেকটা বিরাট ও অদ্ভুত মাকড়শার মতো। সমুদ্রের জলে তারা লুকিয়ে থাকে আর আটখানা পা দিয়ে জড়িয়ে শিকার ধরে মাংস-রক্ত শুষে খায়।
না বাবু, না। আপনি যে কিম্ভুতকিমাকার জানোয়ারের কথা বললেন নিশ্চয়ই সেটা ভয়ানক, কিন্তু সুন্দরবাবুকে যে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে দেখতে মানুষের মতো।
বিমল হো-হো করে হেসে উঠে বললে, কি যে বলো রামহরি! মানুষ কি জলচর জীব? জলের ভেতর থেকে আক্রমণ করে সে কি এতক্ষণ ধরে জলের তলাতেই ডুব মেরে থাকতে পারে?
মানিক মুখ ফিরিয়ে দেখলে, সেই বিশাল হ্রদের মতো জলরাশি একেবারে স্থির হয়ে রয়েছে। তাদের জাহাজ আর লাইফবোট ছাড়া তার ওপরে আর কোনও জীবজন্তুর চিহ্নমাত্র নেই। বিমল ঠিক কথাই বলেছে। সুন্দরবাবুকে যে আক্রমণ করেছিল নিশ্চয়ই সে মানুষ নয়।
রামহরি দৃঢ়স্বরে বললে, না খোকাবাবু, আমি মিছে কথা বলিনি। সে মানুষ কি না জানি না, কিন্তু তার চেহারা মানুষের মতোই। সুন্দরবাবুর কোমর সে নীচে থেকে দু-হাতে আঁকড়ে ধরেছিল। কাচের মতো পরিষ্কার জলে তার হাত, পা, মুখ, দেহ বেশ দেখা যাচ্ছিল।
এতক্ষণ পরে সুন্দরবাবুর হাঁপ-ছাড়া হল সমাপ্ত। দু-হাতে ভর দিয়ে উঠে বসে তিনি বললেন, হুম। রামহরি কিচ্ছু ভুল বলছে না। আমাকে ধরেছিল একটা জ্যান্ত মরা-মানুষ!
জ্যান্ত মরা-মানুষ!
হ্যাঁ, আমি তাকে স্বচক্ষে দেখেছি–একেবারে আসল মড়া! আমি তার হাতের ছোঁয়া পেয়েছি–একেবারে কনকনে অস্বাভাবিক ঠান্ডা! কিন্তু সে জ্যান্ত, তার হাতের চাপে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল! মরা মাছের মতো স্থির দুই চোখে আমার দিকে সে তাকিয়ে ছিল– বাপ রে, ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়!
রামহরি বললে, জ্যান্ত মড়া মানেই হচ্ছে, পিশাচ। সুন্দরবাবু নিশ্চয়ই কোনও পিশাচের পাল্লায় পড়েছিলেন। ভাগ্যে আমাদের বাঘা ছিল, তাই এ-যাত্রা কোনও-গতিকে বেঁচে গেলেন! বাঘার কাছে পিশাচও জব্দ!
সুন্দরবাবু কৃতজ্ঞ-দৃষ্টিতে বাঘার দিকে তাকিয়ে বললেন, হুম্। বাঘা, আয় রে, আমার কাছে আয়! তুই যে কি রত্ন, এতদিন আমি চিনতে পারিনি। এবার থেকে আর তোকে আমি কিছু বলব না, তোকে ভালো-ভালো খাবার খেতে দেব। খাসা কুকুর, লক্ষ্মী কুকুর!
মানিক বললে, সুন্দরবাবু, আপনি নিশ্চয় মৎস্যনারী আর নাগকন্যার গল্প শুনেছেন?
সুন্দরবাবু বেশ বুঝলেন মানিকের মাথায় কোনও নতুন দুষ্টুমি বুদ্ধির উদয় হয়েছে, তার পেছনে লাগা হচ্ছে তার চিরকেলে স্বভাব। বললেন, হুঁ, শুনেছি। কি হয়েছে তা?
আমার বোধহয় কোন মৎস্য-নারী কি নাগ-কন্যা আপনাকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছিল।
একটু গরম হয়ে সুন্দরবাবু বললেন, আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে সে কি করত?
বিয়ে করত। আপনাকে দেখে তার পছন্দ হয়েছিল কিনা।
একেবারে মারমুখো হয়ে সুন্দরবাবু বললেন, চোপরাও মানিক, চোপরাও! তোমার মতন তাঁদোড় আমি জীবনে আর দেখিনি, আমার হাতে একদিন তুমি মার খাবে জেনো।
বিমল গম্ভীরমুখে ভাবতে-ভাবতে বললে, জয়ন্তবাবু, আপনি কিছু আন্দাজ করতে পারছেন?
কিছু না। কেবল এইটুকু বুঝতে পারছি, সুন্দরবাবুর চোখের ভ্রম হয়েছে।
