সুন্দরবাবু বললেন, কেন?
বোম্বেটেরাও এখানে আসছে, তারা আমাদের চেয়ে দলে ঢের ভারী। আমরা ডাঙায় না নামলে তাদের আক্রমণ ঠেকাতে পারব না।
সুন্দরবাবু আবার মুষড়ে পড়ে বললেন, তাহলে যুদ্ধ আমাদের করতেই হবে?
নিশ্চয়! টাইফুন আর বোম্বেটে–আমাদের এখন যুদ্ধ করতে হবে দুই শত্রুর সঙ্গে! ওই দেখুন, সেলর-রা এরই মধ্যে লাইফবোট ভাসিয়ে ফেলেছে! ওই শুনুন, মেগাফোনে কাপ্তেন-সায়েবের গলা! তিনি আমাদের নৌকোয় তাড়াতাড়ি নামতে বলছেন–নইলে ঝোড়ো ঢেউ এখানেও এসে পড়তে পারে! চলুন, আর দেরি নয়। রামহরি, তুমি বাঘাকে সামলাও!
লাইফবোট যেখানে থামল, সেখানে জলের ধার থেকেই একটি ছোট্ট পাহাড় প্রায় একশো ফুট উঁচু হয়ে উঠেছে।
বিমল বললে, এইখানেই বন্দুক নিয়ে আমরা সবাই পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করব। বোম্বেটেরা আমাদের বন্দুক এড়িয়ে নিতান্তই যদি ডাঙায় এসে নামে, তাহলে অবস্থা বুঝে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে। আপাতত এই পাহাড়টাই হবে আমাদের দুর্গ। কি বলো কুমার, কি বলেন জয়ন্তবাবু?
জয়ন্ত বললে, সাধুপ্রস্তাব। কিন্তু বিমলবাবু, একটা গোলমাল শুনতে পাচ্ছেন?
হুঁ, ঝোড়ো বাতাসের গোঁ-গোঁ হু-হু, সমুদ্রের হুঙ্কার!
কুমার বললে, কেবল তাই নয়দূর থেকে যেন অনেক মানুষের কোলাহলও ভেসে আসছে!
রামহরি বললে, এতক্ষণ চারিদিক গুমোট করে ছিল, এখন জোর হাওয়ায় এখানকার গাছপালাগুলো নুয়ে-নুয়ে পড়ছে! ঝড় বোধহয় এল!
মানিক বললে, ঝড় এল, কিন্তু বোম্বেটে-জাহাজ কোথায়?
সুন্দরবাবু বললেন, হুম!
বাঘা বললে, ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ!
বিমল বললে, তবে কি বোম্বেটেগুলো ঝড়ের খপ্পরেই পড়ল? দাঁড়াও, দেখে আসি—বলেই সে তাড়াতাড়ি পাহাড়ের ওপরে উঠতে লাগল।
রামহরি উদ্বিগ্ন স্বরে বললে, ওপরে উঠো না খোকাবাবু, ওপরে উঠো না! বেশি ঝড় এলে উড়ে যাবে!
কিন্তু বিমল মানা মানলে না। পাহাড়ের প্রায় মাঝবরাবর উঠেই দাঁড়িয়ে পড়ে একদিকে তাকিয়ে সে চমৎকৃত স্বরে বললে, আশ্চর্য, আশ্চর্য! কুমার, কুমার, শিগগির দেখে যাও।
বিপুল কৌতূহলে সবাই দ্রুতপদে ওপরে উঠতে লাগল–একমাত্র সুন্দরবাবু ছাড়া। তার বিপুল উঁড়ি উর্ধমার্গের উপযোগী নয়।
বাস্তবিকই সে এক আশ্চর্য দৃশ্য! যে বিষম টাইফুনের ভয়ে তারা সবাই এখানে এসে। আশ্রয় নিয়েছে, সে-ভয়ঙ্কর দ্বীপের দিকে না এসে যেন পাশ কাটিয়েই প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে চলেছে অন্য দিকে হু-হু করে! দ্বীপের দিকে এসেছে খানিকটা উদ্দাম হাওয়ার ঝটকা মাত্র, কিন্তু টাইফুন নিজে যেখান দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার শূন্যে দুলছে নিরন্ধ্র অন্ধকার নীচে কেবল। অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে রুদ্র সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গদলের হিন্দোলা! আর ভেসে-ভেসে আসছে প্রমত্ত ঘূর্ণাবর্তের বিকট চিৎকার, গম্ভীর জল কল্লোল, বহু মানবকণ্ঠের আর্তনাদ!
কুমার অভিভূত স্বরে বললে, এমন বিচিত্র ঝড় আর কখনও দেখিনি! কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজাখানা কোথায় গেল?
বিমল বললে, ওখানকার অন্ধকার ভেদ করে কিছুই দেখবার উপায় নেই! তবে মানুষের গোলমাল শুনে বোধ হচ্ছে, ঝড়ের সঙ্গে-সঙ্গে সে-ও কোথায় ছুটে চলেছে, হয়তো সমুদ্র এখনি তাকে গিলে ফেলবে!
রামহরি সানন্দে বললে, জয় বাবা পবনদেব! আজ তুমিই আমাদের সহায়!
খানিকক্ষণ পরেই চারিদিক আবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন শূন্যে নেই অন্ধ মেঘের কালিমা, সমুদ্রে নেই বিভীষণের তাণ্ডবলীলা। একটু আগে কিছুই যেন হয়নি, এমনিভাবেই মুখর নীলসাগর আবার বোবা নীলাকাশের কাছে আদিম যুগের জীবহীনা ধরিত্রীর পুরাতন গল্প-বলা শুরু করলে।
সূর্য সাগর-স্নানে নেমে অদৃশ্য হল, কিন্তু আকাশ আর পৃথিবীতে এখনও আলো যেন ধরছে না! দূর থেকে আঁকে-ঝকে সামুদ্রিক পাখি ফিরে আসছে দ্বীপের দিকে।
পাহাড়ের ওপরে বসে সবাই বিশ্রাম করছিল। সেখান থেকে দ্বীপটিকে দেখাচ্ছে চমৎকার পরিস্থানের মতো। নানা জাতের গাছেরা সেখানে সংগীতময় সবুজ উৎসবে মেতে আছে এবং তাদের মধ্যে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে পাম-জাতীয় গাছেরাই।
কোথাও পাহাড়ের আনন্দাশ্রুধারার মতো ঝরে পড়ছে ঠিক যেন একটি খেলাঘরের ঝরনা। রূপালি ফিতার মতো তার শীর্ণ ধারা সকৌতুকে পাথরে-পাথরে নাচতে নাচতে নেমে এসেছে নীচেকার সুন্দরশ্যাম জমির ওপরে–যেখানে শ্যামলতাকে সচিত্র করে তুলেছে রং-বেরঙের পুঞ্জ পুঞ্জ ফুলের দল। খানিক পরেই রাত হবে, তারার সভায় উঁদ হাসবে, আর নতুন জ্যোৎস্নার ঝলমলে আলো মেঘে স্বপ্নবালারা আসবে যেন সেই ফুলের ঘাস-গালিচার ওপরে বসে ঝরনার কলগান শুনতে!
বিমল এইসব দেখতে-দেখতে একটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললে, শহর আর সভ্যতা ছেড়ে পৃথিবীর যেখানেই যাই সেখানেই দেখি, রেখায়-রেখায় লেখা আছে সৌন্দর্যের কবিতা। শহরে বসে হাজার টাকা খরচ করে যতই ড্রয়িং রুম সাজাও, কখনওই জাগবে না সেখানে রূপের এমন ঐশ্বর্য, লাবণ্যের এত ছন্দ! শহরে বসে আমরা যা করি তা হচ্ছে আসল সৌন্দর্যের ক্যারিকেচার মাত্র, কাগজের ফুলের মতোই অসার! তাই তো আমি যখন-তখন কুৎসিত শহর আর কপট সভ্যতাকে পেছনে ফেলে ছুটে যেতে চাই সৌন্দর্যময় অজানা বিজনতার ভেতরে। রামহরি জানে, আমরা দুরন্ত ডানপিটে, খুঁজি খালি অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু তুমি জানো কুমার, এ কথা সত্য নয়! চোখের সামনে রয়েছে এই যে অপরূপের নাট্যশালা, আমাদের কল্পনা কি এখানে অভিনয় করতে ভালোবাসে না? আমরা কি কেবল ঘুষোঘুষি করতে আর বন্দুক ছুঁড়তেই জানি, কবিতা পড়তে পারি না?
