হঠাৎ বিমল দূরবিন নামিয়ে আবার ফিরে দাঁড়াল। তার মুখ বিবর্ণ, দৃষ্টি ভয়চকিত।
বিমলের মুখেচোখে ভয়ের চিহ্ন! এটা কি অসম্ভব! কুমার রীতিমতো অবাক হয়ে গেল।
জয়ন্ত বিস্মিত স্বরে বললে, কি হল বিমলবাবু, আপনার মুখচোখ অমনধারা কেন?
বিমল দূরবিনটা জয়ন্তের হাতে দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললে, শত্রু-জাহাজের পিছনে চেয়ে দেখুন, বোম্বেটেদেরও চেয়ে ভয়াবহ এক শত্রু আমাদের গ্রাস করতে আসছে! আমি এখন ব্রিজের ওপরে কাপ্তেনের কাছে চললুম, আরও তাড়াতাড়ি ওই দ্বীপে গিয়ে উঠতে না পারলে আর রক্ষা নেই!
সুন্দরবাবু আঁতকে উঠে বললেন, বোম্বেটেরও চেয়ে ভয়াবহ শত্রু? ও বাবা, বলেন কি?
হ্যাঁ, হা, সুন্দরবাবু! এমন আর-এক শত্রু আমাদের আক্রমণ করতে আসছে, যার নামে ভয়ে কঁপে সারা দুনিয়া! তার সামনে আমাদের অটোমেটিক বন্দুকও কোনও কাজে লাগবে না!
এই বলেই বিমল জাহাজের বিজে-র দিকে ছুটল দ্রুতপদে।
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ । সুন্দরবাবুর সাগর-স্নান
চোখে দূরবিন লাগিয়ে জয়ন্ত যা দেখলে তা ভয়াবহই বটে!
বোম্বেটেদের জাহাজেরও অনেক পেছনে–বহু দুরে, আকাশ ও সমুদ্রের চেহারা একেবারে বদলে গেছে! নীচে বিপুল মাথা নাড়া দিয়ে উঠেছে প্রচণ্ড, উন্মত্ত, বৃহৎ তরঙ্গের-পর-তরঙ্গ বলা চলে তাদের পর্বত-প্রমাণ! তারা লাফিয়ে ওপরে উঠছে, আঁপিয়ে নীচে পড়ছে, আবার উঠছে, আবার নামছে এবং ঘুরপাক খেতে-খেতে ফেনায়-ফেনায় সেখানকার নীলিমাকে যেন খণ্ড-খণ্ড করে দিয়ে এগিয়ে আসছে উল্কার মতন তীব্রগতিতে! ওপরে আকাশের রং হয়ে গেছে কালো মেঘে-মেঘে ঘোরা-রাত্রির মতোই অন্ধকার! বেশ বোঝা যায়, জেগে উঠেছে সেখানে সর্বধ্বংসী আকস্মিক ঝঞ্জাবায়ু–যার মস্তকান্দোলনে দিকে দিকে ঠিকরে পড়ছে বাঁধন-হারা নিকষ কালো মেঘের জটা এবং ঘনঘন পদাঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে উথলে উঠছে তরঙ্গাকুল মহাসমুদ্র!
ফিরে দাঁড়িয়ে অভিভূত স্বরে জয়ন্ত বললে, টাইফুন?
কুমার খালি চোখেই সেদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা আন্দাজ করে নিয়ে বললে, হ্যাঁ, আমরা যাকে বলি ঘূর্ণাবর্ত।
মানিক বললে, কিন্তু আমাদের এখানে তো একটুও বাতাস নেই, অসহ্য উত্তাপে গা যেন পুড়ে যাচ্ছে।
কুমার বললে, ওসব টাইফুনের পূর্ব-লক্ষণ। এ-অঞ্চলে টাইফুন জাগবার সম্ভাবনা ওই লক্ষণ থেকেই জানা যায়।
জয়ন্ত বললে, কুমারবাবু, সমুদ্রযাত্রা আমার এই প্রথম, এর আগে টাইফুন কখনও দেখিনি। কিন্তু শুনেছি চিনা-সমুদ্রে টাইফুনের পাল্লায় পড়ে ফি-বৎসরেই অনেক জাহাজ অতলে তলিয়ে যায়।
সেইজন্যেই তো ওকে আমরা বোম্বেটেদেরও চেয়ে ভয়ানক বলে মনে করছি। বোম্বেটেদের সঙ্গে লড়া যায়, কিন্তু টাইফুনের সঙ্গে যুদ্ধ করা অসম্ভব। এখন আমাদের একমাত্র আশা ওই দ্বীপ। যদি টাইফুনের আগে ওখানে গিয়ে পৌঁছতে পারি! হয়তো পারবও, কারণ, আমরা দ্বীপের খুব কাছে এসে পড়েছি। এই দেখুন, আমাদের জাহাজের গতি আরও বেড়ে উঠেছে!
এতক্ষণ সুন্দরবাবু ছিলেন ভয়ে হতভম্বের মতো। এইবারে মুখ খুলে তিনি বলে উঠলেন, হুম! দুর্গে দুর্গতিনাশিনী!
জয়ন্ত বললে, কিন্তু বোম্বেটেদের জাহাজ এখনও দূরে রয়েছে, সে কি টাইফুনকে ফাঁকি দিতে পারবে?
কুমার বললে, ওদের নিয়ে আমাদের মাথা ঘামাবার দরকার নেই।
মানিক বললে, কি আশ্চর্য দৃশ্য! সমুদ্রের আর সব দিক শান্ত, কেবল একদিকেই জেগেছে। নটরাজের প্রলয়-নাচন!
কুমার বললে, সাধারণ সাইক্লোনে-র মতো টাইফুন বহু দূর ব্যেপে ছোটে না, ওইটেই তার বিশেষত্ব। কিন্তু ছোট হলেও তার জোর ঢের বেশি–যেটুকু জায়গা জুড়ে আসে, তার ভেতরে পড়লে আর রক্ষে নেই!
দূর থেকে মেগাফোনে বিমলের উচ্চ কণ্ঠস্বর জাগল–কুমার, সবাইকে নিয়ে তুমি ডাঙায় নামবার জন্যে প্রস্তুত হও। কেবল নিতান্ত দরকারি জিনিসগুলো গুছিয়ে নাও।
সবাই কেবিনের দিকে ছুটল। তারপর তাড়াতাড়ি কতকগুলো ব্যাগ ভরতি করে আবার তারা যখন ডেকের ওপরে এসে দাঁড়াল, দ্বীপ তখন একেবারে তাদের সামনে!
মানিক বিস্মিত কণ্ঠে বললে, সমুদ্র যে এখানে প্রকাণ্ড এক নদীর মতো হয়ে দ্বীপের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে! এ যে এক স্বাভাবিক বন্দর!
জয়ন্ত বললে, হ্যাঁ, আমাদের জাহাজও এই বন্দরে ঢুকছে।
সুন্দরবাবু উৎফুল্ল স্বরে বললেন, জয় মা কালী! আমরা বন্দরে আশ্রয় পেয়েছি!
মানিক বলল, হ্যাঁ, আরও ভালো করে মা কালীকে ডাকুন সুন্দরবাবু! কারণ তিনি হচ্ছেন যুদ্ধের দেবী, আর বোম্বেটেরাও এই বন্দরে আসছে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতেই।
সুন্দরবাবু দুই হাত জোড় করে মা কালীর উদ্দেশ্যে চক্ষু মুদে তিনবার প্রণাম করে বললেন, মানিক, এসময়ে আর ভয় দেখিও না, মা-জগদম্বাকে একবার প্রাণ ভরে ডাকতে দাও।
কুমার ফিরে দেখলে শত্রুরা দ্বীপ লক্ষ করে প্রাণপণে জাহাজ চালিয়েছে এবং দুরে তার দিকে বেগে তাড়া করে আসছে সাগর-তরঙ্গ তোলপাড় করে মূর্তিমান মহাকালের মতো সুভীষণ ঘূর্ণাবর্ত!
দ্বীপের ভেতরে ঢুকে সমুদ্রের জল আবার মোড় ফিরে গেছে, কাজেই জাহাজও সঙ্গে সঙ্গে মোড় ফিরলে। তখন দ্বীপের বনজঙ্গল ঠিক যবনিকার মতোই বাহির-সমুদ্র, ঘূর্ণাবর্ত ও বোম্বেটে-জাহাজের সমস্ত দৃশ্য একেবারে ঢেকে দিলে।
এমনসময়ে বিমল দৌড়ে সকলের কাছে এসে বললে, জয়ন্তবাবু, কাপ্তেন বললেন এখানকার জল গভীর নয়, জাহাজ আর চলবে না। নাবিকেরা নৌকোগুলো নামাচ্ছে, আমাদেরও জাহাজ থেকে নামতে হবে।
