হঠাৎ অমন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কেন?
কি জানো ভায়া, প্রথমটা আমার কিঞ্চিৎ লোভ হয়েছিল। এখন মনে হচ্ছে, সবই ভুয়ো! যা নয় তাই!
কীসের লোভ সুন্দরবাবু?
ওই অমর-লতার লোভ আর কি! ভেবেছিলুম দু-একটা অমৃত-ফল খেয়ে যমকে কলা দেখাব। কিন্তু এখন যতই ভেবে দেখছি ততই হতাশ হয়ে পড়ছি। আমরা ছুটেছি মরীচিৎকার। পেছনে, কেবল কাদা ঘেঁটেই ফিরে আসতে হবে।
তাহলে আপনি কেবল অমর হওয়ার লোভেই বিমলবাবুদের অতিথি হয়েছেন?
না বলি আর কেমন করে? অমর হতে কে না চায়?
অমর হওয়ার বিপদ কত জানেন?
বিপদ।
হ্যাঁ। দু-একটার কথা বলি শুনুন। ধরুন, আপনি অমর হয়েছেন। তারপর কুমারবাবুর কুকুর বাঘা হঠাৎ পাগলা হয়ে গিয়ে আপনাকে কামড়ে দিল। তখন কি হবে?
হুম, কি আবার হবে? আমি হাইড্রোফোবিয়া রোগের চিকিৎসা করাব!
চিকিৎসায় রোগ যদি না সারে, তাহলে? আপনি অমর, সুতরাং মরবেন না। কিন্তু সারাজীবন–অর্থাৎ অনন্তকাল আপনাকে ওই বিষম রোগের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে। অর্থাৎ সারাজীবন চেঁচিয়ে মরতে হবে পাগলা কুকুরের মতন ঘেউ-ঘেউ করে!
তাই তো হে, এসব কথা তো আমি ভেবে দেখিনি!
তারপর শুনুন। আপনি অমর হলেও আপনার দেহ বোধকরি অস্ত্রে অকাট্য হবে না। কেউ যদি খাঁড়া দিয়ে আপনার গলায় এক কোপ বসিয়ে দেয়, তাহলে কি মুশকিল হতে পারে ভেবে দেখেছেন কি? আপনি অমর। অতএব হয় আপনার মুণ্ড, নয় আপনার দেহ, নয়তো ও-দুটোই চিরকাল বেঁচে থাকবে। কিন্তু সেই কন্ধকাটা দেহ আর দেহহীন মুণ্ড নিয়ে আপনি অমরতার কি সুখ ভোগ করবেন?
মানিক, তুমি কি ঠাট্টা করছ?
মোটেই নয়। অমর হওয়ার আরও সব বিপদের কথা শুনতে চান?
না, শুনতে চাই না। তুমি বড্ড মন খারাপ করে দাও। অমৃত-ফল পেলেও আমি আর খেতে পারব কিনা সন্দেহ।
জয়ন্ত এতক্ষণ কেতাবের আড়ালে মুখ লুকিয়ে হাসছিল। এখন কেতাব সরিয়ে বলল, সুন্দরবাবু, অমৃত-দ্বীপের কথা হয়তো রূপকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আজকের শুকনো বৈজ্ঞানিক জগতে সরস রূপকথার বড়ই অভাব হয়েছে। সেই অভাব পূরণের কৌতূহলেই আমরা বেরিয়েছি অমৃত-দ্বীপের সন্ধানে। সুতরাং অমর-লতা না পেলেও আমরা দুঃখিত হব না। অন্তত যে-কদিন পারি রূপকথার রঙিন কল্পনায় মনকে স্নিগ্ধ করে তোলবার অবকাশ তো পাব। আর ওরই মধ্যে থাকবে যেটুকু অ্যাডভেঞ্চার, সেটুকুকে মস্ত লাভ বলেই মনে করব!
এমন সময়ে একজন নাবিক এসে খবর দিল, বিমল সবাইকে এখনি ডেকের ওপরে যেতে বলেছে।
সকলে ওপরে গিয়ে দেখলে, ডেকের রেলিংয়ের ওপরে ঝুঁকে বিমল দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার চোখে দূরবিন।
জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করলে, বিমলবাবু কি আমাদের ডেকেছেন?
বিমল ফিরে বললে, হ্যাঁ জয়ন্তবাবু! পশ্চিম দিকে তাকিয়ে দেখুন।
পশ্চিম দিকে চেয়েই জয়ন্ত দেখতে পেলে, একখানা জাহাজ তাদের দিকে বেগে এগিয়ে আসছে।
বিমল বললে, আমি খুব ভোরবেলা থেকেই ও-জাহাজখানাকে লক্ষ করছি। প্রথমটা ওর ওপরে আমার সন্দেহ হয়নি। কিন্তু তারপরে বেশ বুঝলুম, ও আসছে আমাদেরই পেছনে। জানেন তো, এখানকার সমুদ্রে চিনে-বোম্বেটেদের কীরকম উৎপাত! খুব সম্ভব, আমাদের শত্রুরা কোনও বোম্বেটে জাহাজের আশ্রয় নিয়েছে। দূরবিন দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ও-জাহাজখানায় লোক আছে অনেক–আর অনেকেরই হাতে রয়েছে বন্দুক। আমাদের কাপ্তেন-সায়েবের সঙ্গে আমি আর কুমার পরামর্শ করেছি। কাপ্তেন বললেন, জলে ওরা আক্রমণ করলে আমাদের পক্ষে আত্মরক্ষা করা সহজ হবে না।
তাহলে উপায়?
দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে দেখুন।
দক্ষিণ দিকে মাইল দুয়েক তফাতে রয়েছে ছোট্ট একটি তরুশ্যামল দ্বীপ।
আমরা আপাতত ওই দ্বীপের দিকেই যাচ্ছি। আশাকরি শত্রুদের জাহাজ আক্রমণ করবার আগেই আমরা ওই দ্বীপে গিয়ে নামতে পারব। তারপর পায়ের তলায় থাকে যদি মাটি, আর একটা যুতসই স্থান যদি নির্বাচন করতে পারি, তাহলে এক হাজার শত্রুকেও আমি ভয় করি না। আপনার কি মত?
জয়ন্ত বললে, বিমলবাবু, এ অভিযানের নায়ক হচ্ছেন আপনি। আমরা আপনার সহচর মাত্র। আপনার মতই আমাদের মত।
সুন্দরবাবু নীরস স্বরে বললেন, তাহলে সত্যি-সত্যিই আমাদের যুদ্ধ করতে হবে?
কুমার বললে, তা ছাড়া আর উপায় কি? বিনা যুদ্ধে ওরা আমাদের মুক্তি দেবে বলে বোধহয় না। তবে আশার কথা এই যে, আমরা ওদের আগেই ডাঙায় গিয়ে নামতে পারব।
সুন্দরবাবু বিষণ্ণভাবে বললেন, এরমধ্যে আশা করবার মতো কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছি না। ওই চিনে বোম্বেটে-বেটারাও তো দলে-দলে ডাঙায় গিয়ে নামবে?
ভুলে যাবেন না, আমরা থাকব ডাঙায়, গাছপালা বা ঢিপিঢ়পা বা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে। আমাদের এই অটোমেটিক বন্দুকগুলোর সুমুখ দিয়েই নৌকোয় করে ওদের ডাঙার ওপরে উঠতে হবে। আমাদের এক-একটা অটোমেটিক বন্দুক প্রতি মিনিটে কতগুলি বৃষ্টি করতে পারে জানেন তো? সাতশো! আধুনিক বিজ্ঞানের অদ্ভুত মারণাস্ত্র!
সুন্দরবাবু ভয়ে-ভয়ে বললেন, কিন্তু এভাবে মানুষ খুন করে শেষটা আইনের পাকে আমাদেরও বিপদে পড়তে হবে না তো?
কুমার হেসে বললে, সুন্দরবাবু, এ জায়গা হচ্ছে অরাজক। এই বোম্বেটেদের জল-রাজ্যে একমাত্র আইন হচ্ছে–হয় মারো, নয় মরো।
সুন্দরবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, হুম্!
বিমল তখন আবার চোখে দুরবিন লাগিয়ে শত্রু-জাহাজের গতিবিধ লক্ষ করছিল। কিন্তু সে জাহাজ তখন এত কাছে এসে পড়েছে যে আর দূরবিনের দরকার হয় না। খালি চোখেই বেশ দেখা যাচ্ছে, তার ডেকের ওপরে দলে-দলে চিনেম্যান ব্যস্ত, উত্তেজিতভাবে এদিকে-ওদিকে আনাগোনা বা ছুটোছুটি করছে!
