মহারাজা ঘাড় নেড়ে তারিফ করে বললেন, আ-হা-হা-হা! সাধু, সাধু, খাসা গলা! না ভোম্বল?
ভোম্বল বললে, খাসা!
পণ্ডিত তার দুই গালে হাত বুলোতে-বুলোতে বললে, মহারাজ, এ গানে আমি আপত্তি করি।
মহারাজা বললেন, না তুমি আপত্তি করবে না। তুমি কোথায় আপত্তি করবে, আমি বলে দেব।
পণ্ডিত বললে, মহারাজ, ও গান আমাকে লক্ষ করে লেখা হয়েছে।
মহারাজা বললেন, তুমি কি নিজেকে জুজুবুড়ো বলে মানো?
পণ্ডিত বললে, না, আমি মানি না।
মহারাজা বললেন, তাহলে ও-গানে তুমি আপত্তি করতে পারো না। ওটা জুজুবুড়োর গান। না অমলা?
আমি বললুম, আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ!
ভোম্বল বললে, মহারাজ, রাজকার্যে বেলা বাড়ছে। আমার খিদে পেয়েছে।
মহারাজা বললেন, ভোম্বলের খিদে পেয়েছে। আমি আর দেরি করতে পারি না। অমলা! পণ্ডিত! তাহলে আমার আজ্ঞা শোন! তোমরা দুজনেই গুরুতর অপরাধ করেছ। তোমাদের দুজনেরই প্রাণদণ্ড হবে। মন্ত্রিগণ! এখন কার প্রাণদণ্ড আগে হবে, সেটা তোমরাই স্থির করো। কিন্তু বেশি দেরি কোরো না। ভোম্বলের খিদে পেয়েছে।
মন্ত্রিগণ বেশি দেরি করলেন না। বললেন, অমলার অপরাধ গুরুতর। আগে ওরই প্রাণদণ্ড হওয়া উচিত।
মহারাজা বললেন, এইজন্যেই তো মন্ত্রীগণের দরকার! কত তাড়াতাড়ি কাজ হয়ে গেল! অমলা! মন্ত্রীগণের কথা স্বকর্ণে শ্রবণ করলে তো? অগ্রে তোমারই প্রাণদণ্ড হবে। পণ্ডিত! তুমি অমলাকে ওই টেবিলটার ওপরে শুইয়ে ওর দেহ লম্বালম্বি ভাবে কর্তন করো!
আমি চক্ষে সর্ষের ফুল দেখতে লাগলাম! যেমন হবুচন্দ্র রাজা, তেমনি গবুচন্দ্র মন্ত্রি! এখন উপায়? অত্যন্ত অসহায় ভাবে ডোম্বলের দিকে তাকালুম।
ভোম্বল দন্তবিকাশ করে কী যেন ইশারা করতে লাগল।
তার ইশারায় একটা কথা আমার মনে পড়ে গেল। তাড়াতাড়ি ভিতরকার জামার পকেটে হাত দিয়ে দেখি সেখানে নলচেটা এখনও আছে!
মহারাজ বললেন, অমলা! তোমার বোধহয় আর কিছু বলবার নেই?
আমি বললুম, মহারাজ! আমার আর দুটো কথা বলবার আছে।
মহারাজা বললেন, তাড়াতাড়ি বলো। ভোম্বলের খিদে পেয়েছে!
আমি বললুম, মহারাজ! আমার প্রথম কথা হচ্ছে, আপনি আমাকে অমলা বলে ডাকতে পারবেন না। আমার দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমার প্রাণদণ্ডের হুকুম আপনাকে নাকচ করতে হবে।
মহারাজা বললেন, আমি যদি তোমার ও-দুটো কথা না শুনি?
পকেট থেকে নলচে বার করে মহারাজার মাথার কাছে ধরে আমি বললুম, তাহলে এখনই আমি নলচে ছুড়ব।
মহারাজা ব্যস্ত হয়ে হাঁক দিলেন, প্রহরী! প্রহরী!
আমি বললুম, প্রহরীরা এদিকে আসবার আগেই এ রাজ্যের সিংহাসন খালি হবে!
মহারাজা বললেন, প্রহরীগণ! তোমরা শীঘ্র বিদায় হও, এদিকে এসো না–খবরদার!
ভোম্বল বললে, মহারাজ! আমার খিদে পেয়েছে।
মহারাজা বললেন, আচ্ছা, তোমাকে আর অমলা বলে ডাকব না। তোমার প্রাণদণ্ডও হবে না।
নলচে নামিয়ে আমি বললুম, মহারাজের জয় হোক!
মহারাজা বললেন, কিন্তু প্রাণদণ্ডের বদলে তোমাকে নির্বাসনদণ্ড দিলুম। তুমি এ রাজ্যে থাকবার উপযুক্ত নও। ভোম্বলের খিদে পেয়েছে। অতএব সভা ভঙ্গ হোক।
.
সপ্তদশ । আমার নির্বাসন
দলে দলে পিপে-প্রহরী চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেললে এবং আমার হাত থেকে নলচেটা কেড়ে নিলে।
তারপর রাজপথ দিয়ে আমাকে নিয়ে চলল।
যেদিকে তাকাই সেইদিকেই দেখি, পিলপিল করে পিপের দল ছুটে আসছে। পুরুষ-পিপে, মেয়ে-পিপে, খোকা-পিপে, খুকু-পিপে! এ দেশে এত পিপে-মানুষ আছে, আমি তা কল্পনাও করতে পারিনি।
প্রত্যেক পিপেই আমার ওপরে মারমুখো হয়ে আছে। তাদের মহারাজের বিরুদ্ধে আমি যে নলচে ধরে দাঁড়িয়েছি, একথা বোধহয় দিকে দিকে রটে গেছে! পদে-পদে আমার ভয় হতে লাগল–এই বুঝি তারা আমাকে আক্রমণ করতে আসে। কিন্তু তারা আক্রমণ করলে না, সকলে মিলে কেবল আমাকে ভয়ানক বিশ্রী মুখ ভ্যাংচাতে লাগল।
মহারাজার চাকা-গাড়ি আমার পাশ দিয়ে চলে গেল। মহারাজ আমার দিকে ফিরেও তাকালেন না, কিন্তু তার পাশে বসে ভোম্বলদাসও আমাকে যাচ্ছেতাই মুখ ভ্যাংচাতে ভ্যাংচাতে গেল।
আমি চিৎকার করে ডাকলুম–মহারাজা! মহারাজা!
মহারাজার চাকা-গাড়ি থামল। গাড়ির ওপরে ফিরে বসে মহারাজা বললেন, আমাকে পিছু ডাকলে কেন? কী ব্যাপার!
আমি বললুম, একটা নালিশ আছে।
আবার কীসের নালিশ?
ভোম্বল আমাকে মুখ ভ্যাংচাচ্ছে।
মহারাজা আমার দিকে সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বললেন, তোমার কাছে সেই নলচেটা নেই তো?
আমি বললুম, না মহারাজ, প্রহরীরা সেটা কেড়ে নিয়েছে।
মহারাজা বললেন, তাহলে ভোম্বল অনায়াসেই তোমাকে মুখ ভ্যাংচাতে পারে। খিদে পেলে ভোম্বল আমাকেও মুখ ভ্যাংচায়! না ভোম্বল?
ভোম্বলদাস আবার আমাকে মুখ ভ্যাংচাতে-ভ্যাংচাতে বলে, আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ! কিন্তু ওই যাঃ! ভারি ভুল হয়ে গেল তো!
মহারাজা ভয়ানক চমকে উঠে বললেন, অ্যা বলো কী ভুল হয়ে গেছে? কী ভুল?
ভোম্বল বললে, মহারাজ, পণ্ডিতের প্রাণদণ্ডটা তো হল না!
মহারাজা একগাল হেসে বললেন, ওঃ, এই ভুল? তার জন্যে আর ভাবনা কী? পণ্ডিতও তো আর নির্বাসনে যাচ্ছে না, আগে তোমার খিদে ঠান্ডা হোক, তারপর তাকে ধরে এনে প্রাণদণ্ড দিলেই হবে! গাড়োয়ানগণ! গাড়ি চালাও!
মহারাজার চাকা-গাড়ি বোঁ-বোঁ করে চোখের আড়ালে মিলিয়ে গেল!
.
প্রহরীরা একখানা কাপড়ে আমার চোখ বেঁধে দিলে। এ রাজ্যে আসবার পথ-ঘাট পাছে আমি চিনে রাখি, বোধহয় সেইজন্যেই এই ব্যবস্থা!
