একদিন একরাত পরে এক জায়গায় এসে তারা আমার চোখের বাঁধন খুলে দিলে। চেয়ে দেখি, আমি আবার জুজু-পাহাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে আছি!
প্রহরীরা সবাই হাত তুলে কড়া গলায় বললে–বিদেয় হও!
হঠাৎ প্রহরীদের পিছনে আমার চোখ গেল।
দেখি একটা গুহার সামনে ম্লানমুখে দাঁড়িয়ে আছে কমলা।
প্রহরীরা বললে, এখনও গেলে না? যাও বলছি!
বিমর্ষ প্রাণে চলে এলুম। মনে হল, আমার বোনকে আমি পিছনে ফেলে রেখে যাচ্ছি। মন কাঁদতে লাগল।
অমৃত-দ্বীপ (উপন্যাস)
গোড়াপত্তন
গোড়ায় একটুখানি গৌরচন্দ্রিকার দরকার। যদিও অমৃত-দ্বীপ নতুন উপন্যাস, তবু এর কাহিনি আরম্ভ হয়েছে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন নামে উপন্যাস থেকে। বিমল, কুমার, জয়ন্ত, মানিক ও ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু কয়েকটি রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের তদ্বিরে নিযুক্ত হয়ে তাও ধর্মমতের প্রবর্তক প্রাচীন চিনা সাধক লাউ-জুর জেড পাথরে গড়া একটি ছোট প্রতিমূর্তি এবং অমৃত-দ্বীপে যাওয়ার একখানি ম্যাপ হস্তগত করে। খ্রিস্ট জন্মাবার ছয়শত চার বৎসর আগে চিনদেশে লাউ-জুর আবির্ভাব হয়।
চিনদেশের প্রাচীন পুথিপত্রে প্রকাশ, তাও সাধুদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি দ্বীপ আছে, তার নাম অমৃত-দ্বীপ। সেখানে সিয়েন অর্থাৎ অমররা বাস করে। সেখানে অমর লতা জন্মায়, তার অমৃত-ফল ভক্ষণ করলে মানুষও অমর হয়। যারা তাও ধর্ম গ্রহণ করে তাদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, অমৃত-দ্বীপে যাওয়া। আর, সেখানে গেলে লাউ-জুর মন্ত্রপূত প্রতিমূর্তি সঙ্গে থাকা চাই।
বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের মতন তাও-ধর্মও পরের যুগে ভিন্ন রূপ ধারণ করে। তার মধ্যে ক্রমেই ভূত-প্রেত, মন্ত্র-তন্ত্র, ঝাড়-ফুক আর হরেক রকম ম্যাজিকের আবির্ভাব হয়। তাও সাধকরা বলে, তাদের সিদ্ধপুরুষরা কেবল অমরই হয় না, জলে-স্থলে-শূন্যে তাদের গতি হয় অবাধ।
আধুনিক যুগে এ-সব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয় বটে, কিন্তু চিনাদের পবিত্র পাহাড় থাইসানে-র তলদেশে অবস্থিত থাইআনফু মন্দিরে গিয়ে এক সমাধিমগ্ন তাও সিদ্ধপুরুষকে দেখে রিচার্ড উইলহেলম্ নামে এক জার্মান সাহেব সবিস্ময়ে লিখেছেন, এই সমাধিস্থ তাও সাধক মৌনব্রতী। তিনি কতকাল খাদ্য আর পানীয় গ্রহণ করেননি। বাইরের কোনও কিছুই তার ধ্যান ভঙ্গ করতে পারে না। তার দেহ শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে গেছে, দেখতেও তাকে মড়ার মতো, কিন্তু তার দেহ সম্পূর্ণ তাজা, একটুও পচে যায়নি। (The Soul of China নামক গ্রন্থ দ্রষ্টব্য)।
অমৃত দ্বীপের পাঠকদের পক্ষে এইটুকু তথ্যই যথেষ্ট। যাঁদের আরও কিছু জানবার আগ্রহ আছে তারা ড্রাগনের দুঃস্বপ্ন পড়ে দেখবেন।
.
প্রথম পরিচ্ছেদ। শত্রুর ওপরে শত্রু
জাহাজ ভেসেছে নীল জলে। এ জাহাজ একেবারেই তাদের নিজস্ব। অমৃত-দ্বীপে যাওয়ার সমস্ত জলপথটাই তাদের ম্যাপে আঁকা ছিল। সেই ম্যাপ দেখেই বোঝা যায়, কোনও বাণিজ্য-তরী বা যাত্রী-জাহাজই ও-দ্বীপে গিয়ে লাগে না, চার্টে ও-দ্বীপের কোনও উল্লেখই নেই।
কাজেই বিমল ও কুমারের প্রস্তাবে একখানা গোটা জাহাজই চার্টার বা ভাড়া করা হয়েছে। এটাও তাদের পক্ষে নতুন নয়। কারণ এইরকম একখানা গোটা জাহাজ ভাড়া করেই তারা আর একবার লিস্ট আটলান্টিস্-কে পুনরাবিষ্কার করেছিল। (নীলসায়রের অচিন পুরে নামক উপন্যাস দ্রষ্টব্য।)।
জয়ন্ত, মানিক ও সুন্দরবাবুর এ অভিযানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। বিমল ও কুমার একরকম জোর করেই তাদের সঙ্গে টেনে এনেছে।
কাজে কাজেই তাদের পুরাতন ভৃত্য ও দস্তুরমতো অভিভাবক রামহরিও যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করেও অন্যান্য বারের মতো এবারেও শেষপর্যন্ত সঙ্গ নিতে ছাড়েনি।
এবং এমন ক্ষেত্রে তাদের চির-অনুগত চতুষ্পদ যোদ্ধা বাঘাও যে সঙ্গে-সঙ্গে লাঙুল আস্ফালন করে আসতে ছাড়বে না, সেকথা বলাই বাহুল্য।
তাদের পুরাতন দলের মধ্যে কেবল বিনয়বাবু আর কমলকে এবারে সঙ্গীরূপে পাওয়া গেল না। বিনয়বাবু এখন ম্যালেরিয়ার তাড়নায় কুইনিন ও আদার কুচির সদ্ব্যবহারে ব্যস্ত এবং কমল দেবে এবার মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষা।
জাহাজখানির নাম লিটল ম্যাজেস্টিক। আকারে ছোট হলেও যাত্রীদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে এর মধ্যে চমৎকার সাজানো-গোছানো লাউঞ্জ ডাইনিং সেলুন, প্রমেনেড ডেক ও পাম কোট প্রভৃতিরও অভাব ছিল না। এরকম জাহাজ চার্টার করা বহুব্যয়সাধ্য বটে, কিন্তু বিমল ও কুমার যে অত্যন্ত ধনবান একথা সকলেই জানেন। তার ওপরে জয়ন্তও বিনা পয়সার অতিথি হতে রাজি হয়নি এবং সে-ও রীতিমতো ধনী ব্যক্তি।
জাহাজ তখন টুংহাই বা পূর্বসাগর প্রায় পার হয়ে রিউ-কিউ দ্বীপপুঞ্জের কাছ দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
ওপরে, নীচে চারিদিকে ছড়িয়ে আছে কেবল অনন্ত নীলিমা কাছে চঞ্চল, দূরে প্রশান্ত।
এই নীলিমার জগতে এখন নতুন বর্ণ সৃষ্টি করছে নিম্নে শুধু শুভ্র ফেনার মালা এবং শুন্যে শুভ্র সাগর-বিহঙ্গের দল। প্রকৃতির রঙের ডালায় এখন আর কোনও রং নেই।
প্রাকৃতিক সংগীতেও এখানে নব-নব রাগিণীর ঝংকার নেই। না আছে উচ্ছ্বসিত শ্যামলতার মর্মর, না আছে গীতকারী পাখিদের সুরের খেলা, বইছে কেবল হু-হু শব্দে বাতাস এবং জাগছে কেবল আদিম সাগরের উচ্ছল কলকল মন্ত্র–এ দুই ধ্বনির সৃষ্টি পৃথিবীর প্রথম যুগে, যখন সবুজ গাছ আর গানের পাখির জন্মই হয়নি।
