ভোম্বল বললে, সত্যিই তো! তবে আপনি কীসের মহারাজা?
পণ্ডিত বললে, মহারাজা! আমি বিচার প্রার্থনা করি।
মহারাজা বললেন, বিচার? তুমি প্রার্থনা করো? ওহে ভোম্বল, পণ্ডিতটা যে বিচার প্রার্থনা করে! বেশ, আমি বিচার করব। ভোম্বলদাস, তুমি মন্ত্রীদের আসতে হুকুম দাও। আজ এখানেই আমার বিচারসভা বসবে। ভৃত্য! আমার রাজদণ্ড আনয়ন করো।
.
ষোড়শ । মহারাজের বিচার
রাজদণ্ড হাতে নিয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে মহারাজা বললেন, পণ্ডিত! এই সেকেলে মানুষটার দেহ কেন তুমি লম্বালম্বি ভাবে কর্তন করতে চাও, সেকথা আমার নিকটে যথাবিহিত সম্মানসহকারে নিবেদন করো।
পণ্ডিত বললে, আজ্ঞে, আমাদের চেয়েও একেলে মানুষ সৃষ্টি করব বলে।
মহারাজ ভুরু কুঁচকে বললেন, আমাদের চেয়েও আধুনিক? তবে কি তুমি বলতে চাও যে, আমরা ক্রমেই প্রাচীন হয়ে পড়ছি?
আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ! আমার তাই বিশ্বাস। মনে করে দেখুন মহারাজ, আমাদের চেয়েও একেলে মানুষদের মধ্যে সর্বপ্রথম মানুষ হত ওই অমল! এ একটা কত বড় সম্মান! আমি ওকে হত্যা করতুম না, খুব আস্তে-আস্তে একটু-একটু করে ওর দেহটাকে জ্যান্ত অবস্থাতেই লম্বালম্বি ভাবে কাটতুম। এ কাজে কুড়ি দিনের বেশি সময় লাগত না। ভেবে দেখুন মহারাজ আমার উদ্দেশ্য কত সাধু!
মহারাজা মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, হ্যাঁ, তোমার উদ্দেশ্য যে সাধু, সে বিষয়ে কোনওই সন্দেহ নেই। অমলা, তুমি পণ্ডিতদের সাধু উদ্দেশ্যে বাধা প্রদান করতে গিয়েছিলে কেন?
আমি বললুম, না মহারাজ, পণ্ডিতকে আমি বাধা দিইনি–আমি কেবল আত্মরক্ষা করেছিলুম। ওঁর মনকে খুশি রাখবার জন্যে বিশ দিন ধরে জ্যান্ত অবস্থায় একটু-একটু করে কচুকাটা হব, অথচ টু শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করব না, এই কি আপনার আদেশ মহারাজ?
মহারাজা বললেন, না, এমন অন্যায় আদেশ কদাপি আমি প্রচার করি না!
আমি বললুম, তারপর আর একটা কথা মহারাজ বিচার করে দেখুন। আপনাকে আগে জানিয়ে পণ্ডিত যদি আমার ওপরে ছুরি চালাত, তাহলে কখনওই আমি আত্মরক্ষার চেষ্টা করতুম। না, কিন্তু পণ্ডিত আপনার একটু হুকুম পর্যন্ত নেয়নি। এটা কি অপরাধ নয়?
মহারাজা বললেন, অপরাধ নয় আবার? মহাগুরুতর অপরাধ! ভৃত্য! আমার আইন পুস্তকের পঞ্চম খণ্ড আনয়ন করো! দেখি, এটা কত ধারার অপরাধ!
আইনের বই এল। মহারাজ পাতা উলটে বললেন, এই যে! এটা সাতশো সাতাশ ধারার অপরাধ! এর শাস্তি–প্রাণদণ্ড। পণ্ডিত! তোমার প্রাণদণ্ড হবে!
পণ্ডিত ভয়ে কাঁপতে-কাঁপতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে বললে, মহারাজ, রক্ষা করুন! প্রাণদণ্ড দিলে আমি আর কিছুতেই বাঁচব না! এখনও আপনি সব কথা শোনেননি! ওই সেকেলে মানুষটা আমার মেয়েকে আমার অবাধ্য করে তুলেছে,
মহারাজা শিউরে উঠে বললেন, আঁ, বলো কী? মেয়েকে পিতার অবাধ্য করে তোলা। এ যে সাতশো ধারার চেয়েও গুরুতর অপরাধ! অমলা! তোমার কি কিছু বক্তব্য আছে?
আমি মনে-মনে প্রমাদ গুনে বললুম, আছে মহারাজ! আগে আপনি গোড়া থেকে সব কথা শুনুন। কাল যখন আমি বসে-বসে বাজনা বাজাচ্ছিলুম–
মহারাজা বললেন, বটে, বটে, বটে! তুমি বাজনা বাজাতে পারো?
পারি মহারাজ!
তুমি গান গাইতে পারো?
পারি মহারাজ!
বটে, বটে, বটে! একটা গান আমাকে শোনাও না!
আমি দুই হাতজোড় করে বললুম, কিন্তু মহারাজ, আমি হচ্ছি ওস্তাদ লোক। তবলা বাঁয়ার সঙ্গত না থাকলে কেমন করে গান গাইব?
মহারাজা ব্যস্তসমস্ত হয়ে আদেশ দিলেন–ভৃত্য? তবলা-বাঁয়া আনয়ন করো!
ভোম্বলদাস তাড়াতাড়ি মহারাজের কানে-কানে কী বললে, মহারাজা সব শুনে আমার দিকে ফিরে বললেন, অমলা! এটা হচ্ছে অস্ত্রোপচারের গৃহ–এখানে তবলা-বাঁয়া থাকে না। এখন উপায়?
আমি বললুম, উপায় আছে মহারাজ! পণ্ডিতমশাইয়ের গাল দুখানা দিব্যি চ্যাটালো। ওঁকে আমার কাছে আসতে হুকুম দিন। তবলা-বাঁয়ার অভাবে আমি ওঁর দুটো গাল দু-হাতে বাজিয়ে তাল রেখে গান গাইতে পারব।
পণ্ডিত বললে, মহারাজ, আমি এ প্রস্তাব সমর্থন করি না।
মহারাজা প্রকাণ্ড এক ধমক দিয়ে বললেন, পুনরায় তুমি বাঁচালতা প্রকাশ করছ? অমলার ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাব তোমাকে সমর্থন করতেই হবে! যাও অমলার কাছে!
পণ্ডিত নিরুপায় হয়ে ভয়ে-ভয়ে আমার কাছে এসে দাঁড়াল। কিন্তু যেই আমি হাত তুলে তার গালে চপেটাঘাত করতে যাব, অমনি সে মুখ সরিয়ে নিলে! আর একবার চেষ্টা করেও বিফল হয়ে আমি বললুম, মহারাজ, পণ্ডিতমশাই তাঁর গাল বাজাতে দিচ্ছেন না!
মহারাজা বললেন, বটে, বটে, বটে! প্রহরীগণ! দুষ্ট পণ্ডিতকে তোমরা ধৃত করো!
প্রহরীরা তখন এসে পণ্ডিতকে আষ্টেপৃষ্টে চেপে ধরলে এবং আমিও দুই হাতে মনের সাধে তালে তালে তার দুই গালে চড় মারতে মারতে গান ধরলুম–
জুজুবুড়ির দেশে এসে।
দেখেছি এক জুজুবুড়ো,
মামদো-ভূতের সমন্ধী সে,
হামদো-মুখোর বাবা-খুড়ো–
দেখেছি এক জুজুবুড়ো।
চোখদুটো গোল পানের ডিপে,
পেটের ওপর একটা পিপে,
বাক্যিগুলি মিষ্টি কত?
ঠিক যেন ভাই লঙ্কাগুঁড়ো–
দেখেছি এক জুজুবুড়ো।
করলে আদর ধমকে ওঠেন,
ধরলে গীতি চমকে ছোটেন,
থমকে হঠাৎ পটকে লোঠেন–
মেজাজটি তাঁর উড়ো-উড়ো–
দেখেছি এক জুজুবুড়ো।
তিনি যদি আসেন কাছে,
দৌড়ে চোড়ো শ্যাওড়া-গাছে,
ওপর থেকে থুতু দিয়ো,
কিংবা ছেঁড়া জুতো ছুড়ো–
দেখেছি এক জুজুবুড়ো।
