কে একজন হোমরা-চোমরার মতন ভারিক্তে গলায় বলে উঠল, এসব কাণ্ডের অর্থ কী?
পণ্ডিত পরিত্রাহি চিৎকার করে বললে, মহারাজ, রক্ষা করুন! মহারাজ, রক্ষা করুন।
মহারাজ? ফিরে দেখি ভোম্বলদাসের চেয়েও ঢের মোটা আর ডাগর একটা পিপে– যে-রকম পিপেতে আমাদের দেশে সিমেন্ট রাখা হয় তার চেয়েও বড়! তার গালদুটো লাউয়ের মতন ফোলা-ফোলা এবং তার গোঁফজোড়া এত লম্বা যে ঠোঁটের দুপাশ দিয়ে ঝুলে পড়েছে। এই হল এদের মহারাজের মূর্তি?
মহারাজার মস্তবড়ো ঢাকের মতন মুখের ভিতর থেকে ট্যাপারির মতন দুটো ছোট্ট চোখ কোটরের ভিতর থেকে প্রায় একহাত বাইরে বেরিয়ে এসে আমাকে দুই মিনিট ধরে ঘুরে-ফিরে নিরীক্ষণ করলে। তারপর চোখদুটোকে আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে এসে মহারাজা আমাকে সম্বোধন করে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, তুমি পাগল নও তো? তোমাকে দর্শন করে আমার কিন্তু তাই বিবেচনা হচ্ছে।
আমি এত দুঃখেও হেসে ফেলে বললুম, আজ্ঞে না মহারাজ! আমি এখনও পাগল হতে পারিনি। তবে শীঘ্রই হতে পারব বলে আশা রাখি।
মহারাজা দুলতে-দুলতে বললেন, শুনে সুখী হলুম। যাদের পাগল হবার আশা নেই, তারা অতিশয় অভাগা!…উঃ, বড় হাঁপিয়ে পড়েছি, ভারি জল-তেষ্টা! ভৃত্য! সুশীতল বারি আনয়ন করো!
ভৃত্য জল এনে দিলে। মহারাজ ঢকঢক করে জলপান করে ঊর্ধ্বমুখে বললেন, আঃ! এইবারে রাজকার্য! ওহে ভোম্বলদাস, তুমি এই বিদেশি লোকটির কথাই না আমার কাছে উত্থাপন করেছিলে? হুঁ। ওর নাম কী?
ভোম্বল আমার দিকে চেয়ে দন্তবিকাশ করে বললে, অমলা।
আমি বললুম, আজ্ঞে না মহারাজ। আমার নাম অমলা নয়, অমল।
মহারাজা আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন, চুপ করো। তোমার অপেক্ষা ভোম্বলদাসকে আমি বেশি চিনি। তোমার কী নাম হওয়া উচিত, তোমার চেয়ে ভোম্বলদাস তা বেশি জানে! তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে, তোমার নাম অমলা!…উঃ ভয়ংকর গ্রীষ্ম, ঘর্মে প্লাবিত হয়ে গেলুম যে! ভৃত্য! শীঘ্র ব্যজনী আনয়ন করো!
দু-দিকে দুটো পিপে এসে তালপাতার পাখা নেড়ে মহারাজের মাথা ও গতর ঠান্ডা করতে লাগল।
খানিকক্ষণ বায়ুসেবন করে একটু ধাতস্থ হয়ে মহারাজা আবার দুলতে দুলতে বললেন, হ্যাঁ, ভালো কথা! আচ্ছা অমলা, তুমি এতক্ষণ কী করছিলে? পণ্ডিতের সামনে দাঁড়িয়ে কি যুদ্ধের নৃত্য দেখাচ্ছিলে? ও নৃত্যটি আমার অত্যন্ত উত্তম লেগেছে। আর-একবার ওই নৃত্যটি আরম্ভ হোক!
আমি হাতজোড় করে বললুম, আজ্ঞে না মহারাজ! কী করে অস্ত্রচিকিৎসা করতে হয়, পণ্ডিতকে আমি দেখিয়ে দিচ্ছিলুম!
মহারাজ গর্জন করে বললেন, কী! তুমি কি অবগত নও যে, এ রাজ্যে অস্ত্রচিকিৎসা নিষিদ্ধ? আমরা কবিরাজি ঔযধ ছাড়া আর কিছু সেবন করি না? তার চেয়ে পণ্ডিতকে তুমি বিষ-বড়ি ভক্ষণ করতে দিলে না কেন?
আমি আবার হাতজোড় করে বললুম, আজ্ঞে, বিষ-বড়ির কথা আমার মনে ছিল না। তাহলে সেই ব্যবস্থাই করতুম।
পণ্ডিত কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু মহারাজা দু-চোখ রাঙিয়ে এক ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, স্তব্ধ, হও! বৃদ্ধ, তুমি কি অবগত নও, আমি সম্বোধন না করলে আমার নিকটে কেউ বাক্য উচ্চারণ করতে পারবে না? উঃ, ভীষণ কান চুলকোচ্ছে, গেলুম যে! ভৃত্য! কান-খুশকি আনয়ন করো।
কান-খুশকি এল। মহারাজ দু-চোখ বুজে খুব আরাম করে পাঁচ মিনিট কান চুলকোলেন। তারপর সহসা দুই চোখ চেয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, অতঃপর?
আমি বললুম, মহারাজ, আপনি বোধহয় জানেন না যে, এই পণ্ডিত আজ ছুরি দিয়ে লম্বালম্বি ভাবে আমার দেহকে ফালাফালা করবার চেষ্টা করছিল!
মহারাজা ভয়ানক চটে উঠে বললেন, কী? তোমাকে আমার কাছে হাজির না করেই?
আজ্ঞে হ্যাঁ মহারাজ! পণ্ডিত বলে সে বিজ্ঞানের মর্যাদা রাখবে, আপনার মর্যাদা রাখবে না।
মহারাজা দুই চক্ষু ছানাবড়া করে বললেন, অ্যাঁ! অ্যাঁ! এত বৃহৎ কথা! আমার মর্যাদা রাখবে না? উঃ, মস্তক বেজায় ঘূর্ণায়মান হচ্ছে–বোঁ-বোঁ-বো! ভৃত্য! অবিলম্বে আমার শিরোঘূর্ণন বন্ধ করো!
পিপের একমুখে মহারাজের গোল মাথাটা চরকির মতন এমন বনবন করে ঘুরছিল যে তাঁর চোখ-নাক-ঠোঁট কিছুই দেখা যাচ্ছিল না! ভৃত্য তাড়াতাড়ি ছুটে এসে মাথাটা প্রাণপণে। চেপে ধরে তার ঘুরুনি বন্ধ করে দিলে।
খানিকক্ষণ হাঁপাতে-হাঁপাতে দম নিয়ে মহারাজা বললেন, দুরাচার পণ্ডিত! আমার হুকুম না নিয়েই আবার তুমি লম্বালম্বি ভাবে মানুষের দেহ কর্তন করতে চাও? ভোম্বলদাস! সেবারের সেই কাণ্ডকারখানার কথা তোমার মনে আছে?
ভোম্বল চোখ পাকিয়ে বললে, ওঃ! মনে নেই আবার? পণ্ডিত সেই তুর্কি-চাচার দেহখানা এমন লম্বালম্বি ভাবে কেটেছিল যে, তাকে দেখতে হয়েছিল ঠিক পণ্ডিতেরই মতন!
পণ্ডিত প্রবল প্রতিবাদ জানিয়ে মাথা নেড়ে বললে, না, তাকে আমার মতন দেখতে হয়নি। আমি একথার আপত্তি করি।
মহারাজা বললেন, আবার তুমি গায়ে পড়ে বাক্য উচ্চারণ করছ? তুমি আপত্তি করতে পারবে না। কখন তোমার আপত্তি করা কর্তব্য, সেকথা আমি নিজেই বলে দেব।
পণ্ডিত বললে, কোন কথায় আমি আপত্তি করব, সেকথা আপনি জানবেন কেমন করে মহারাজ?
মহারাজা মহাবিস্ময়ে মুখব্যাদান করে বললেন, ওহে ভোম্বল, পণ্ডিতটা বলে কী হে? কোন কথায় ওর আপত্তি করা উচিত, তাই-ই যদি না বলতে পারব, তবে আমি কীসের মহারাজ?
