আমি কৃতজ্ঞ স্বরে বললুম, ভাই ভোম্বল, এ খবরটা তবু মন্দের ভালো! তোমার এ উপকারের জন্যে ধন্যবাদ।
ভোম্বল বললে, ও বাজে ধন্যবাদ আমি চাই না। আগে বাঁচো, তারপর ধন্যবাদ দিও। আমার এখন খিদে পেয়েছে আমি হোটেলে চললুম! জানালার ধার থেকে তার মুখ সরে গেল।
আমি ভাবতে লাগলুম, ভোম্বলকে আগে যতটা মনে হয়েছিল, এখন দেখছি সে ততটা মন্দলোক নয়। ওর বাইরের চেহারা, হাবভাব আর কথাবার্তা কিঞ্চিৎ অভদ্র ও এলোমেলো হলেও ওর পিপের ভিতরে প্রাণ আর দয়া-মায়া আছে। ভোম্বল দেখছি একটি বর্ণচোরা আম।
হঠাৎ জানালার ধারে আবার ভোম্বলদাসের উদয় হল। বাইরের এদিকে-ওদিকে একবার চেয়ে সে বললে, হ্যাঁ ভালো কথা! খিদের চোটে একটা বিষয় ভুলে গিয়েছিলুম। এই ছোট নলচেটা নিয়ে ভালো করে লুকিয়ে রাখো। ওর পেছনে যে কল আছে সেটিকে টিপলেই ওই নলচেটি তোমাকে সাহায্য করবে। আর একবার দন্তবিকাশ করে হেসেই ভোম্বল আবার অদৃশ্য হল।
নলচেটি পরখ করে দেখলুম। সেদিন মন্ত্রণাসভায় এই রকমেরই একটি নলচের বিষম মহিমা দেখেছিলুম। তবে এটি তার চেয়ে ঢের ছোট, অনায়াসে পকেটে লুকিয়ে রাখা যায়। এই নলচেই বোধহয় পিপেদের বন্দুক!
এমন সময়ে দরজা খোলার শব্দ পেলুম। নলচেটাকে ভিতরকার জামার পকেটে লুকিয়ে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরের ভিতরে এসে দাঁড়াল অমরচন্দ্র, পণ্ডিত ও আরও চারজন পিপে!
পণ্ডিত বললে, অমল, তোমাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে।
বুঝলুম, এরা আজকেই আমাকে মহারাজার কাছে হাজির করতে চায়। বিনা-বাক্যবায়ে আমি তাদের সঙ্গে চললুম! আগে আগে পণ্ডিত আর অমরচন্দ্র, আমার দুপাশে দুজন ও পিছনে দুজন পিপে! দস্তুরমতো কড়া পাহারা!
.
পঞ্চদশ । আমার মহা বীরত্ব
সবাই মিলে যে ঘরে গিয়ে দাঁড়ালাম, সেটা হচ্ছে সেই ঘর–যেখানে এদেশে এসে আমার প্রথম জ্ঞানোদয় হয়!
আজ দেখছি সে ঘরের রূপ বদলে গেছে। মাঝখানে একটা লম্বা টেবিল, তার ওপরে অনেক অস্ত্রশস্ত্র, চারিধারে তাকে তাকে হরেকরকম ওষুধ ও আরক প্রভৃতির শিশি, বোতল ও কাচের পাত্র!
অমরচন্দ্র কী একরকম সন্দেহপূর্ণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললে, ভালো করে এর চেহারা দেখে আজ মনে হচ্ছে, এর দেহ নিয়ে বোধহয় আমাদের কার্যসিদ্ধি হবে না।
পণ্ডিত বললে, হোক আর নাই-ই হোক, পরীক্ষা আমি করবই!
আমি সভয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, আপনারা আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?
পণ্ডিত বললে, তোমাকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করব বলে!
আমি উদ্বিগ্ন স্বরে বললুম, কীরকম? মহারাজার হুকুম কি আপনি জানেন না? আগে আমাকে তার কাছে নিয়ে যেতে হবে!
পণ্ডিত বিপুল বিস্ময়ে খানিকক্ষণ অবাক হয়ে রইলেন। তারপর বললেন, এ কথা কে তোমাকে বলেছে?
যেই-ই বলুক, আপনি আগে আমাকে মহারাজার কাছে নিয়ে চলুন।
অমরচন্দ্র দাঁত ছরকুটে বললে, তা আর জানি না! সেখানে আমাদের শত্রুপক্ষ আছে, তুমি আমাদের হাত ফসকে কলা দেখিয়ে পালাও আর কী?
আমি বললুম, সে কী, আপনারা মহারাজার হুকুম মানবেন না?
পণ্ডিত ঘন ঘন ঘাড় নেড়ে বললে, না, না, না! বিজ্ঞানের মর্যাদা রাখবার জন্যে আমরা মহারাজার হুকুম মানব না! তারপর পিপেদের দিকে ফিরে বললেন, তোরা ওকে ধর! ওর হাত-পা বেঁধে টেবিলের ওপর শুইয়ে দেয়।
এবারে রাগে অজ্ঞান হয়ে একলাফে পণ্ডিতের ওপরে লাফিয়ে পড়ে মারলুম আমি তাকে এক লাথি–সে বিকট আর্তনাদ করে মাটির ওপরে গড়িয়ে গেল। কিন্তু ততক্ষণে চারজন প্রহরী পিপে আমাকে সবেগে আক্রমণ করেছে!
টেবিলের ওপরে বোধকরি আমারই দেহ কাটবার অস্ত্রগুলো ছড়ানো ছিল, আমি বিদ্যুতের মতন হাত বাড়িয়ে একখানা মস্ত ধারালো ছুরি তুলে নিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ডাইনে বাঁয়ে সামনে-পিছনে চালাতে লাগলুম! বেটাদের গায়ে তো হাড় ছিল না, আমার ছুরি তাদের হাতে-পায়ে যেখানে পড়ে সেইখানটাই কচুর মতন কাচ করে কেটে উড়ে যায়! তারা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে সেখান থেকে টেনে লম্বা দিলে! ঘরের মেঝেতে পড়ে তাদের কাটা হাত পাগুলো টিকটিকির কাটা ল্যাজের মতন ধড়ফড় করতে লাগল।
তারপর আমি অমরচন্দ্রের দিকে ফিরে দাঁড়ালুম, কিন্তু চোখের পলক না ফেলতেই সে তার পিপের ভিতর থেকে উপাং করে মাটির ওপরে লাফিয়ে পড়ল এবং একটা বড় সাপের মতন কিলবিল করতে করতে দরজার ভিতর দিয়ে বেগে অদৃশ্য হল!
তারপর আমি পণ্ডিতের দিকে ফিরে দাঁড়ালুম–সে তখন ভীষণ চিৎকার করে চাকরদের ডাকাডাকি করছে!
আমি গর্জন করে বললুম, তবে রে জুজুবুড়ো! এবারে তোকে কে রক্ষা করে? আয়, আজ আমি তোরই অস্ত্র চিকিৎসা করিবলেই ছুরি উঁচিয়ে আমি তাকে আক্রমণ করলুম।
দারুণ আতঙ্কে পণ্ডিতের মুখ তখন মড়ার মতন সাদা হয়ে গেছে, চোখদুটো কপালে উঠেছে! হঠাৎ তার পিপের নীচে থেকে অনেকগুলো ঠ্যাং বেরিয়ে পড়ল এবং সেই বড় টেবিলটার চারিপাশ ঘিরে ঠিক একটা প্রকাণ্ড মাকড়সার মতন এত বেগে ছুটতে আরম্ভ করলে যে, আমি কিছুতেই তার নাগাল ধরতে পারলুম না।
মাত্র দুই পায়ে ভর দিয়ে অতগুলো পায়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব না হলেও আমি পণ্ডিতের পিছু ছাড়লুম না–সে-ও ছোটে, আমিও ছুটি! এই ব্যাপার আরও কতক্ষণ চলত এবং কীভাবে শেষ হত তা আমি জানি না, কিন্তু আচম্বিতে বাহির থেকে দলে দলে নানা আকারের পিপে এসে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল–তাদের সর্বাগ্রে রয়েছে ভোম্বলদাস!
