পণ্ডিত বললে, আমার এই হুকুম রইল, আজ থেকে এক মাস তুই ওই শ্রীখোল ছেড়ে বেরুতে পারবি না! যাঃ এখন নিজের ঘরে যা!
কমলা তার হাত-পা গুটিয়ে ফেললে, তারপর ধীরে ধীরে গড়াতে গড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল! আমি বুঝলুম, এই নিষ্ঠুর শত্ৰুপুরীতে আমার একমাত্র যে বান্ধবী ছিল, আমার বিপদে-আপদে যে আমাকে প্রাণপণে সাহায্য করতে পারত, সে-ও আজ অসহায় ভাবে বন্দিনী হল। আজ থেকে আর কেউ আমার দিকে মুখ তুলে তাকাবে না। আমার জীবনরক্ষার আর উপায় নেই।
পণ্ডিত আমার দিকে চেয়ে বললে, এইবারে তোমার পালা।
আমি গম্ভীর ভাবে বললুম, তাহলে পালা শুরু করুন।
আমি তোমার প্রাণরক্ষা করেছি, তোমাকে আশ্রয় দিয়েছি, তার খুব প্রতিদান তুমি দিলে বটে!
আমি বললুম, আমি কোনও অন্যায় করেছি বলে মনে পড়ছে না!
পণ্ডিত চেঁচিয়ে বললে, অন্যায় করোনি? মেয়েকে বাপের অবাধ্য করা অন্যায় নয়? তোমাদের দেশে এটা অন্যায় না হতে পারে, কিন্তু এদেশে তা মহাপাপ! যে ছেলেমেয়েরা বাপের অবাধ্য, এদেশে তাদের প্রাণদণ্ড পর্যন্ত হয় তা তুমি জানো কি?
আমি বললুম, না জানি না। জানতেও চাই না। আমি শুধু এইটুকু জানি যে, কমলাকে আমি কোনও দিন আপনার অবাধ্য হতে বলিনি।
বলোনি? হেঃ, এই কথা আমি বিশ্বাস করব? আমি কি সেকেলে মানুষের মতন বোকা ভ্যাড়াকান্ড? আমার বুদ্ধিশুদ্ধি কি মগজ থেকে কর্পূরের মতন উপে গেছে? তুমি তাকে কুশিক্ষা না দিলে সে কি কখনও আমার বিরুদ্ধে নালিশ করবার কথা মনেও আনতে পারে? আর আমি কিনা তোমারই প্রাণরক্ষা করেছি।
আমার অসহ্য হয়ে উঠল। বললুম, বার বার আমার প্রাণরক্ষা করেছেন বলে জাঁক করছেন কেন? আপনি কেন যে আমার প্রাণরক্ষা করে আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন আমি কি তা জানি না? আপনি আমার প্রাণরক্ষা করেছেন আমার প্রাণবধ করবার জন্যে।
পণ্ডিত খাপ্পা হয়ে বললেন, তোমার সঙ্গে আর আমি বাজে কথা কয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। যাও, নিজের ঘরে গিয়ে বন্দি হয়ে থাকো গে! আর দয়া নয়!
.
চতুর্দশ । ভোম্বলদাসের আসল চেহারা
ঘরে ভিতরে একলা বসে যেন অকুলপাথারে ভাসছি।
বাঁচবার কোনও আশা নেই। এক আশা ছিল কমলা, কিন্তু সেও এখন আমারই মতন বন্দি। পণ্ডিতের ষড়যন্ত্রের কথা সে আর কারুর কাছে গিয়ে প্রকাশ করে দিতে পারবে না।
এই উদ্ভট, ভূতুড়ে দেশের আইনকানুন সবই আজব! এখানকার দয়া-মায়া-ভালোবাসা সবই ভিন্নরকম। পৃথিবীর সভ্যদেশে মাঝে-মাঝে ভূত-পেতনির কথা শুনতে পাই, নানারকম মূর্তি ধারণ করে মানুষদের যারা ভয় দেখায়। সেসব এদেরই কীর্তি নয়তো? তারা রাতআঁধারে দেখা দিয়ে দিনের আলোয় কোথায় লুকোয়, তারা কোথা থেকে আসে কেউ তা জানে না, কিন্তু আমার বিশ্বাস, তারা এই দেশেরই লোক! মানুষ যে পরলোকের কথা জানে, এই পরলোক হয়তো এই এই পিপে-মুল্লুকেই! আমি চোখের সামনেই ভোম্বলকে আমার মূর্তি ধরতে দেখেছি। এরাই হয়তো মানুষের দেশে গিয়ে রাত্রিবেলায় আমাদের মৃত আত্মীয়স্বজনের মতন চেহারা নিয়ে দেখা দেয়, আর আমরা ভূত দেখেছি বলে ভয়ে আঁতকে উঠি! এরা নিজেদের বলে নতুন মানুষ! ছাই! পিপের ভিতরে কখনও মনুষ্যত্ব থাকে না!
হঠাৎ মৃদুস্বরে কে আমায় ডাকলে, অমলা, ও অমলা!
মুখ তুলে দেখি, জানলার বাইরে ভোম্বলের মোটা, আঁচিল ভরা, বারাকোশের মতন মস্ত মুখখানা!
আমি রাগ করে বললুম, আবার তুমি আমাকে ওই নামে ডাকছ? আমি মরতে বসেছি বলে তোমার বুঝি খুব আহ্লাদ হয়েছে?
ভোম্বল বললে, না ভাই, চটো কেন? তুমি তো জানোই আমরা মেয়ে-পুরুষ সবাই ডিম পাড়ি কাজেই আমাদের কাছে অমলও যে অমলাও সে! একটা আকারের তফাত বই তো নয়! যাক সে কথা, তুমি জানলার কাছে এসো। চেঁচিয়ে কথা কইলে কেউ শুনতে পাবে। যা বলতে এসেছি, চুপিচুপি বলে যাই!
জানি, এ অপদার্থটার দ্বারা আমার কোনওই উপকার হবে না, তবু সে কী বলে শোনবার জন্যে আমি উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালুম।
ভোম্বল চুপিচুপি বললে, তোমার জন্যে আমি কম চেষ্টা করিনি, এখানকার যেসব মোড়ল পণ্ডিত জুজুবুড়োকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না, তাদের অনেককেই গিয়ে ধরেছি। কিন্তু বিশেষ ফল হল না। তুমি একেবারে অচেনা লোক, তোমার নাম পর্যন্ত কেউ জানে না। তারা বলে, কোথাকার কোন একটা বাজে জীবের জন্যে পণ্ডিতের সঙ্গে আমরা ঝগড়া করে মরতে যাব কেন? পণ্ডিতের এখানে খুব পসার কিনা? সবাই বলে, পণ্ডিত হচ্ছে দেশভক্ত লোক,–সে যা করবে দেশের ভালোর জন্যেই করবে!
আমি বললুম, এ খবরটা জানাবার জন্যে তোমার কষ্ট করে এখানে না এলেও চলত!
ভোম্বল দন্তবিকাশ করে বললে, তা চলত বটে! তবু না এসে থাকতে পারলুম না, হাজার হোক তুমি আমার বন্ধু তো! তা দ্যাখো অমলা, তোমার জন্যে একটা কাজ আমি করেছি বোধহয়! মহারাজ একটা কথায় রাজি হয়েছেন। কেন যে ছুরি মেরে তোমার ভুড়ি ফঁসানো হবে না, এর বিরুদ্ধে যদি তোমার কোনও যুক্তি থাকে, মহারাজা তা শুনতে আপত্তি করবেন না। যুক্তি দেখিয়ে তুমি যদি তাকে বোঝাতে পারো তাহলে তোমার ভুড়ি এ যাত্রা বেঁচে গেলেও যেতে পারে। কাজে-কাজেই এক বিষয়ে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। তোমাকে আগে মহারাজার কাছে হাজির না করে তার হুকুম না নিয়ে কেউ তোমার এই নাদুস-নধর দেহটিকে খণ্ড খণ্ড করতে পারবে না!
