আমি বললুম, ঘেন্না নয় কমলা, তবে ওরকম চেহারা দেখবার অভ্যাস নেই বলে অবাক হতে হয় বটে!
না, এ তুমি আমার মন রাখা কথা বলছ! আমি তোমার চোখের ভাব দেখেছি, তুমি খালি অবাক হও না, ভয় পাও, ঘেন্না করো!
কমলা, তুমি কি জানো, কেবল চন্দ্রসেন নন, একালেও তোমার বাবা আবার একরকম নতুন মানুষ তৈরি করতে চান?
না। তবে আজকাল বাবার মুখ দেখে আমার কেমন একটা সন্দেহ হচ্ছে!
কী সন্দেহ?
কিছুকাল আগে বাবা এক তুর্কির দেহে ছুরি চালিয়ে-চালিয়ে সে অভাগাকে মেরে ফেলেছিলেন। সেই সময়ে তার মুখের ভাব যেরকম হয়েছিল, আজকাল তাকে দেখলে তার সেই মুখের ভাব আমার মনে পড়ে।
কমলা, তাহলে শোনো। তুমি আমার বোনের মতন। তোমার কাছে আমি কিছু লুকোব না–বলে সেদিন পণ্ডিত আর অমরচন্দ্রের ভিতরে যেসব কথাবার্তা হয়েছিল সমস্তই আমি কমলার কাছে প্রকাশ করলুম।
কমলা প্রথমটা স্তম্ভিতের মতন স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর উত্তেজিত স্বরে বললে, উঃ, বাবা এত নিষ্ঠুর? আবার তিনি তোমাকে হত্যা করতে চান? কিন্তু তোমার কোনও ভয় নেই, আমি তোমাকে সাহায্য করব! এখন এদেশে জ্যান্ত মানুষের দেহে ছুরি চালানো বেআইনি! আমি এখানকার এমন অনেক লোককে চিনি যারা বাবাকে এরকম পাপকাজ কিছুতেই করতে দেবে না। এই ষড়যন্ত্রের কথা আমি নিজে গিয়ে তাদের কাছে বলে আসব!
আচম্বিতে পিছন থেকে ক্রুদ্ধ গম্ভীর স্বরে শোনা গেল, যা শুনলুম, তা কি সত্য?
চমকে ফিরে সভয়ে দেখলুম, দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পণ্ডিতমশাই! তার দুই চক্ষে দু-দুটো আগুনের শিখা! এবং সেই অগ্নিময় চোখদুটো একবার কোটরের বাইরে পাঁচ ছয় হাত বেরিয়ে আসছে, তারপর আবার কোটরের ভিতরে সেঁদিয়ে যাচ্ছে। এটা বোধহয় পিপে-মুল্লুকে বিশেষ রাগের লক্ষণ।
.
ত্রয়োদশ । কমলার পিপে
যে ভয়ানক দিনটাকে আজ কয়দিন মন থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারছিলুম না, চোখের সামনে এখন সে যেন মূর্তি ধরে দেখা দিলে!
কমলার কথা পণ্ডিত শুনতে পেয়েছে। আমি যে তাদের ষড়যন্ত্র ধরে ফেলেছি, এটাও সে জানতে পেরেছে! আর আমার বাঁচোয়া নেই!
পণ্ডিতের এখনকার চেহারা দেখে ভোম্বলের কথা মনে পড়ল। জুজুবুড়ো–জুজুবুড়ো! তার মুখে-চোখে এখন পিশাচের ভাব ফুটে উঠেছে।
খুব টিটকিরি দিয়ে কমলার দিকে ফিরে পণ্ডিত বললে, মেয়ে আমার দেবী হয়েছেন। বাবাকে পাপ কাজ করতে দেবেন না! একটা বিদেশি জন্তুকে বাঁচাবার জন্যে পাঁচজনকে সব জানিয়ে আমার সর্বনাশের চেষ্টা করবেন! আহাহাহামরি মরি!
কমলা জবাব না দিয়ে মাথা হেঁট করলে। তার মুখ তখন ভয়ে সাদা হয়ে গেছে!
পণ্ডিত বললে, যখন-তখন তুই ওই সেকেলে মানুষগুলোকে নকল করিস বলে বরাবরই আমার সন্দেহ ছিল যে, তোর বুদ্ধির গোড়ায় গলদ আছে! কিন্তু তুই যে এতটা অধঃপাতে গিয়েছিস তা আমি বুঝতে পারিনি! জানিস, এ রাজ্যে বাপ-মায়ের অবাধ্য হলে ছেলে-মেয়েরা কী কঠিন শাস্তি পায়?
কমলা বললে, কিন্তু অমলদাদাকে তুমি কিছুতেই খুন করতে পারবে না!
দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে পণ্ডিত বললে, কী? অমলদাদা! ওই সেকেলে জড়ভরতটাকে তুই আমার সামনে দাদা বলে ডাকছিস। রোস, চুপ করে দাঁড়া! তোর সব ভিরকুটি আজকেই ঠান্ডা করে দেব।
পণ্ডিত উগ্রদৃষ্টিতে অগ্রসর হয়ে কমলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কীরকম অদ্ভুত ভঙ্গি তে দুটো হাত নাড়তে লাগল সঙ্গে-সঙ্গে কমলার মুখে চোখে ও সর্বাঙ্গে কেমন একটা তীব্র যাতনার ঢেউ বয়ে গেল,তার ভাব দেখে আমাদের মনে হল, সে যেন কী-একটা অদৃশ্য বিভীষিকাকে ঠেকিয়ে রাখবার জন্যে চেষ্টা করছে–প্রাণপণে চেষ্টা করছে।
পরমুহূর্তেই স্তম্ভিত দৃষ্টিতে দেখলুম, কমলার দেহ আকারহীন থলথলে মাংসপিণ্ডের মতন। মাটির ওপরে গড়াগড়ি দিচ্ছে! জাদুঘরে যাবার দিনে চাকা গাড়ি থেকে জেলিমাছের মতন যে দেহটার ওপরে আমি আঁপিয়ে পড়েছিলুম, কমলার দেহকে দেখতে হয়েছে এখন ঠিক সেইরকম।
মাংসপিণ্ডের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পণ্ডিত বললে, এইবারে আদর করে তোর অমলদাদাকে একবার ডেকে দেখ না! এখন ও আর তোর দিকে ফিরেও চাইবে না!
রাগে গা আমার স্কুলে গেল! একবার মাংসপিণ্ডের দিকে তাকালুম। তার ভিতর থেকে দুটি চোখ অত্যন্ত কাতর ও দুঃখিত ভাবে আমার মুখের পানে চেয়ে আছে! কমলার দেহ বদলেছে, কিন্তু তার চোখদুটির শ্রী এখনও ঠিক আগেকার মতনই আছে! আমি মমতা-ভরা স্বরে বলে উঠলুম, তা, না কমলা! তোমার চেহারা বদলেছে বলে আমি তোমাকে বোনের মতনই দেখছি!
পণ্ডিত ঠাট্টা করে বললে, ও হো হো হো! লক্ষ্মী বোনের লক্ষ্মী ভাই! চমৎকার! ওরে কে আছিস রে, কমলার শ্রীখোলটা এখানে নিয়ে আয় তো!
একটা বড় পিপে এসে হাজির–তার হাতে একটা ছোট পিপে।
পণ্ডিত কমলার দিকে ফিরে হুকুম দিলে, ঢোক ওর ভেতরে!
কমলার পিণ্ডাকৃতি দেহের ভিতর থেকে মিনতি মাখা করুণ স্বর এল, বাবা গো, তোমার পায়ে পড়ি! অমলদাদার সামনে আমাকে ওর ভেতরে ঢুকতে বোলো না, লজ্জায় আমি মরে যাব!
পণ্ডিত ক্যাঁক-কেঁকে গলায় হুমকি দিয়ে বললে, চোপরাও! তুই মলে তো আমি বাঁচি! ঢোক শ্রীখোলের ভেতরে!
মাংসপিণ্ডের মাঝখান থেকে তিনখানা হাত আর তিনখানা পা বেরিয়ে পড়ল। তারপর পিণ্ডটা উঠে পিপের ভিতরে গিয়ে ঢুকল। পিপের একদিকে একখানি মুখ–তা আমার চেনা কমলার মতন দেখতেও বটে, দেখতে নয়ও বটে! তার দুই চোখ দিয়ে টসটস করে জল ঝরছে, লজ্জার সে আমার দিকে তাকাতে পারছে না।
