তাহলে পরস্পরের কথা শুনতে না পেলেও চলে?
নিশ্চয়! ওরা অন্যের কথা শুনতে চায় না, নিজেদের কথাই শোনাতে চায়! সেইজন্যেই ওরা সভ্য হয়েছে!
মঞ্চের পিপের নাক এই গোলমালের সময়ে রীতিমতো গর্জন করছিল। হঠাৎ আবার জেগে উঠে সে কাঁসর বাজালে। অমনি যেখানে যত পিপে সবাই একসঙ্গে চাঁচাতে চাচাতে একদিকে ছুটে গেল।
আমি বললুম, ও আবার কী?
ভোম্বল বললে, ওরা ভোট দিচ্ছে।
আচম্বিতে আর-একদিকে দুইদলের ভিতরে বিষম দাঙ্গা শুরু হয়ে গেল।
মঞ্চের পিপে বোধহয় আবার ঘুমোবার চেষ্টায় ছিল, কিন্তু দাঙ্গাহাঙ্গামা দেখেই সে অত্যন্ত সজাগ হয়ে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল। তারপর যেদিকে দাঙ্গা হচ্ছে, সামনের পিতলের নলচের মুখটাকে সেইদিকে ফিরিয়ে কী একটা টিপে দিলে। একটা ছোট গোলা দড়াম করে যথাস্থানে পড়ে ফেটে গেল। দেখলুম, তিনজন লোক মাটির ওপরে গিয়ে পড়ল–তখন তাদের আর পিপে বলে চেনবারই জো নেই! দেহগুলো ভেঙেচুরে তাল পাকিয়ে বা গুঁড়ো হয়ে গেছে।
ভোম্বল বলে উঠল, ওই যাঃ! বুড়ো দেবেনের গতর চুরমার হয়ে গেলে দেখছি।
সমস্ত চাঁচামেচি ও হুড়োহুড়ি একেবারে ঠান্ডা!
আমি সভয়ে বললুম, হা ভোম্বল, তাহলে সত্যিই কি ওরা মারা পড়ল?
ভোম্বল বললে, তা পড়ল বইকী! তা ছাড়া শান্তিরক্ষার আর কোনও উপায় ছিল না যে! দোষ তো দেবেনেরই। প্রতিবারেই সে একটা না একটা হাঙ্গামা না করে ছাড়বে না! এইবারে বাপধন শায়েস্তা হলেন! কিন্তু ও কী! অমল, তোমার কি হঠাৎ কোনও অসুখ করল?
আমি বললুম, তোমাদের মন্ত্রণাসভাকে নমস্কার করছি। আমাকে বাইরে নিয়ে চলো।
.
দ্বাদশ । বিপদ মূর্তিমান
মন্ত্রণাসভার বিশ্রী ব্যাপারটা দেখে আমার প্রাণ-মন কেমন নেতিয়ে পড়েছিল। বাসায় ফিরে এসেও কিছুই ভালো লাগল না।
দেওয়ালের গায়ে একখানা বেহালা টাঙানো ছিল, হঠাৎ তার দিকে আমার নজর গেল।
অন্যমনস্ক ভাবে বেহালাখানা নামিয়ে নিয়ে, তারগুলো বেঁধে একলাটি বসে বাজাতে লাগলুম।
একে তো এক উটকো সৃষ্টিছাড়া দেশে এসে প্রায় বন্দির মতনই আছি, তার ওপরে শিয়রে সর্বদাই খাঁড়া ঝুলছে, খুনে পণ্ডিত কখন যে আমার দেহব্যবচ্ছেদ করতে চাইবে কিছুই বলা যায় না, কাজেই এরকম মন নিয়ে আমি যে নিজের অজান্তে খুব একটা দুঃখের সুর বাজাব, তাতে আর সন্দেহ কী!
অনেকক্ষণ পরে যখন থামলুম, হঠাৎ একফোঁটা গরম জল আমার গলার ওপরে এসে। পড়ল!
চমকে ফিরে দেখি, ঠিক আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে কমলা, আর তার বড় বড় দুই চোখ ভরে কান্নার জল উপচে পড়ছে। আমি এমন তন্ময় হয়ে ছিলুম যে, কখন সে ওখানে এসে দাঁড়িয়েছে, একটুও টের পাইনি!
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, কমলা, কমলা! তুমি কাঁদছ কেন?
কমলা তাড়াতাড়ি তার চোখের জল মুছে ফেলে লজ্জার হাসি হেসে বললে, তুমি অমন দুঃখের সুর বাজাচ্ছিলে কেন? আমার যে কান্না পেল।
আমি হেসে বললুম, তবে আমার দুঃখের সুরকে তুমি তোমার হাসির স্রোতে ভাসিয়ে দাও! তুমি একটি গান গাও, আর আমি তার সঙ্গে বাজিয়ে যাই। গাইবে?
কমলা বললে, হু, তা কেন গাইব না? শোনো–
আকাশের চাঁদ-মুখ
ভেসে চলে নদীজলে
বাতাস কানেতে এসে
কত ভালোবাসি বলে।
নীল-লাল মুখ তুলি।
দুলে দুলে ফুলগুলি
আতর-স্বপন দেখে
ঝরে পড়ে দলে-দলে।
অচেনা গানের পাখি
আমারে বলিল ডাকি
হাসো-গাও! যতদিন
আছ ভাই, ধরাতলে!
গান শেষ হলে পর বললুম, কমলা! তোমার কী মিষ্টি গলা! সেদিন ভোম্বলের গান শুনে তোমাদের দেশের গানে অরুচি ধরে গিয়েছিল–
কমলা বললে, সে তোমাকেও গান শুনিয়েছিল নাকি! ওই তো তার রোগ! সবাইকে তার গান না শুনিয়ে ছাড়বে না! নিজেকে মস্ত ওস্তাদ মনে করে, ভাবে, সারা দুনিয়া তারই গান শোনবার জন্যে কান খাড়া করে আছে। আমাকেও মাঝে-মাঝে জোর করে ধরে বসিয়ে গান শোনায়–বাব্বাঃ! সে যে কী কাণ্ড! যেন তিনটে পাচা, দুটো গাধা আর একটা হুলো বেড়াল একসঙ্গে ঝগড়া করছে! গান শেষ হলে আবার জিজ্ঞাসা করা চাই–ভালো লাগল। তো? কিন্তু তার গান ভালো বললেই বিপদ বেশি! আমি যদি বলি–ভয়ংকর ভালো লাগল, তাহলে আর রক্ষে নেই, অমনি আবার তানপুরো ঘাড়ে করে বলে তাহলে আর একটা এর চেয়েও ভালো গান শোনো।
আমি হেসে ফেলে বললুম, না কমলা, ভোম্বল আমার কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে, আমাকে সে আর কখনও গান শোনাবে না।
কমলা বললে, অমলবাবু, তাহলে মানতেই হবে যে, ভগবান তার মাথায় সুবুদ্ধি দিয়েছেন।
আমি বললুম, আচ্ছা কমলা, তুমি আমাকে অমলবাবু বলো কেন, দাদা বলতে পারো না?
দাদা বললে তুমি যদি রাগ করো?
কেন রাগ করব? আমি যে তোমাকে ঠিক ছোট বোনটির মতন দেখি!
কমলা বললে, একথা শুনে আমার ভারি আহ্লাদ হল। মাঝে-মাঝে মনে হয়, আমি যদি তোমাদের মতন হতুম!
কেন কমলা, তুমি তো ঠিক আমাদেরই দেশের মেয়ের মতন দেখতে?
না, এটা তো আমার নকল দেহ। জাদুঘরে এইরকম মেয়ের ছবি দেখে আমার ভারি। ভালো লেগেছিল, তাই তো আমি শখ করে প্রায়ই এইরকম মূর্তি ধরি। কিন্তু এই নকল দেহ নিয়ে বেশিক্ষণ থাকতে তো পারি না, আমাদের হাড় নেই বলে খানিকক্ষণ পরেই কষ্ট হয়, তখন তাড়াতাড়ি আবার সেই বিশ্রী শ্রীখোলের ভেতরে গিয়ে ঢুকি! চন্দ্রসেন আমাদের দেহ বদলে ভালো কাজ করেননি! এই যে এখন আমার চেহারা তোমার ভালো লাগছে, আমাকে তুমি নিজের বোনের মতন দেখছ, একটু পরে আমাকে সেই শ্রীখোলের ভেতরে দেখলে তুমিই হয়তো ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেবে! কেমন, একথা কি সত্যি নয়?
