আমি বললুম, চমৎকার।
হঠাৎ সে জিজ্ঞাসা করে বলল, ও অমলবাবু! তোমাদের দেশের খোকা-খুকুদের কেমন দেখতে?
আমাদের খোকা-খুকুদের একটু বর্ণনা দেবার চেষ্টা করলুম।
কমলা বললে, তোমার নিজের কোনও খোকা-খুকু আছে?
না।
কমলা দুঃখিত মনে বললে, আমারও নিজের কোনও খোকা-খুকু নেই! পঁচিশ বছর বয়স না হলে কেউ এখানে খোকা-খুকু কিনতে পারে না।
আমি বিস্ময়ে খানিকক্ষণ বোবা হয়ে রইলুম। তারপর বললুম, তোমরা খোকা-খুকু কেনো?
হ্যাঁ। খোকা-খুকুর বয়স যত কম, তার দামও হয় তত বেশি। আমার বাবা আমাকে দুই বৎসর বয়সে কিনেছিলেন।
এমন সময়ে পণ্ডিত এসে হাজির। আমাদের কথাবার্তা এইখানেই থেমে গেল। মনে মনে ঠিক করলুম, ভোম্বলের সঙ্গে দেখা হলে আসল কথা জেনে নিতে হবে। এই খোকা খুকুর ব্যাপারে একটা কিছু রহস্য আছে!
ভোম্বল যথাসময়েই এল। মন্ত্রণাসভায় যাবার পথে তাকে জিজ্ঞাসা করলুম, আচ্ছা কমলা যে বলছিল দু-বছর বয়সের সময়ে তার বাবা তাকে কিনেছেন, এ কথার মানে কী?
ভোম্বল বললে, মানে তো খুবই সোজা! ও, বুঝেছি–কোথায় তোমার খটকা লেগেছে! তবে শোনো। চন্দ্রসেন যখন আমাদের সৃষ্টি করলেন, তখন ভেবে দেখলেন যে, সাধারণ দুর্বল মানুষরা যেভাবে জন্মায় সেভাবে আমরাও জন্মালে আমাদের সকলকার শক্তি ঠিক সমানভাবে বাড়বে না। এই দ্যাখো না, তোমাদের একই পিতা-মাতার পাঁচটি সন্তানের শক্তি আর বুদ্ধি একরকম হয় না। চন্দ্রসেন তাই স্থির করলেন, আমরা ডিম পাড়ব।
আমি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলুম না—
ডিম? তোমরা ডিম পাড়বে?
হ্যাঁ। আমরা ডিম পাড়ি। পাড়বার পর প্রত্যেক ডিমটিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষা করা হয়। যেসব ডিম নিরেস, অর্থাৎ খারাপ, সেগুলোকে নষ্ট করে ফেলা হয়। ভালো ডিমগুলোকে বেছে ফুটনাগারে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে রাখা হয়। ডিম সেইখানে ফোটে।
কেন? যাদের ডিম তারাই ফোঁটায় না কেন?
তাহলে বেআইনি কাজ করা হবে। যেসব পুরুষ আর নারী নিজেদের ডিম লুকিয়ে রাখে, তারা কড়া শাস্তি পায়।
যেসব পুরুষ আর নারী?
হ্যাঁ। এদেশে পুরুষ আর নারী দুয়েরই ডিম হয়।
বলো কী! এখানে পুরুষরাও ডিম পাড়ে?
নিশ্চয়ই পাড়ে!
তারপর?
ওই সব ডিম ফোটবার পরেও খোকা-খুকুদের স্ফুটনাগারের ভেতরেই লালন-পালন করা হয়। তারপর যখন আমাদের সন্তান পালন করবার মতন বয়স হয়, তখন আমরা খোকা বা খুকিকে কিনে বাড়িতে নিয়ে আসি।
আমি সব শুনে এতটা হতভম্ব হয়ে গেলাম যে, মন্ত্রণাসভায় পৌঁছবার আগে আর কোনও কথাই কইতে পারলুম না।
মন্ত্রণাসভায় বাড়িখানা খুবই প্রকাণ্ড। গোল বাড়ি।
ঢোকবার মুখেই কয়েকজন সেপাই বা দারোয়ান আমাদের জামাকাপড় ভালো করে হাতড়ে দেখলে এবং যা কিছু সন্দেহজনক বা আপত্তিকর বলে মনে করলে, আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে বললে, যাবার সময়ে চেয়ে নিয়ে যেও!
ভোম্বলকে শুধলুম, এ আবার কী নিয়ম?
ভোম্বলদাস দন্তবিকাশ করে হেসে সংক্ষেপে বললে, মন্ত্রণাসভাকে প্রজারা বেশি ভালোবাসে না।
বড় হলঘরটার ভিতরে গিয়ে আমরা যখন ঢুকলুম তখন সেখানে লোকজন ছিল না– কেবল মঞ্চের ওপরে বসে একটিমাত্র পিপে নাক ডাকিয়ে আরামে নিদ্রা দিচ্ছিল।
পিপের সামনেই চকচকে পিতলের একটি নলচে।
ভোম্বল বললে, ওই নলচের সাহায্যে শান্তিরক্ষা করা হয়। ওর ব্যবহার আজকেই তুমি বোধহয় দেখতে পাবে।
হলঘরটার বিশেষ বর্ণনা দেবার দরকার নেই। ঘরের মেঝেটা মাঝখান থেকে পাক খেয়ে ওপরে উঠে গেছে–এইমাত্র তার বিশেষত্ব। সমস্ত সভাস্থলের মধ্যে কোথাও একখানা চেয়ার দেখা গেল না। চেয়ারের এখানে কোনও কাজ নেই। পিপেরা আসে, পিপের তলার দিকটা মাটিতে রেখে বসে পড়ে। কোনও ল্যাঠা নেই।
ঘুমন্ত পিপেটা আচম্বিতে জেগে উঠে ঢং করে একবার কসর বাজালে। পরমুহূর্তে দুমদাম করে চারিদিককার অনেকগুলো দরজা খুলে গেল এবং দলে দলে পিপে হুড়মুড় করে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে যে যার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে আসন গেড়ে বসল। হট্টগোলে কান পাতা দায়!
মঞ্চের পিপেটা আবার ঢং করে কসর বাজিয়ে বললে, সভার কাজ আরম্ভ হোক!
অমনি একসঙ্গে ডজনখানেক পিপে দাঁড়িয়ে উঠে হাত-পা নেড়ে ও মুখভঙ্গি করে চাঁচাতে লাগল। তারা যেই থামল, অমনি আবার নতুন একদল পিপে লাফিয়ে উঠে গোলমাল শুরু করলে।
ভোম্বলের ভাব ও মাথা নাড়া দেখে আন্দাজ করলুম, পিপেরা যা বলছে সে তা বেশ বুঝতে পারছে। আমি কিন্তু সেই হ-য-ব-র-ল শুনে কোনও অর্থই আবিষ্কার করতে পারলুম না।
বললুম, কখন তর্ক শুরু হবে?
ভোম্বল বললে, তোমার মতন হাঁদাগঙ্গারাম আমি আর একটিও দেখিনি। ওই তো তর্ক চলছে!
এই তর্ক! কিন্তু ওরা যে সবাই একসঙ্গে কথা কইছে!
হ্যাঁ, একসঙ্গে কথা কইবে না তো কী করবে? একসঙ্গে কথা না কইলে ওরা কি সবাই আলাদা আলাদা করে কথা কইবার সময় কখনও পাবে?
কিন্তু ওই হট্টগোলে কী করে ওরা পরস্পরের কথা বুঝতে পারে?
বোঝবার কোনও দরকার নেই তো!
তাহলে রাজ্য চলবে কেন?
আমার দিকে খুব একটা দয়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভোম্বল বললে, তোমার বুদ্ধি দেখছি ভারি কাঁচা! এও বোঝে না, প্রত্যেক সভ্য যখন তার নিজের দলের জন্যেই ভোট দেয়, তখন তার কথা বোঝা না গেলেও ক্ষতি নেই!
তাহলে বাজে কথা কয়ে মিছে তর্ক করবার দরকার কী?
আচ্ছা আহাম্মকের পাল্লায় পড়লুম, যা হোক! ওহে বাপু, কথাই যদি না কইবে, তবে সভ্য হয়ে লাভ কী?
